সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: উফফফফ…শাপমুক্তি। লর্ডসে সুপার ফাইনাল যখন সুপার ওভারে গেল তখনও যেন সেই বছর তিনেক আগের নাগপাশ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রয়েছে ইংরেজ অল-রাউন্ডারকে। এক বলে দু’রান নিতে গিয়ে মার্ক উড রান-আউট হতেই ইডেনের অভিশপ্ত রাতই ফিরতে চলেছিল লর্ডসে৷ ক্রিকেটের নন্দনকাননে সেই শাপমুক্তি হয় গাপ্তিলের ‘lazy lad’ রান-আউটে।

টি-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালের অভিশপ্ত শেষ ওভারের পরে বেশ কয়েকদিন পরেও স্টোকস ডুবেছিলেন প্রবল হতাশায়। একদিকে যেমন ২০১৬ টি-২০ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারদের নাচ, ফাইনালের নায়ক ব্রেথওয়েটের স্বপ্নের ব্যাটিং চর্চার কেন্দ্রে ছিল, তখন স্বাভাবিকভাবেই শেষ ওভারে পরের পর চার-ছক্কা খাওয়া ইংল্যান্ড অল-রাউন্ডার শেষ হয়ে যাচ্ছিলেন ভিতরে ভিতরে।

বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষে পিচের উপরে হাঁটু গেড়ে বসে ইংরেজ বোলারের কান্নার ছবিটাই বুঝিয়ে দিয়েছিল তিনি কতটা ভেঙে পড়েছিলেন। অভিশপ্ত শেষ ওভার প্রসঙ্গে পরে ইংরেজ অল-রাউন্ডার বলেছিলেন, ‘‘মনে হচ্ছিল গোটা পৃথিবীটা আমার ঘাড়ে ভেঙে পড়ল।’’

বিবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্টোকস আরও জানিয়েছিলেন, ‘‘বিশ্বকাপটা হাতছাড়া করে ফেললাম! বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। নিজেকে সম্পুর্ণ বিধ্বস্ত লাগছিল।’’ সেদিনের ট্র্যাজিক হিরোই এদিনের ফাইনালের ‘প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ’। গাপ্তিল জোরে দৌড়লে লর্ডসের গোধূলি আলোয় ভরা রাত আটটার আলোটা ফের ইডেনের তিন বছর আগের রাত বারোটার ধু ধু রাতের মতোই দেখাত।

সেরকম সম্ভাবনা বারবার তৈরি হয়েছে। মেঘ কেটেছে। জিমি নিশামের বলে স্টোকসের ক্যাচ ধরেও বোল্ট বাউন্ডারি লাইন ছুঁয়ে ফেলেছিলেন। ব্যালেন্স রাখতে পারলে ওটাই ২০১৯ বিশ্বকাপের কফিনে ইংল্যান্ডের শেষ পেরেক হয়ে যেত। কথায় বলে ভাগ্য সাহসীদেরই সঙ্গ দেয়। শেষ ওভারে পর দুই ডট বলের পর ফের যখন কিউইদের দিকে ম্যাচ ঝুঁকছে তখনই অসাধারণ ছয় আসে স্টোকসের ব্যাট থেকে। পরের বলে দুই রান নেওয়ার সময় গাপ্তিলের ‘অভিশপ্ত’ থ্রো। উইকেটে লাগতে লাগতে স্টোকসের ব্যাটে লেগে বাউন্ডারি পার। এক বলে ছয় না মেরেও ভাগ্যের জোরে মূল্যবান ৬ রান যোগ হয়ে গেল ইংল্যান্ডের স্কোর বোর্ডে। শেষ বলে দুই রান নিতে গিয়ে উড রান-আউট হতেই স্টোকসের অভিব্যক্তি ছিল সেই তিন বছর আগের ইডেনের মতোই। হেলমেটের অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না।

তবুও ভেঙে পড়েননি স্টোকস৷ উঠে দাঁড়িয়ে সুপার ওভারে ফের ব্যাট করতে এসেছেন তিনি। সুপার ওভারে ১৬ রানের শক্ত টার্গেট দেন কিউইদের। আর্চার যখন ওই রান আটকানোর জন্য বল করতে যাচ্ছেন তখন এই বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান বলছিল তিনি বিশ্বকাপে এক ওভারে সবচেয়ে বেশি রান দিয়েছেন ১৫। ১৬ করতে পারলে তবেই জিতবে নিউজিল্যান্ড, ফের টাই হলে কাপ পাবে ইংল্যান্ড। ভাগ্যের কী খেলা! ঠিক ১৫ রানেই আটকে গেল কিউইরা। ভাগ্যলক্ষী সঙ্গ দিল সাহসী স্টোকসের।

প্রায় একই পরিস্থিতি থেকে এই বিশ্বকাপে লিগ ম্যাচ বার করতে পারেননি বেন। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তিনিই ছিলেন ভরসা। ম্যাচ বার করতে করতেও হয়নি। ইংল্যান্ড হারলেও স্টোকস হারেননি। তাই হয়তো, ফাইনালের শেষ বলে শাপমুক্তি হল। তিন বছর আগে ইডেনের টি-২০ বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হয়েছিল ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটা ছুঁই ছুঁই। রবিবার রাতে ম্যাচ যখন শেষ হল ভারতীয় সময় তখন রাত ১১.৫০। ১২টা বাজতে বাজতেও ১২টা বাজেনি ‘বিগ’ বেনের।