তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া:  ‘বাবুমশায় জিন্দেগী বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি নেহি’৷ আনন্দ সিনেমার এই সংলাপ এখনও মানুষের মনে গেঁথে আছে৷ আর এই সংলাপই এখন স্থান পেয়েছে বাঁকুড়ার পুলিশকর্মী গোলোকবিহারী মাহাতোর গলায়৷ শরীরে থাবা বসিয়েছে মারণ ক্যান্সার৷ জীবনের দরজায় কাল হয়ে দাঁড়িয়েও গোলোকবিহারীর গলা থেকে বাউল কাড়তে পারে নি মৃত্যু৷ জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাউল গানকেই মুক্তির একমাত্রা রাস্তা হিসাবে বেছে নিয়েছেন গোলোকবিহারী মাহাতো৷

গোলোকবিহারী মাহাতো৷ পেশায় একজন সাধারণ পুলিশকর্মী। শরীরে মারণ ক্যান্সার থাবা বসিয়েছে। তবুও, ছেলেবেলার নেশাটাকে ছাড়তে পারেননি তিনি। দায়িত্বশীল পুলিশকর্মীর পাশাপাশি তিনি একজন বাউল শিল্পীও। সম্প্রতি গঙ্গাজলঘাটি থানায় এক অনুষ্ঠানে এই পুলিশকর্মীর একটি বাউল গানের সিডি প্রকাশ করেছেন বাঁকুড়া জেলা পুলিশ সুপার সুখেন্দু হীরা।

পুরুলিয়া জেলার কেন্দা থানার ভাণ্ডারপুয়াড়া গ্রামে জন্ম গোলোকবিহারী মাহাতোর। বাবা সামান্য কাপড়ের ফেরিওয়ালা। ছোটবেলা থেকেই দুঃখ কষ্টকে খুব সামনে থেকে দেখেছেন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই বাউল গানের প্রতি আসক্ত হন। তখন থেকেই বাবার কাছে নিয়মিত তালিম নেওয়া শুরু। একই সঙ্গে পুরুলিয়ার নিজস্ব বাউল, নাচনী, ছৌ নাচের দলেও অংশ নিয়েছেন নিয়মিত।

দারিদ্রতার কারণে উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর পড়াশুনা করতে পারেননি। তৈরি করলেন নিজস্ব বাউল গানের দল।  এতো সবের মাঝে ২০০৬ সালে রাজ্য পুলিশে কনস্টেবল পদে চাকরি পেলেন। পুলিশে চাকরির পাশাপাশি বাউল সহ অন্যান্য লোকগানের গানের চর্চাও চলছিল নিয়মিত। কিন্তু হঠাৎই ছন্দপতন। ২০১৩ সালে ধরা পড়লো শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। চিকিৎসার জন্য ছুটতে হল মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে। চিকিৎসা এখন চলছে।

আইন রক্ষার লড়াই আর ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি নিজের বাউলিয়া সত্ত্বাকে ভুলতে পারেননি তিনি। গোলকবিহারীবাবু কথা প্রসঙ্গে এই Kolkata24x7.comএর প্রতিনিধিকে বলছিলেন, ‘‘সারা জীবন তো কেউ বাঁচে না। আমিও বাঁচবো না। তবে বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা, মা আর স্ত্রী-সন্তানদের কথা ভেবে কষ্ট হয়। অনেকদিনের একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল৷ আমার নিজের লেখা গানে নিজেই সুর দিয়ে বাউল গানের ক্যাসেট করবো। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। কর্মসূত্রে মেজিয়া থানায় যোগ দেওয়ার পর নিজের এই ইচ্ছার কথা ওসি অতনু কাঞ্জিলালকে বলি। জেলা পুলিশ সুপার সুখেন্দু হীরা  ও মেজিয়া থানার ওসি অতনু কাঞ্জিলাল এই স্বপ্ন পূরণে সঙ্গী হলেন।’’

৩৭টি বসন্ত পেরিয়ে জীবনের একটি কঠিন সময়ে প্রকাশ পেলো পেশায় পুলিশকর্মী, নেশায় লোকশিল্পী গোলকবিহারী মাহাতোর গানের সিডি। লোক গানের সিডি প্রকাশ হওয়ায় ওসি অতনু কাঞ্জিলাল ও পুলিস সুপার সুখেন্দু হীরাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। তাঁদের প্রচেষ্টা ছাড়া এই ‘স্বপ্ন পূরণ’ কখনোই সম্ভব হতো না, একথা জানাতেও ভোলেননি গোলোকবিহারী মাহাতো।

গোলকবিহারী বাবুর এই লোকগানের সিডিতে মোট আটটি গান স্থান পেয়েছে। তার মধ্যে ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’ বিষয়ক জনসচেতনতামূলক ‘পুণ্যের ফলে মানব জনম/এই জীবন অকালে হারাইও না/হেলমেটটি পরে নিবে/ সবাই ভুলে যেওনা’ গানটি জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মেজিয়া থানার ওসি অতনু কাঞ্জিলাল বলেন, ‘‘গোলোকবিহারী বাবুর মতো সৃজনশীল সহকর্মী পেয়ে আমরা গর্বিত। একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী হয়েও নিজের কর্তব্যে অবিচল।’’

বাঁকুড়া জেলা পুলিশ সুপার সুখেন্দু হীরা Kolkata24x7.com-এর প্রতিনিধিকে বলেন, ‘‘গোলোকবিহারী মাহাতো একটি লোকগানের সিডি করার অনুমতি চেয়েছিলেন। আমরা সে অনুমতি দিয়েছি। উনি নিজে একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী। গুণী শিল্পী। জেলা পুলিশ সব সময় ওনার পাশে আছে।’’

মৃত্যু একদিন আসবেই৷ সেটা নিয়ে আর ভেবে লাভ কি? তার চেয়ে যতদিন জীবন আছে তা নাচে গানে ভরিয়ে নেওয়াই এখন গোলোকবিহারী মাহাতোর লক্ষ্য৷ জীবনে আর কতটা সময় আছে তা নিয়ে না ভেবে, একটা সেকেন্ডে কতটা জীবন লুকিয়ে আছে তাই ভাবছেন এই বাউলশিল্পী পুলিশকর্মী৷ মৃত্যুকে সামনে দেখেও একদিকে পুলিশকর্মী হিসাবে মানুষের সেবা করে চলেছেন, অন্যদিকে বাউলশিল্পী হিসাবে সেই মানুষেরই মনোরঞ্জন করে চলেছেন এই জীবন-মৃত্যু জয়ী সমাজসেবক৷

পচামড়াজাত পণ্যের ফ্যাশনের দুনিয়ায় উজ্জ্বল তাঁর নাম, মুখোমুখি দশভূজা তাসলিমা মিজি।