মানব গুহ, কলকাতা: একসময় এঁরাই বাম শাসনে অতিষ্ট হয়ে কলকাতার রাজপথে মিছিল করেছিলেন৷ স্বতঃস্ফুর্ত মিছিল ভূমিকা নিয়েছিল চৌঁত্রিশ বছরের বাম সরকার অবসানের৷ রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে৷ কিন্তু, সেই সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে বুদ্ধিজীবীদের মানসিকতারও৷ এখন কি শুধুই লাভ দেখে প্রতিবাদ আন্দোলন? প্রশ্ন উঠছে৷ আর এই স্বার্থ বুঝে বুদ্ধিজীবীদের তাঁবেদারিতেই আজ হাসছে গোটা বাংলা৷

একসময় নন্দীগ্রাম ও অপশাসন নিয়ে বাম সরকারের বিরুদ্ধে জনমত নির্বিশেষে মিছিলে পা মিলিয়েছিলেন এই বাংলার বুদ্ধিজীবীরা৷ বাম বুদ্ধিজীবীরাও সেই মিছিলে পা মেলানোয় প্রতিবাদ আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে কলকাতার রাজপথ৷ বিপ্লব ছড়িয়ে পরে গোটা রাজ্যে৷ অতঃপর ২০১১ তে পরিবর্তন৷ যার পিছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি বাংলার বুদ্ধিজীবীদের অবদান কোনও অংশে কম নয়৷

কিন্তু তারপর পরিবর্তনের সরকারের বয়স যত বেড়েছে বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদের মুখ তত বন্ধ হয়েছে৷ প্রতিবাদ পরিবর্তিত হয়েছে তাঁবেদারিতে৷ লড়াই পরিবর্তিত হয়েছে চাটুকারিতায়৷ রাজপথের আন্দোলন এখন দাঁড়িয়েছে দেখনদারির তোষামুদে আন্দোলনে৷

মিঠুন চক্রবর্তী রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন৷ মুনমুন সেন, অভিনয় জীবন শেষ করে এখন বাঁকুড়া থেকে ভারতের লোকসভার সাংসদ৷ দেব, ঘাটাল থেকে লোকসভার সাংসদ৷ দেবশ্রী রায়, তাপস পাল, শতাব্দী রায়, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, কবির সুমন, অর্পিতা ঘোষ, সন্ধ্যা রায় প্রতিবাদের পুরষ্কার পেয়েছেন৷ ব্রাত্য বসু ও ইন্দ্রনীল সেন তো এখন মমতা সরকারের মন্ত্রী৷ তালিকায় রয়েছেন শুভাপ্রসন্ন, যোগেন চৌধুরী সহ আর অনেক বড় বড় নাম৷ মমতা হাত ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছেন অনেকেই৷ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে ‘শ্রী’ পুরস্কার নিয়েছেন আরও অনেকে৷

বিভিন্ন কমিটির মাথায় বসে জনগণের করের টাকায় ক্ষমতা ভোগ করছেন একসময়ের প্রতিবাদীরা৷ রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসার পর, কলকাতার রাজপথে বাম অপশাসনের বিরুদ্ধে মিছিল করা বা প্রতিবাদে কন্ঠ মিলিয়ে সুবিধে পেয়েছেন প্রায় সব বুদ্ধিজীবীই৷

আর তারপরই, তাদের ও বাকিদের প্রতিবাদের পথ আর ভাষা দুটোই হারিয়ে গেছে৷ প্রচারের সার্চলাইটের পর ক্ষমতা এলে কার না লোভে চোখ চকচক করে বলুন তো৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কল্যানে বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছেন৷ গাড়ি নিয়ে রক্ষী নিয়ে সাংসদ-বিধায়ক হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সবাই৷

অভিযোগ, কেউ কেউ আবার নিজের এলাকাতেও যাবার প্রয়োজন বোধ করেন না৷ তাই কি দরকার, আবার প্রতিবাদ করার৷ তার চেয়ে মমতার কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে যদি আরও সুবিধা পাওয়া যায়, সেটাই অনেক৷ অনেকেরই শিরদাঁড়ার সোজা ভাবটা আর নেই৷

পদ্মাবতী নিয়ে প্রতিবাদে কন্ঠ মিলিয়েছেন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা৷ খুব ভালো করেছেন৷ এই প্রতিবাদ হওয়া দরকার ছিল৷ হিন্দুত্বের নামে অস্থিরতা সৃষ্টির এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পা মেলানটা খুব দরকার ছিল৷ হিন্দুত্বের নামে আরএসএস আর হিন্দুত্ববাদীদের এই গাজোয়ারিটা বন্ধ করা খুব দরকার৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পথ দেখিয়েছেন, আর তার তালে পা মিলিয়েছেন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা৷ এটার খুব প্রয়োজন ছিল৷ প্রতিবাদের ভাষা বন্ধ হলেই সমস্যা বাড়বে আম-জনতার৷

কিন্তু সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেন প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন না বাংলার এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷ সাধারণ মানুষ কি কি প্রশ্ন তুলছেন, চলুন না আবার একবার চোখ বুলিয়ে নি৷

মুসলিম মৌলবাদীদের ফতেয়ার জেরে বাংলায় ঢুকতে পারেন না তসলিমা নাসরিন৷ প্রতিবাদ কোথায়? তখন কোথায় থাকেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী? কোথায় থাকেন এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷ মুসলিম মৌলবাদীদের ফতেয়া আছে, তাই ভারতে প্রবেশে মানা তসলিমা নাসরিনের৷ এই বাংলাতেও৷ সেই বাম আমল থেকেই৷ পরিবর্তনের সরকার আসার পরও সেই ফতেয়ার যেমন পরিবর্তন হয় নি, তেমনই তিলোত্তমায় ঢোকার ছাড়পত্র মেলে নি তসলিমার৷ প্রিয় বুদ্ধিজীবীরা এই বিষয়ে চুপ কেন? কেউ জানে না৷

বিরোধীরা বলেন কারণটা খুব সোজা৷ মুখ্যমন্ত্রী মুসলিম ভোটের লোভে তসলিমা নিয়ে স্পিকটি নট, বুদ্ধিজীবীরা কি করে মুখ খোলেন৷ তাই মুখ বুজে মেনে নেওয়াটাই এখানে ভবিতব্য৷ টাকা পয়সা, প্রচার পাবার পর এবার ক্ষমতায় আসতে গেলে দিদিকে সন্তুষ্ট রাখতেই হবে যে৷ কে না জানে, ২০১৯ আর ২০২১ এ দু-দুটো বড় ভোট, সবার নজর এখন গদির দিকেই৷

জুলফিকার সিনেমায় যখন ঠিক পদ্মাবতীর মতই মৌলবাদীদের ফতেয়ার মুখে পড়তে হল কলাকুশলীদের তখন কোথায় ছিলেন বাংলার ধর্ম-নিরপেক্ষ মুখ্যমন্ত্রী? কেন মুখ বন্ধ করে বসে ছিলেন বাংলার তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা? কালো ব্যাজ পরে টলিউডে ১৫ মিনিটের কাজ বন্ধের প্রতিবাদ আন্দোলন কেন দেখা যায় নি? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

সেই জুলফিকারে আবার অভিনেতা হিসাবে ছিলেন এই প্রসেনজিৎ আর দেব, যাঁরা পদ্মাবতী নিয়ে প্রতিবাদে নেমেছেন৷ কিন্তু নিজের অভিনীত ছবি যখন মৌলবাদীদের ফতেয়ার মুখে পড়ল তখন অদ্ভুতভাবে চুপ ছিলেন বাংলার এই বিখ্যাত অভিনেতারা৷ কেন? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

ঠিক পদ্মাবতীর মতোই মৌলবাদীদের রোষের মুখে পড়েছিল পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের জুলফিকার৷ অভিযোগ উঠেছিল, তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই বেশ কিছু অংশ বাদ দিয়ে মুক্তি পেয়েছিল জুলফিকার৷ পরিচালকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছিলেন মমতা, এমন অভিযোগই কিন্তু উঠেছিল৷

আজ সেই মমতাই পদ্মাবতী নিয়ে বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছেন৷ সুর মিলিয়েছে টলিউড৷ এবার একদম ঠিক করেছেন৷ কিন্তু প্রশ্ন উঠছে হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আছেন, মুসলিম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে চুপ থাকেন কেন? শুধুই ভোটের জন্য৷ বুদ্ধিজীবীদের দিকেও সেই একই প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷ জবাব তো অনেক দূরের কথা, যে প্রশ্ন তোলারই সাহস নেই বাংলার সাংবাদিকদের৷

আর এখানেই বুদ্ধিজীবীদের দ্বিচারিতার দিকেই আঙুল তুলছেন সাধারণ মানুষ৷ তাঁদের কাছেও বুদ্ধিজীবীদের এই দেখনদারির প্রতিবাদ ধরা পড়ে গিয়েছে৷ তাই পদ্মাবতী নিয়ে প্রতিবাদ আন্দোলনে নামলেও তারা এখন আমজনতার হাসির খোরাক৷ এমনকি পরিবর্তনের বাংলায় বুদ্ধিজীবী শব্দটা পরিবর্তিত হয়ে কবে যেন ‘বুদ্ধিবীচি’ হয়ে গেছে সেটাও এখন সবাই জানেন৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় সেটাই লেখেন সবাই৷ কবে আবার বাংলার বুদ্ধিজীবীদের স্বার্থ ত্যাগ করে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদী ভাবমূর্তিতে দেখা যাবে তার জন্যই অপেক্ষায় আম বাঙালি৷

- Advertisement -