তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: দামোদর আর শালী নদীর সঙ্গমস্থলে সমৃদ্ধশালী জনপদ সোমসার। বাঁকুড়ার ইন্দাসের এই গ্রামের পালেরা ব্যবসা বাণিজ্যে ফুলে ফেঁপে উঠেছিলেন এক সময়। আর সেই সূত্রেই দামোদর তীরবর্তী সোমসার গ্রামে গড়ে উঠেছিল পালেদের সুবিশাল জমিদারী। ব্যবসা মূলতঃ কলকাতা কেন্দ্রিক হলেও জমিদারীর সূত্র ধরেই গ্রামের সঙ্গে ছিল অটুট যোগাযোগ। তাঁদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন দেবী দুর্গা। যদিও কেউ কেউ অনেকে স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে এখানে দুর্গাপূজা শুরু হয়।

কথিত আছে, সোমসারের পালেরা বিলিতি কাপড়ের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ছ’টি তালুক কিনে সোমসারে সুবিশাল জমিদারি পত্তন করেছিলেন। জমিদারী প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সময়ের দাবি মেনে জমিদার বাড়িতে শুরু হয় দুর্গা পুজো। এক সময় এই বংশের চন্দ্র মোহন পালের হাত ধরে পালেদের যে উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল আজ সেসব ইতিহাস। শোনা যায় এই চন্দ্রমোহন পাল নিজের ব্যবসার প্রয়োজনে কলকাতার গঙ্গা নদীতে একটি ঘাট নির্মাণ করেন। যে ঘাটে বিদেশ থেকে জলপথে কাপড় ভর্তি বজরা এসে থামতো। যা বর্তমানে চাঁদপাল ঘাট বা বাবুঘাট নামে পরিচিত। বিলিতি বস্ত্রের ব্যবসার মুনাফায় সেই সময় কলকাতার অভিজাত এলাকায় ১০-১২ টি, বর্ধমানে ২০-২২ টির পাশাপাশি এই সোমসার গ্রামে তৈরি করেন বিশাল বাড়ি। প্রতিষ্ঠিত হয় সোমসার জমিদার বংশের।

একটা সময় ছিল যখন আলোর রোশনাই, নহবতের সুর, শৌখিন যাত্রাপালা, রামলীলা, পুতুল নাচ আর কবি গানের আসরে জমজমাট থাকতো পুজো মণ্ডপ। এলাকার জমিদার দু’হাত ভরে প্রজাদের তুলে দিচ্ছেন নতুন বস্ত্র। হিন্দু, মুসলিম, জাতি-ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে পাতপেড়ে পুজোর প্রসাদ খেতেন। আজ সেসব ইতিহাস। কাপড়ের সেই ব্যবসা নেই। নেই জমিদারী। নেই সেই সাবেকী আয়োজনও। জমিদার বাড়ির বেশীরভাগ অংশ আজ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে চলেছে। তবে এতসবের পরেও পলেস্তারা খসে পড়া অবস্থাতেও সুবিশাল রাজপ্রাসাদের একাংশ আর প্রাচীন দুর্গা পূজা বর্তমানে অতীতের সেই বনেদিয়ানার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এখন সাধ আর সাধ্যের ফারাকটা ভালো মতোই বোঝেন পাল বাড়ির বর্তমান বংশধরেরা।

তবুও এতো সব ‘নেই’ এর মধ্যে ভক্তি আর শ্রদ্ধার মিশ্রণে আছে পুজো। ঠিক কতো বছর আগে, কে এই পুজো শুরু করেছিলেন তার কোন প্রামাণ্য তথ্য নেই। কেউ বলেন আড়াইশো বছর আগে শুরু হয়েছিল, আবার কারও মতে তিনশোরও বেশী। তবুও জমিদারী প্রথা বিলোপের পরেও অতীতের সেই বনেদিয়ানা না থাকলেও নিজেদের মতো করে এখনও মাতৃ আরাধনায় মেতে ওঠেন বাঁকুড়ার ইন্দাসের সোমসার জমিদার বাড়ির বর্তমান সদস্যেরা। আজও প্রতিমা তৈরির সময় ঠাকুর দালানে ভীড় করে বাড়ির ছোটোরা। কৌতূহলভরে প্রতিমার কাঠামোর উপর মাটির প্রলেপে হাত রাখে তারা।

অতীতের সেই সোনালী দিন গুলিতে পুজোর ঠিক আগে এখানকার প্রজাদের জন্য সরাসরি কলকাতা থেকে জলপথে কাপড় বোঝাই বজরা এসে থামতো সোমসার সংলগ্ন দামোদরের ঘাটে। বস্ত্র ব্যবসা সেই সময় লাভজনক ছিল৷ সাধ থাকলেও সাধ্যের অভাবে বর্তমান বংশধরেরা সেই ঐতিহ্যবাহী বাড়ি সংস্কারের কাজেও হাত লাগাতে পারেননি। আগে যেমন ব্যবসার প্রয়োজনে যে যেখানেই থাকুন না কেন পুজোর দিন গুলিতে সোমসারে ঠিক পৌঁছে যেতেন, সেই ধারাবাহিকতা মেনে বর্তমান প্রজন্মও কর্মসূত্রে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন পুজোর দিন গুলিতে ঠিক বাড়িতে উপস্থিত থাকবেন। ঐতিহ্যের টানে এখনও এলাকার অসংখ্য মানুষ পলেস্তরা খসে পড়া আর ‘প্রাক্তন’ হয়ে যাওয়া সোমসার জমিদার বাড়ির পুজোতে অংশ নেন।

ভগ্নপ্রায় সোমসার জমিদার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পরিবারের বর্তমান সদস্য উদয় কুমার পাল বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাঁকজকম কমে গেলেও পুরণো রীতি মেনে আজও পুজো হয়। সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে এই পুজোতে অষ্টমীতে কুড়ি কেজির চালের নৈবেদ্য দেওয়া হয়। পূর্বপুরুষরা জমিদার যেমন ছিলেন তেমনি কলকাতা, বর্ধমানে কাপড়ের ব্যবসা ছিল। তখনকর মতো এখন পুজোর জাঁকজমক না থাকলেও সাধ্যমতো আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন পারিবারিক কাপড়ের ব্যবসা ছেড়ে বাসনপত্রের দোকান দিয়েছেন। ন্যুনতম আড়াইশো বছরের প্রাচীণ এই দুর্গা পুজো ও মন্দির তারা সংস্কারের চেষ্টা করছেন বলেও তিনি জানান।

পাল বাড়ির গৃহবধূ চন্দনা পাল বলেন, এখানে পুজো পাঁচ দিনের। ষষ্ঠী থেকেই পুজো শুরু হয়ে যায়। সপ্তমীতে সবাই মিলে নদীতে ঘট আনতে যাওয়া হয়। এভাবে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী তিথির পুজো শেষে নিয়মানুযায়ী দশমীতে ঘট বিসর্জন হলেও প্রতিমা নিরঞ্জন হয় একাদশীতে। ২৭ বছর আগে তিনি যখন এই বাড়ির বৌ হিসেবে আসেন তখন ঘটে পটে পুজো হতো। এখন প্রতিমা পুজো হয় জানিয়ে সাধ্যমতো জাঁকজমক করেই এখন পুজো করা হয়। পুজোর দিন গুলিতে আত্মীয় স্বজনদের পাশাপাশি প্রচুর মানুষ এখানে আসেন বলেও তিনি জানান।