মেয়েটা ছিল চোখের পাতায়, মেয়েটা ধ্রুবতারা
মেয়েটা কখনও মাটির গানে প্রেমিক দোতারা
মেয়েটা ছিল আন্দোলনে, মেয়েটা ভীষণ একা
মেয়েটার নাম বাহান্নতে বুলেট দিয়ে লেখা’

‘বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে’ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা বুকের ভিতর ঠিক টের পান শিকড়ের টান৷ গতির দুনিয়ায় ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছেড়ে যে যেখানেই ছড়িয়ে পড়ুন না কেন, বাংলা ভাষার উচ্চারণে এক অনুভব জেগে ওঠে – ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা৷’ ভাষার ভিতরে দিয়েই ভেসে আসে মাটির গন্ধ, নাড়ির যোগাযোগ৷ আসে কেননা ধর্ম নয়, বর্ণ নয়, অন্য কোনও কিছুই নয়, ভাষাই আমাদের জাতিক সত্তার পরিচয় বহন করে৷ আর সেই বাংলা ভাষাকে বুকের রক্ত দিয়ে আগলে রাখা দিন ২১ ফেব্রুয়ারি কি আমরা ভুলতে পারি? নাহ কখনই পারি না৷

পারি না কারণ একটা ভাষার সঙ্গে একটা গোটা জাতির নিবিড় আত্মীয়তা৷ কূটনীতির কাঁটাতার এসে যতই মাঝপথে মাথা তুলে দাঁড়াক, ভাষাই একমাত্র সব বিভেদকে জলাঞ্জলি দিয়ে এক জাতিবোধের সোপানে এনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে৷ মানুষ যে সম্পূর্ণ হয়ে জন্মেও এই শুধু ভাষার কারণেই, বাঘ ভালুকের থেকেও মানুষের জন্ম যে অসম্পূর্ণ এ কথা আমাদের শুনিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ৷ বলেছিলেন, ‘জীবের মধ্যে সবচেয়ে সম্পূর্ণতা মানুষের।

কিন্তু সবচেয়ে অসম্পূর্ণ হয়ে সে জন্মগ্রহণ করে। বাঘ ভালুক তার জীবনযাত্রার পনেরো- আনা মূলধন নিয়ে আসে প্রকৃতির মালখানা থেকে। জীবরঙ্গভূমিতে মানুষ এসে দেখা দেয় দুই শূন্য হাতে মুঠো বেঁধে।’ তার কারণ ‘মানুষের প্রধান লক্ষণ এই যে, মানুষ একলা নয়। প্রত্যেক মানুষ বহু মানুষের সঙ্গে যুক্ত, বহু মানুষের হাতে তৈরি।’ অর্থাৎ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মানুষ আর মানুষ থাকে না৷ এই যে মহামানুষের সত্তা তারই এক ছোট ভাগ জাতিক সত্তা৷ এববং ভাষা হল সেই জাতিক সত্তার মুখপত্র, আর এক জাতিক সত্তার সঙ্গে যোগাযোগের সেতু৷ এক অর্থে ভাষা তাই সেই কবচকুণ্ডল, যা এক এক জাতির নিজস্ব৷ রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, ‘মানুষকে মানুষ করে তোলবার ভার এই জাতিক সত্তার উপরে। সেইজন্যে মানুষের সবচেয়ে বড়ো আত্মরক্ষা এই জাতিক সত্তাকে রক্ষা করা।’

২১ ফেব্রুয়ারি সেই আত্মরক্ষার দিন৷ জাতিক সত্তাকে বাঁচিয়ে তোলার দিন৷ ওপার বাংলার বরকতের বুকের রক্ত তাই গড়িয়ে আসে এপার বাংলার বাঙালির বুকে বুকেও৷ এবং সম্মিলিত উচ্চারণে আমরা বলে উঠতে পারি, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলতে পারি?’

অমর একুশ

স্বাধীনতা বাঙালি জাতির উপর বয়ে এনেছিল দেশভাগের অভিশাপ৷ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে টুকরো হওয়া দেশে রাতারাতি প্রায় সাড়ে চার কোটি বাংলা ভাষি মানুষ হয়ে পড়েছিলেন এমন এক দেশের বাসিন্দা, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হয়ে দাঁড়াল উর্দু৷ প্রশাসনের উচ্চস্তরে বাঙালিকে প্রতিবন্ধী করে দেওয়ার এর থেকে বড় অস্ত্র আর নেই৷ ১৯৫২ সাল৷ অধুনা বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন খাজা পল্টন ময়দানে দেওয়া তাঁর ভাষণে উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন৷ প্রতিবাদ করেন সে দেশের সমস্ত বাংলা ভাষাভাষি মানুষ৷ বিক্ষো, ধর্মঘটকে ভোঁতা করতে ২১ ফেব্রুয়ারি জারি করা হয় ১৪৪ ধারা৷ কিন্তু ছাত্ররা ঠিক করে, আইন অমান্য করেই প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন তাঁরা৷ পুলিশের ছোঁড়া কাঁদানে গ্যাসও তাঁদের থমকে দিতে পারেনি৷ এরপর যখন তাঁরা আইন সভায় গিয়ে প্রতিবাদ জানাবেন ঠিক করেন, তখনই রাষ্ট্রের তরফ থেকে আসে চরম মার৷ ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে পুলিশ৷ আর সেই বুলেট বুকে বাংলা ভাষার ফুল ফোটাতে গিয়ে প্রাণ দেন আব্দুল জব্বার, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সালাম, আবু বরকত সহ আরও অনেকে৷ ভাষাশহীদের সে তালিকায় ছিল ৮-৯ বছরের বালক ওহিউল্লাহও৷ বাহান্নর এই প্রতিবাদই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পথ খুলে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে জন্ম দেয় বাংলাদেশের৷ আর ১৯৯৯ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের৷ ঠিক একই রকম ঘটনা ঘটেছিল অসমের কাছাড়েও৷ বাংলা ভাষাকে বুক দিয়ে আগলে রাখতে প্রাণ দিয়েছিলেন ১১ জন বাংলাভাষি মানুষ৷

বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা

যে ভাষার জন্য ভাইয়ের রক্তে রাঙল দেশের মাটি, যে ভাষায় মোদের গরব, মোদের আশা, সে ভাষা নিয়েই খেদ করে দাদাঠাকুর গেয়েছেন, ‘আ মরি বাংলা ভাষা.. তোমার বাঁচার নেইকো আশা’৷ অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না৷ জাতিক সত্তার রক্ষা করার যে তাগিদে এই প্রতিবাদ সেই সত্তাকেই কি তবে আমরা আদতে বিসর্জন দিয়েছি? উত্তর দিয়ে দাদাঠাকুর ওই গানে আরও গাইছেন, ‘ ভেবেছিল কেউ কি কবে, মেদনীপুর মিদনাপুর হবে, কাঁথির মাথায় লাথি মেরে কন্টাইয়ে করবে কোণঠাসা?’ এ তো সেই বিলিতি কালচার অনুকরণের রীতি, পরবর্তী সময়েও যা কলোনিয়ান হ্যাংওভার হয়ে থেকে যাবে৷ কিন্তু বাংলা ভাষার ভিতর অন্য ভাষার অনুপ্রবেশই কি এই ক্ষতির কারণ? একদা সংস্কৃত ভাষা থেকে যে ভাষা নিজের রূপ পেয়েছে, তার তো অন্য কোনও ভাষার সঙ্গে মিতালি পাতাতে আপত্তি থাকার কথা নয়৷ কাজী নজরুল ইসলামের গানে বাংলার সঙ্গে আরবি-ফারসির দিব্যি সহবস্থান, তাতে সে গান এবং বাংলা ভাষার সৌন্দর্য বেড়েছে বই কমেনি৷ আসলে অন্য ভাষার দৌরাত্ম নয়, বাংলা ভাষার কাছে অশনিসংকেত যদি কিছু থাকে, তবে তা বাংলা ভাষার প্রতি বাংলাভাষাভাষির অবজ্ঞা৷ দাদাঠাকুরের গানে সেই শ্লেষই ধরা পড়েছে৷

আমার আমিকে বাংলায় খুঁজে পাই

প্রতিবার ২১ ফেব্রুয়ারি এলে তাই দলে দলে যে বাঙালি প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে ওঠেন, আমি বাংলায় গান গাই, তাঁরা কতটা ‘আমার আমিকে’ বাংলায় খুঁজে পান তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে৷ প্রাদেশিক ভাষা হওয়ার সুবাদে এপার বাংলায় অন্তত বাংলা ভাষাকে অনেকটা ঘরে বাইরে ভিন্ন পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়৷ কিন্তু প্রশ্ন হল, আমরা নিজেদেরকে কোথায় খুঁজে পাব, ‘গীতাঞ্জলি’তে নাকি ‘সং অফারিংস’৷

আজ সোস্যাল মিডিয়ায় ভুরি ভুরি ছবি পোস্ট আর বাংলা ভাষার তোষামোদ সত্ত্বেও বদলে যাওয়া বাঙালির মননে বাংলা ভাষা যে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ এর প্রধান কারণ অবশ্যই জাতি হিসেবে বাঙালির হীনমন্যতাই দায়ি৷ রাজনৈতিক কারণ হোক বা অর্থনৈতিক কারণ, বাঙালি অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে নিজেকে সমান আসনে দেখতে পারে না৷ এমনকী চিরকাল সংস্কৃতিগর্বী বাঙালিও আজ কতটা নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত তাও খতিয়ে দেখার সময় এসেছে৷

জাতিক সত্তার আত্মমর্যাদাবোধের এই অবনমনই ভাষার প্রতি অবজ্ঞার কারণ৷ স্ট্যাটাসে ইউনিকোডে বাংলা প্রেম ফলাও না করে বাঙালি যত শিগগিরি এই সত্যি কবুল করবে, ততোই বাংলা ভাষার গরবে গর্বিত হওয়ার সুযোগ মিলবে তার৷ যে মেয়েটা ছিল মাটির গানে প্রেমিক দোতারা, যে মেয়েটা ছিল আন্দোলনে, আজ সেই একা হয়ে যাওয়া মেয়েটা, সেই আতর ঢালা সাধের বাংলাভাষার কাছে ফিরে যাওয়ার দিন৷ সমস্ত ঋণ চুকিয়ে আজ বাঙালি জাতির আত্ম আবিষ্কারের দিন৷ তবে শুধু একটা দিন কেন৷এই স্মৃতি বুকে নিয়ে, সারা বছর এক জাতির গর্বে সে যেন বলে উঠতে পারে, ‘বাংলা ভাষা মায়ের ভাষা তার তুলোতে শুই৷’ সব বাঙালির বুকে বুকে আজ বরং এই প্রার্থনাই জেগে উঠুক৷