সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : দেশের স্বাধীনতার জন্য কি না করেছেন। বছরের পর বছর জেল। দ্বিপান্তর, রোগ ভোগ, জেলের অত্যাচার। নিকট সংগ্রামীদের একের পর এক চলে যাওয়া দেখতে হয়েছে সামনে থেকে। সবকিছু দিয়ে দিয়েছিলেন দেশের জন্য।

কিন্তু যে দেশের জন্য তিনি এত কিছু করলেন সেই মানুষটি তাঁর নুন্যতম সম্মানটুকুও পাননি। তখন দেশ যে স্বাধীন। আগামীর কথা ভাবতে হবে, যারা লড়েছেন বেশ করেছেন কিন্তু এবার যে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। অতীতের লড়াইকে সঙ্গে নিয়ে নয় তাকে ভুলে। এমনই একজন সম্মান না পাওয়া বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত।

বর্ধমানের খন্ডঘোষের ওয়াড়ি গ্রামে জন্ম বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্তের। কানপুরে কলেজে পড়ার সময় গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ‘প্রতাপ’-এর সঙ্গে যুক্ত হন ভগত সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত। তখন থেকেই ধীরে ধীরে দুজনে সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন।

যোগ দেন ‘Hindustan Socialist Republican Association’ সংগঠনে। শুরু হয় অস্ত্র বানানোর হাতেখড়ি ও প্রশিক্ষণ। গ্র্যাজুয়েশনের পরে পুরোমাত্রায় ডুবে যান সশস্ত্র বিপ্লবে। সেখান থেকেই ইংরেজদের ভয় দেখানোর জন্য করেন এক দুঃসাহসিক ঘটনা। সঙ্গে ছিলেন ভগত সিং। দুজনে হামলা করেন কেন্দ্রীয় সংসদ ভবনে।

দেশ জুড়ে সশস্ত্র বিপ্লব রুখতে তখন ব্রিটিশ সরকার ‘Defence of India Act 1915’ চালু করার কথা ভাবছে। এর বিরোধিতায় বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লিতে ‘Central Legislative Assembly’-তে বোমা ছোড়া প্রস্তাব রাখেন। প্রথমে ঠিক হয়‚ বোমা নিক্ষেপ ছুঁড়বেন বটুকেশ্বর এবং শুকদেব।

ভগৎ সিং চলে যাবেন সোভিয়েত রাশিয়া। পরে পাল্টে যায় পরিকল্পনা। বোমা নিক্ষেপের দায়িত্ব পান ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত। ১৯২৯-এর ৮ এপ্রিল Central Legislative Assembly-র দর্শকাসন থেকে দুটি বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন তাঁরা। সঙ্গে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ ‘ ধ্বনি। কয়েকজন আহত হলেও এই ঘটনায় কারও মৃত্যু হয়নি। শান্তভাবে গ্রেপ্তারবরণ করেন ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত।

এরপর বিস্ফোরক আইন ভঙ্গ ও হত্যা প্রচেষ্টার দায়ে গ্রেফতার করা হয় ভগৎ সিং‚ শুকদেব এবং বটুকেশ্বর দত্তকে। বিচারে বটুকেশ্বরকে আন্দামানে দ্বীপান্তরে পাঠানো হয়। জেলবন্দিদের সাথে নোংরা আচরণের বিরুদ্ধে ও রাজবন্দীর অধিকারের দাবীতে এক ঐতিহাসিক অনশনের শুরু করেন এবং কিছু অধিকার আদায়ে সক্ষম হন তাদের জন্য। আন্দামান থেকে যখন ফিরে আসেন‚ তখন বটুকেশ্বর দত্ত যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত।

দেশ জুড়ে প্রতিহত সশস্ত্র আন্দোলন। তিনি যোগ দিলেন গান্ধীজির ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে। আবার চার বছরের কারাদণ্ড। এবার গেলেন বিহারের মোতিহারী কারাগারে। ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দে বটুকেশ্বর মুক্তি পেলেও বাংলা, পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশ তার প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়। ১৯৪২ সালে আবার গ্রেপ্তার করে তাকে অন্তরীন রাখা হয় ৩ বছর।

সর্বস্বত্যাগী বিপ্লবীর শেষ জীবন বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। টিবি রোগাক্রান্ত হওয়ায় জেল থেকে মুক্তি পেলেও স্বাধীন ভারতে দারিদ্রের সাথে লড়াই করে তাঁর জীবন কেটেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৪৭ সালে বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রী ছিলেন অঞ্জলি। একমাত্র মেয়ের নাম রেখেছিলেন ভারতী। বাকি জীবন কেটেছিল দুঃসহ দারিদ্র্যে।

জীবিকা নির্বাহের তাগিদে পরিবহণ ব্যবসা করতেন। শেষ দিনগুলো ছিলেন বিহারের পাটনায়। সরকারি সাহায্য বা সম্মান বিশেষ কিছু পাননি। দীর্ঘ রোগভোগের ১৯৬৫ সালে দিল্লীর একটি হাসপাতালে প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে তার মৃত্যু হয়।

তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুসারে অন্ত্যেষ্টি হয়েছিল পঞ্জাবের ফিরোজপুরের হুসেইনিওয়ালায়। যেখানে তার ৩৪ বছর আগে রাতের অন্ধকারে শতদ্রুর জলে গোপনে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর সহযোগী ভগৎ সিং-শিবরাম রাজগুরু-শুকদেব থাপারের অস্থি।

পপ্রশ্ন অনেক: নবম পর্ব

Tree-bute: আমফানের তাণ্ডবের পর কলকাতা শহরে শতাধিক গাছ বাঁচাল যারা