শঙ্কর দাস, বালুরঘাট: নিয়োম করে দু’একা বার মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন বছর ২৮-র পলাশ মণ্ডল৷ ফোনের ওপার থেকে মায়ের কথা শুনেতে শুনতেই দিনের সমস্ত ক্লান্তি এক লহমায় মুছে ফেলতেন পলাশ৷ ফোনে মায়ের নির্দেশ আসতো ‘খেয়েছিস?’ আবার কখনও ‘শরীরের উপর নরজ রাখিস বাবা৷ এই সেদিন রাতেও, মাকে কথা দিয়ে পলাশ বলেছিলেন ‘‘এবারের পুজোয় লম্বা ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরছি মা৷’’ আর মাকে কথা দিতেই মনে মনে পুজোর প্রস্তুতিও সেরে রেখেছিলেন পলাশ৷ পরিবারের জন্য নতুন পোশাক-খাওয়া-দাওয়া-পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান আর অবশ্যই ছকে ফেলেছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে দেদার আড্ডার পরিকল্পনা৷ সঙ্গে আরও কতো কী৷ ছেলের ছুটির খবর শুনতেই, মায়ের চোখেও আজানতেই জল এসেছিল৷ দীর্ঘ দিন পর আদরের ধন ছেলেকে আবার এক ঝলক দেখতে পাবেন যে৷ শুক্রবার পর্যন্তও এভাবেই স্বপ্ন সুখে দিনে কাটছিল দক্ষিণ দিনাজপুরের তপন থানার সালাস এলাকার সিআরপিএফ জওয়ান পলাশ মণ্ডলের পরিবারে। কিন্তু, তাল কাটল মঙ্গলবার সকালে৷ অবাঞ্ছিত অজানা একটি নাম্বার থেকে আসা একটি ফোনেই তছনছ করে দিল সাজানো সংসার৷ বোনের মোবাইলে আসা সিআরপিএফ দফতরের একটি বার্তা৷ ফোনের ওপার থেকে সিআরপিএফের সদর দফতর থেকে জানান হয়, কোবরা বাহিনীর জওয়ান পলাশ মণ্ডল মাওবাদী অভিযানে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। মুহূর্তেই শশ্মানের নিস্তব্ধতা গ্রাস করে ফেলে মন্ডল পরিবারকে৷ তখনও অবুঝ মায়ের মন৷

কারণ গত রবিবার বিহারের গয়া থেকে বাড়িতে ফোন করে শেষ বার কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীর জওয়ান পলাশ তাঁর মাকে বলেছিলেন, স্পেশাল ডিউটিতে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেই স্পেশাল ডিউটিই যে সব তছনছ করে দেবে গোটা পরিবারকে, তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি সদ্য সন্তান হারান মা৷ মঙ্গলবার সকালে আসা সিআরপিএফ দফতরের মৃত্যুর বার্তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি৷ তপন থেকে গঙ্গারামপুর যাওয়ার রাজ্য সড়কের পাশেই অবস্থিত নিহত পলাশ মণ্ডলের বাড়ির উঠানে তখনও স্বজন হারান কান্না-হাহাকার৷ মা শেফালী দেবী ছোট ছেলের মৃত্যুতে প্রলাপ বকে চলেছেন। পাশে বসে থাকা বাবা বীরেন্দ্র নাথ মণ্ডল এক কোনে পাথর৷ কান্নায় তাঁর ছলছলে চোখ৷ সেই সঙ্গে আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়৷

বিহারের গয়া জেলার চন্দ্রবান্দা-ডুমরি এলাকায় মাওবাদীদের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে ১১ জওয়ান শহীদ হয়েছেন৷ তাঁদের মধ্যে এরাজ্যের নদিয়ার বাসিন্দা দীপক ঘোষের পাশাপাশি দক্ষিণ দিনাজপুরের সালাসের পলাশও রয়েছেন।

তপন-গঙ্গারামপুর সড়কের পাশেই অবপস্থিত বাড়িতে বসবাস ছোট্ট একটি পরিবারের৷ পরিবার বলতে মা-বাবা-দাদা-বোন এই চারজন৷ বড় ভাই তরুণ কুমার মণ্ডল অন্যের দোকানে কর্মচারী৷ ছোট বোন অল্প কয়েকদিন হয়েছে সিভিক ভলান্টিয়ারের কাজ পেয়েছেন। সামান্য কিছু জমিজমাতে চাষ আবাদ করেই বাবা বীরেন্দ্র নাথ মণ্ডল কোনও মতে সংসার চালিয়ে তিন ভাইবোনকে লেখা পড়া শিখিয়েছেন। বিএ পাশ পলাশের ছোট বেলা থেকেই শখ ছিল ফৌজি হবেন। শুধু ফৌজিই নয় সে রীতিমত কমান্ডো হবে বলেও স্কুলের বন্ধুদের কাছে নিজের গল্পও করতো। ছোট বেলার ইচ্ছাকেই ডানা মেলে ২০১০ সালের ১৭ নভেম্বর সিআরপিএফের ১৬৫ নম্বর ব্যাটালিয়নে যোগ দেয় পলাশ মণ্ডল। এর পর কঠোর প্রশিক্ষণে পাশ করে এবছর ২৮ ফেব্রুয়ারি দুর্ধর্ষ কমান্ডো বাহিনী কোবরাতে অন্তর্ভুক্তি হওয়ার সুযোগ পায়। গয়া জেলার জেলাশাসক কুমার রবি জানান, মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে অন্যান্য জওয়ানদের সঙ্গে পলাশও চন্দ্রবান্দা-ডুমারীনালা এলাকায় অভিযানে শামিল হন। মাওবাদীদের ডেরায় ঢুকে পড়ার জেরে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে কোবরার মোট ১১ জন জওয়ান নিহত হয়েছেন। এদিনের এই ঘটনায় জখম হয়েছেন আরও পাঁচ জন। জখমদের প্রত্যেকেরই অবস্থা আশংকা জনক। তাঁদের রাঁচি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিনের এই খবর পেয়ে বাড়িতে ছুটে আসেন নিহত পলাশ মণ্ডলের স্কুল জীবনের বন্ধু উৎপল হালদার৷ তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বন্ধু ছোট বেলা থেকেই একটু অন্য-ধরণের। সব সময় দেশের প্রতি তাঁর আলাদা উৎসাহ লক্ষ্য করা গিয়েছে। কলেজ জীবনে সে বলতো পড়াশুনা শেষে সেনাবাহিনীতে যোগ দিবে এবং কমান্ডো হবে।মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ দিনাজপুরের পুলিশ সুপার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, নিহত পলাশ মণ্ডলের মৃতদেহ এদিন সেনাবাহিনীর চপারে বালুরঘাট এয়ারপোর্টে নিয়ে আসা হচ্ছে। সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে গার্ড অফ অনার দেওয়া হবে। এর পরেই যথাযথ সম্মানে দেহ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে৷

এদিন, শহিদের বাবা বীরেন্দ্রনাথ মণ্ডল বলেন, ‘‘আমাদের বংশে একমাত্র পলাশই সরকারি চাকরি করার সুযোগ পায়। ছোট থেকেই ওর কমান্ডো হওয়ার শখ ছিল। দিন কয়েক আগেও জানিয়েছিল, এবারের পুজোয় ছুটি নিয়ে সে বাড়িতে আসবে৷ কিন্তু, ওতো আমাদেরকেই উল্টে ছুটি দিয়ে কোথায় চলে গেল জানি না৷’’ ছেলে হারান যন্ত্রণায় কাতর মা শেফালী দেবী কিছুই জানাতে পারেনি৷ সন্তান হারিয়ে প্রলাপ আউড়ে শুধু বললেন, “বোধনের আগেই বিসর্জন…”

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV