দেবময় ঘোষ, কলকাতা: একনাগাড়ে পশ্চিমবঙ্গে জনসভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি৷ দুই শীর্ষ নেতার এমন ঝোড়ো প্রচার বিজেপির রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব একটা নেই তাও আবার বাংলাকে ঘিরে৷ সবমিলে সপ্তদশ লোকসভার অন্তিমলগ্নে এসে বিজেপি অন্দরমহলে গুঞ্জন-এটাও একটা রেকর্ড৷ তবে এর বিশ্লেষণে মত্ত বিশেষজ্ঞরা৷

পশ্চিমবঙ্গে মোদী-শাহ জুটি ৩৩টি জনসভা করেছেন৷ যোগী আদিত্যনাথ করেছেন কমপক্ষে ১৫টি৷ রাজনাথ সিং করেছেন চার বা পাঁচটি৷ ১৭ তম লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ-যোগী আদিত্যনাথ-রাজনীথ সিং সম্মিলিত ভাবে ৫০টিরও বেশি জনসভা করেছেন৷

অর্থনীতিবিদ দীপঙ্কর দাশগুপ্ত মনে করেন, এই নির্বাচনে বিজেপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে টলিয়ে দেবেন তা মনে করি না৷ বিজেপি ভালো করোই জানে বাংলায় মমতা অবস্থান কতটা শক্ত৷ বিজেপি হয়তো আগের ফলাফলের থেকে ভালো ফল করবে৷ কিন্তু মমতাকে তার অবস্থান থেকে সরাতে পারবে বলে মনে করি না৷ তবে হ্যাঁ ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই বিজেপি এত প্রবল প্রচার করেছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷

বাংলায় মোদী ১৭টি জনসভা করেছেন৷ প্রতি জনসভাতেই হাজার-হাজার মানুষের ভিড় দেখা গিয়েছে৷ রাজনৈতিক মহল একটি ব্যাপারে নিশ্চিত, এই প্রথম বাংলাকে উত্তরপ্রদেশের থেকেও গুরুত্ব দিয়েছে বিজেপি৷ উত্তরপ্রদেশে ৮০টি লোকসভা আসনের জন্য ১৮টি জনসভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী৷ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রের জন্য করেছেন ১৭টি জনসভা৷

মোদী বাংলায় ১৭টি জনসভাকে একটি রেকর্ড বলেই মনে করছে বিজেপি৷ লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেশের অন্য কোনও নেতা বাংলায় এই সংখ্যক জনসভা করেছেন বলে মনে করছে না বিজেপি৷ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলা দখল করতে এসে রেকর্ড গড়ে গিয়েছেন মোদী৷

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অমল মুখোপাধ্যায় বলেন, বাংলায় মমতার ক্ষমতাকে খর্ব করা বিজেপির প্রাথমিক উদ্দেশ্য৷ কোনও এক আঞ্চলিক দলের নেত্রীকে ক্ষমতাশালী করতে চায়না বিজেপি৷ মমতা নিজেই ভবিষ্যতবাণী করেছেন তিনি ৪২টি আসন পাবে৷ যত বেশি আসন তিনি পাবেন বিজেপির বিপদ বাড়বে৷ দ্বিতীয়ত এই নির্বাচনে কংগ্রেস এবং সিপিএম অতি দূর্বল৷ বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে মূল লড়াই৷ স্বাভাবিক ভাবেই মোদী তো বাংলাকে গুরুত্ব দেবেনই৷ তৃতীয়ত, মমতার মুসলমান তোষণের ফায়দা বিজেপি তুলছে৷ বিজেপি চাইছে মমতা বিরোধী এবং হিন্দু ভোট তাদের দিকে আসুক৷ স্বাভাবিক ভাবেই বাংলায় মূল শক্তি তৃণমূলকে এভাবেই চাপে ফেলা যাবে৷ এই সময় কংগ্রেস এবং সিপিএম দূর্বল হয়ে পরায় বিজেপি এবং তৃণমূলের সুবিধা হয়েছে৷ মমতা তা ভালো করেই বোঝেন৷

নির্বাচনে শুরু থেকেই বাংলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ৷ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা লক্ষ করেছেন, মোদী উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা এবং গুজরাটেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন৷ এই পাঁচ রাজ্যই তাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আসবে মনে করেছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব৷ সেই কারণে ৫০ শতাংশ প্রচার এই পাঁচ রাজ্যেই করেছেন মোদী৷ কিন্তু বাংলার দিকে তাকিয়ে রীতিমতো অবাক সারা ভারতের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা৷ অতীতে কোনও প্রধানমন্ত্রী লোকসভা নির্বাচনের জন্য বাংলায় ১৭টি জনসভা করেছেন – এখন কথা খেয়াল করতে পারছেন কেউ৷

শুধু মোদী একা নন, অমিত শাহও ১৬টি জনসভা করেছেন রাজ্যে৷ সোয়াইন-ফ্লু থেকে ভুগে ওঠার পর ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অনুরোধ অগ্রাহ্য করে বাংলায় সভা করেছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি৷ সেই সময় বোঝা গিয়েছিল লোকসভা নির্বাচনে বাংলার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছেন গেরুয়া বাহিনী৷ বিজেপির এক শীর্ষনেতার বক্তব্য, ‘‘প্রচারের বিষয়ে আমাদের কৌশল অমিত শাহ নিজেই তৈরি করেছেন৷ এটা বাংলার ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই৷ শুধুই লোকসভার লড়াই নয়৷’’