তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: দৃষ্টিশক্তি জনিত প্রতিবন্ধকতাকে হেলায় হারিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় সাফল্যের নজির গড়ল বাঁকুড়ার পাত্রসায়র ব্লক এলাকার বেলুট হাই স্কুলের ছাত্রী সোমাশ্রী মালিক। তার প্রাপ্ত নম্বর ৩৮৮। সোমাশ্রীর এই সাফল্যে খুশির হাওয়া এলাকা জুড়ে।

ইন্দাসের তারিগ্রামে এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম সোমাশ্রীর। একেবারে ছোট বয়সে জন্মান্ধ নাতনী সোমাশ্রীকে পাত্রসায়রের দয়ালপুর গ্রামে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন মামা দাদু বুধন আঁকুড়ে। সেখান থেকেই আরও পাঁচ জন সাধারণ ছেলে মেয়ের মতো গ্রামের স্কুলের পাঠ শেষ করে স্থানীয় বেলুট হাই স্কুলে ভরতি হয় সে।

এই বছর পাত্রসায়র গার্লস হাই স্কুল পরীক্ষাকেন্দ্রে একজন রাইটারের সাহায্যে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় প্রতিবন্ধী সোমাশ্রী মালিক। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায় শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর জেদের কাছে হার মেনেছে।

যখন রাজ্যে দৃষ্টিশক্তি জনিত প্রতিবন্ধীদের পড়াশোনায় ব্রেল পদ্ধতি সহ অন্যান্য আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সুযোগ রয়েছে, তখন একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামে এক হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে ও ঠিকঠাক যোগাযোগের অভাবে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে এই কৃতি ছাত্রী। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়ম করে মামা তার পাঠ্য পুস্তক পড়ে শুনিয়েছেন। আর তা শুনে শুনেই সে এতো দিন মুখস্থ করে গিয়েছে৷

সামনে কঠিন লড়াই, এরপর কি হবে ভেবে উঠতে পারছে না সোমাশ্রী ও তার পরিবার। এতদিন তাকে মামা যেভাবে পড়াশোনায় সাহায্য করে গিয়েছেন তাতে সে কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতে একজন শিক্ষক হতে চায় একথা জানিয়ে সোমাশ্রী৷ বলে, তার অন্যতম পছন্দের বিষয় ইতিহাস ও বাংলা।

সোমাশ্রীর মামা দাদুরও বয়স হয়েছে। প্রায় আশি ছুঁই ছুঁই বয়সে এখনও তিনি প্রতিদিনকার সংসার খরচ ও প্রিয় নাতনীর পড়াশোনার খরচ চালাতে বাঁশের ঝুড়ি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন। আবার গ্রীষ্মের মরশুমে তালশাঁস বিক্রি করে সামান্য কিছু বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করেন। সব মিলিয়ে টানাটানির সংসারে নাতনীর ভবিষ্যৎ জীবনের পড়াশোনা নিয়ে চিন্তিত দাদু বুধন আঁকুড়ে৷ বলেন, এখনও পর্যন্ত কোন সরকারি সাহায্য পায়নি। যদি কোনভাবে কোন ধরণের সরকারি সাহায্য পাওয়া যায় তবে খুব সুবিধা হয় বলে তিনি জানান।

বেলুট হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক দিলীপ কুমার রায় গর্বিত তাঁর এই ছাত্রীকে নিয়ে। তিনি বলেন, একেবারে পঞ্চম শ্রেণী থেকেই সোমাশ্রীর সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষ তার পাশে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, একাদশ শ্রেণীতেই এই স্কুলে ভরতি হবে। ভরতি ফি সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মুকুব করার পাশাপাশি বই সহ পড়াশোনার যাবতীয় খরচ তাঁরা স্কুলের তরফে বহন করবেন বলে তিনি জানান।

স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান তাপস বাড়ি বলেন, সোমাশ্রী গ্রাম ও পঞ্চায়েতের গণ্ডী ছাড়িয়ে পাত্রসায়র ব্লক তথা আমাদের জেলার গর্ব। অতীতে তারা যেমন ওর পাশে ছিলেন আগামী দিনেও সেভাবে পাশে থাকবেন বলে তিনি জানান।

তবে এতো সবের পরেও আগামী দিনের পড়াশোনা নিয়ে চিন্তিত সোমাশ্রী ও তার বৃদ্ধ দাদু বুধন আঁকুড়ে। এলাকার মানুষ চাইছেন কোন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সহৃদয় ব্যক্তি যদি পড়াশোনার ক্ষেত্রে আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসেন৷ তবে একশো শতাংশ দৃষ্টি শক্তি এই প্রতিবন্ধী কৃতি ছাত্রীর আগামী দিনের স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হবে।