সরোজ দরবার

দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট টিমের বিপজ্জনক খেলোয়াড় ডেভিলিয়ার্সের শিরায় টান ধরলে ভারতের ক্যাপ্টেন ধোনি যখন তাঁর পা টেনে ধরে ফিজিওকে ডাক দেন, তখন তা  ফেয়ার প্লে-র আদর্শ একটা ছবি হয়ে থাকে। এই যে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নিয়ে বাঙালির আবেগ-সমুদ্র উথালপাথাল, তাদের খেলাতেও কিন্তু এর ডিফেন্স পড়ে গেলে ওর অ্যাটাকিং প্লেয়ার এসে হাত ধরে টেনে তোলেন। খেলার এই ধর্ম। ব্যতিক্রম ইডেন গার্ডেন্সে ফেডারেশন কাপের সেই অভিশপ্ত ফাইনাল৷ যার কথা সকলেই ভুলতে চায়, যদিও দুঃস্বপ্ন তো ফিরে ফিরেই আসে৷ কিন্তু রাজনীতি এমন একটা খেলা, যেখানে কোনও ধর্ম না-থাকাটাই ধর্ম। তাই চিটফান্ড কেলেঙ্কারি থেকে ধর্ষণ, কৃষকমৃত্যু কোনও কিছুই যাদের এক করতে পারেনি, তাদেরই যখন এক মঞ্চে টেনে আনে গোমাংস, তখন একটু খটকা জাগে বইকি। মনে হয়, শিখণ্ডী ‘বিফ’কে সামনে রেখে কোন অর্জুন আবার তলে তলে ভীষ্মকে কোন তির মারার জন্য তৈরি হচ্ছেন।

382252-dadri-killing-protest-ptiশহরের প্রাক্তন মেয়র এবং একদা বামপন্থী অধুনা পরিবর্তনপন্থী বিশিষ্ট এক কবি যখন গোমাংস চেখে সম্প্রীতির নমুনা দিচ্ছেন, রাজ্যের এক মন্ত্রী যখন গোমাংস নিয়ে রাজনীতিকে সংস্কৃতির পরিপন্থী বলে বিবৃতি দিচ্ছেন, তখন ভিন্ন শিবির থেকে আর এক খেলোয়াড় টুক করে তাঁর ট্যুইটার ওয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েছেন এই লেখা, ‘Is beef a life-saving drug? Sometimes I get the impression some people think it is৷’ বেচারা আখলাক গোমাংস খেয়েছেন, স্রেফ এই গুজবে গণপ্রহারে মরলেন। জেনে গেলেন না, তাঁর মৃত্যুর উপর দাঁড়িয়ে গোমাংস সত্যিই পলিটিশিয়ানদের পক্ষে কী রকম ‘লাইফ সেভিং’ হয়ে উঠেছে।

একদা মুসলিমদের থেকে পৃথক বোঝাতে সনাতনপন্থীরা ‘হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল একটি ঢালের মতো। এখন তার ব্যবহার বর্শার মতো। এখন আর সে বাঁচাতে বা ধারণ করতে নয়, বরং তেড়েফুঁড়ে অন্যের বুকে বিঁধতে তৈরি। এই ‘হিন্দু’ বর্শাধারীরা জানেন কিংবা জেনেও ভুলে থাকেন যে, এ শব্দের সত্যি কোনও ‘সার্থকতা’ নেই।

বেদান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্বামীজি প্রথমেই খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘‘যে ‘হিন্দু’ নামে পরিচয় দেওয়া এখন আমাদের প্রথা হয়ে দাঁড়াইয়াছে, তাহার কিন্তু আর কোনও সার্থকতা নাই; কারণ ঐ শব্দের অর্থ‘ যাহারা সিন্ধু নদের পারে বাস করিত’। প্রাচীন পারসিকদের বিকৃত উচ্চারণে ‘সিন্ধু’-শব্দই ‘হিন্দু’রূপে পরিণত হয়; তাঁহারা সিন্ধু নদের অপরতীরবাসী সকলকেই ‘হিন্দু’ বলিতেন।… মুসলমান শাসনকাল হইতে আমরা ওই শব্দ নিজেদের উপর প্রয়োগ করতে আরম্ভ করিয়াছি। অবশ্য এই শব্দ ব্যবহারে কোনও ক্ষতি নাই, কিন্তু আমি পূর্বেই বলিয়াছি, এখন ইহার সার্থকতা নাই; কারণ তোমরা বিশেষভাবে লক্ষ্য করিও যে, বর্তমানকালে সিন্ধু নদের এই দিকে সকলে আর প্রাচীনকালের মতো এক ধর্ম মানেন না। সুতরাং ঐ শব্দে শুধু খাঁটি হিন্দু বুঝায় না; উহাতে মুসলমান, খ্রীষ্টান, জৈন এবং ভারতের অন্যান্য অধিবাসীগণকেও বুঝাইয়া থাকে।’ হিন্দুবাদী তথাকথিত পণ্ডিতরা এ কথা আজ আর হয়ত স্বীকার করতেও চাইবেন না। কেননা, তাহলে ওই বর্শাটি হাতছাড়া হবে, এবং গেরুয়া স্বপ্নের গোঁড়া ধর্মের মৌলবাদী ‘হিন্দু’ দেশ তৈরি হবে না।

বস্তুত এরা কৌশলে ভুলিয়ে দিতে চায় যে, এই তথাকথিত হিন্দু ধর্মটির ভিত্তি ‘সংশ্লেষ’। বৈদিক কিংবা ব্রাহ্মণ্যধর্মের সঙ্গে যখন যে ধর্মের দেখা হয়েছে, ব্রাহ্মণ্যধর্ম নিজের মতো করে তার কিছু ভালো আচার ব্যবহার নিয়েছে, কিছু কিছুর পরিমার্জন করে। কিন্তু বর্জন করেনি। ‘হিন্দুসমাজের গড়ন’ খুব নিবিষ্টভাবে লক্ষ্য করে নির্মলকুমার বসু তাই ‘ভারতবর্ষে আর্যসংস্কৃতির প্রকৃতি’ সম্পর্কে লিখছেন, ‘‘নানাজাতি যখন ব্রাহ্মণের অধীনতা স্বীকার করিয়া বৃহত্তর হিন্দুসমাজ  গঠন করিতে লাগিল, তখন কাহারও আচার অনুষ্ঠানকে অকারণে নষ্ট করা হয় নাই। কেবল ব্রাহ্মণ্য নীতির পরিপন্থী কোনও আচার বা অনুষ্ঠান থাকলে তাহাকে পরিমার্জিত ও সংশোধিত করে লওয়া হইত। ইসলাম খ্রিষ্টীয় কিম্বা ইহুদিগণের ধর্ম কিন্তু এ বিষয়ে স্বতন্ত্র। সেখানে কোনও মানুষ অপর ধর্ম হইতে এসে স্থান পাইলে তাহাকে পূর্ব সংস্কার প্রায় সর্বথা বিসর্জন দিয়া আসিতে হয়। কিন্তু হিন্দুধর্মের ঔদার্যের ফলে হিন্দুসমাজের মধ্যে অঙ্গীভূত বিভিন্ন জাতিকে সেরূপ ত্যাগ স্বীকার করিয়া আসিতে হয় না।’’

অর্থাৎ, এভাবেই যে জাতির মধ্যে নরবলি প্রথা চালু ছিল, হিন্দুধর্মে অন্তর্ভুক্তির পর তা পশুবলি বা সবজি বলি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় আচার-আচরণগুলি বৃহত্তর হিন্দু সমাজের নিরিখে লোকাচার হিসেবে গৃহীত হয়েছে। জাতিভেদে উপাস্য পশুপাখি, গাছ ইত্যাদি টোটেম বৃহত্তর হিন্দুসমাজের দেবদেবীদের বাহন হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। কখনও আবার গুরুত্ব অনুযায়ী তা ব্রাহ্মণ্য দেবতার মাথায় চড়েও বসছে (গণেশ মূর্তি)। এই সেই বহুত্ববাদ, যা পরবর্তীকালে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। এবং এই বহুত্বই বিদেশি আগ্রাসন থেকে বার বার ভারতীয় সমাজকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। উত্তরকালে গোঁড়ামির শ্যাওলা জমলেও সনাতন ভারতীয় সমাজ ও তার উৎপাদন ব্যবস্থা, india-cow-worship-2011-11-3-7-50-52সংস্কৃতি, সংস্কৃতির আত্তীকরণ ইত্যাদির জটিল নকশা পরবর্তী ভারতকে এমন একটি রূপ দিয়েছে, এমন একটি দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে যাকে ভাঙা কোনও বিজেতার পক্ষেই সম্ভব হয়নি। এই সমাজগঠনের ধারাতেই উৎপাদিকা শক্তি এবং অর্থনীতি সচল রাখার তাগিদ গোপালনকে ‘শুদ্ধ’ গুণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। বৃহত্তর হিন্দু সমাজে কিছু বৃত্তিকে মর্যাদা দিয়ে সামনের সারিতে আনা হয়েছিল। কিন্তু গোঁড়ামির ঘুণ ধরায় পরবর্তীকালে সেই প্রথার কী হাল হয়েছিল, ইতিহাস তার সাক্ষী। রক্ষণশীল সমাজের গোঁড়ামির কারণেই চৈতন্যদেবের আন্দোলন সদর্থক জাগরণ আনার চেষ্টা করেও পরে আর কাম্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। আর এই সর্বনাশা গোঁড়ামি তো আজ কট্টরপন্থী মুসলিমদের মতোই হিন্দুত্ববাদীদেরও মজ্জাগত। হিন্দুসমাজের ইতিহাসকে এরা প্রায় কাটছাঁট করে সাভারকারের আমলে নিয়ে চলে আসতে পারলেই বাঁচে। কেননা মসনদ রাখতে হবে।

গোমাংস খাওয়া তাই ছুতো। আসলে আখলাকের জন্য যা মরণ, রাজনীতির এই কারবারীদের জন্য তা সত্যিই ‘লাইফ সেভিং’। এ রাজ্যে গেরুয়া ঝড়ের স্বপ্ন যিনি দেখেন, তিনি লাল-সবুজপন্থী বুদ্ধিজীবীদের হাত ধরাধরি করাকে কটাক্ষ করছেন। তাঁর শ্লেষে তাই গোমাংস ‘জীবনদায়ী’। তিনি নিজেও বোধহয় ভালো করেই জানেন, তাঁর নিজের দলের ক্ষেত্রেও এই মাংস কী রকম জীবনদায়ী হয়ে উঠেছে। নচেৎ ভূরি ভূরি বিদেশ সফর আর ফেসবুকে প্রোফাইল তেরঙা করে নির্বাচনে কাজের কাজটি হবে না।

গোমাতা আক্ষরিক অর্থেই যেন সন্তানদের রক্ষক হয়ে উঠেছে তাই। শ্রীশরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী একটা মজার গল্প শুনিয়েছেন ‘‘স্বামী-শিষ্য-সংবাদ’’-এ। গোরক্ষণী সভার জনৈক প্রচারক একবার স্বামীজির কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিলেন। তো স্বামীজি তাঁদের সব কথা শুনে বললেন, দেশে দুর্ভিক্ষে এত মানুষ মরছে, তাঁদের জন্য আপনারা কিছু করেন না? উত্তরে সেই প্রচারক বলেছিল, মানুষ মরছে তার কর্মফলে। পাপের কারণেই দুর্ভিক্ষ। এতে কিছু করার নেই। স্বামীজীও রেগে  উত্তর দিলেন, ‘‘‘কর্মফলে মানুষ মরছে– এরূপে দোহাই দিলে জগতে কোন বিষয়ের জন্য চেষ্টাচরিত্র করাটাই একেবারে বিফল বলে সাব্যস্ত হয়। আপনাদের পশুরক্ষা কাজটাও বাদ যায় না। ঐ কাজ সম্বন্ধেও বলা যেতে পারে– গোমাতারা আপন আপন কর্মফলেই কসাইদের হাতে যাচ্ছেন ও মরছেন, আমাদের উহাতে কিছু করবার প্রয়োজন নেই।’’’’

পরের কথোপকথন ছিল এ রকম:

প্রচারক একটু অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন, ‘ হাঁ, আপনি যা বলছেন তা সত্য, কিন্তু শাস্ত্র বলে– গরু আমাদের মাতা।’’

স্বামীজি হাসিতে হাসিতে বলিলেন, ‘ হাঁ, গরু আমাদের যে মা, তা আমি বিলক্ষণ বুঝেছি– তা না হলে এমন সব কৃতী সন্তান আর কে প্রসব করবেন?’’ বলা বাহুল্য, এই কৃতী সন্তানদের আধিক্য যেন ইদানীং বহুল সংখ্যকই।

ভোটসর্বস্ব গণতন্ত্রে দলতন্ত্রের রাজনীতি বরাবরই কোনও না কোনও ‘লাইফ সেভিং’ ড্রাগের খোঁজ করে। কখনও তা জমিদখলের বিরোধিতা, কখনও বা দুর্নীতি প্রতিরোধ। ভোট দেওয়া জনগণও জানেন তাঁদের সম্বন্ধে ‘‘আশায় মরে চাষা’’ প্রবাদটি কতখানি সার্থক। কিন্তু এই চলমান প্রকল্প যখন ড্রাগ হিসেবে মূলগতভাবে বহুত্ববাদী ভারতীয় সমাজের আঁটোসাঁটো বর্মটিই ফালা ফালা করতে উদ্যত হয়, তখন ভয় হয়।

তবে বহুত্বকে স্বীকার করে নিয়ে ঐক্যের তত্ত্ব এই দেশের ইতিহাসে বহুবার পরীক্ষিত ও জয়যুক্ত হয়েছে। আশা করা যায়, ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে। কিন্তু যত দিন না আবার তা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত হবে, ততদিন কত আখলাককে যে পাথর ছুঁড়ে ও পিটিয়ে মেরে ফেলার দায় আমাদের সবাইকে কাঁধে নিতে হবে, ভয় হয় সে কথা ভেবেই।

আরও লেখা পড়তে লিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন

যাদের পুরস্কার নেই, তারা প্রতিবাদে কী ফেরাবে?