তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: কোনও কিছু না বুঝেই গাছ লাগানোর শুরুটা মাত্র আট বছর বয়সে। সেই সময় তাঁর বয়সী ছেলে-মেয়েরা খেলাধুলোয় মেতে থাকত। তিনি তখন থেকেই আশপাশ থেকে সংগ্রহ করে আনা গাছের চারা তুলে এনে পরম মমতায় সেই গাছ লাগাতেন গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে। তারপর থেকে আর থেমে থাকেননি।

সেই ছোটবেলা থেকে শুরু করে বর্তমানে ৭৩ ছুঁই-ছুঁই বাঁকুড়ার সারেঙ্গার শালবনি গ্রামের শ্যামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো সমানে লাগিয়ে চলেছেন গাছ। শুধু গাছ লাগানোই নয়, এই বয়সেও নিয়মিত পরিচর্যা করে বড় করে তুলছেন তাদের। আর এতো সবের মাঝেই কখন যে তিনি এলাকার আট থেকে আশি সকলের কাছে ‘গাছ দাদু’ হয়ে উঠেছেন, নিজেই বুঝে উঠতে পারেননি শ্যামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়।

বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা ‘গাছ দাদু’ ইতিমধ্যেই লাগিয়েছেন কয়েক হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। কি নেই সেই তালিকায়? তাল, তমাল, অশ্বথ্থ, বট, খেজুর, আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির সব গাছ। এই সব গাছ যে তিনি নিজের জমিতে লাগিয়েছেন এমন নয়। রাস্তার দু’ধার, পুকুর পাড়, কংসাবতী সেচ খালের পাড়, সরকারি পতিত জমি থেকে অন্যের ব্যক্তিগত জমি। এই গাছ লাগানোই তাঁর একমাত্র নেশা। শালবনি গ্রামের যেদিকে চোখ যায় ‘গাছ দাদু’র হাতে লাগানো গাছেদের সারি নজরে আসবে।

এই মুহূর্তে বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধে সরকারি উদ্যোগে গাছ লাগানো ও গাছ রক্ষায় ধারাবাহিক প্রচার চলছে, তার আগে থেকেই কোনও কিছু না বুঝেই শুধুমাত্র গাছেদের ভালোবেসে গাছ লাগানো ও রক্ষার কাজ শুরু করেছিলেন এই শ্যামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই কর্মকাণ্ডের জেরে বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তিনি। তাঁর এই কীর্তি প্রকাশের পর বেশ কয়েকটি সংস্থার তরফে বাড়িতে এসে তাঁকে সম্মান জানিয়ে গিয়েছে।

এ বিষয়ে শালবনি গ্রামের বাসিন্দা ধনকৃষ্ণ দাস জানান, বাজ পড়া ঠেকাতে সরকারের তরফেও বেশি সংখ্যায় তাল গাছ লাগানোর কথা বলা হচ্ছে। আর এই কাজ উনি মাত্র আট বছর বয়স থেকেই শুরু করেছেন। এখনও পর্যন্ত ‘গাছ দাদু’ শুধুমাত্র তাল গাছই পাঁচ হাজারের বেশি লাগিয়েছেন। শ্যামাপদ বন্দ্যোপাধ্যাকে তাঁর এই কাজের জন্য সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন ওই ব্যক্তি।

প্রচার বিমুখ ‘গাছ দাদু’ শ্যামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘সেভাবে কোনও কিছু ভেবে নয়, ভালো লাগে তাই গাছ লাগাই।’ মাত্র আট বছর বয়স থেকেই তার এই গাছ লাগানোর নেশা পেয়ে বসেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যতো দিন শরীর ঠিক থাকবে এভাবেই গাছ লাগিয়ে যাব।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, ‘সবাই যখন ‘গাছ দাদু’ বলে ডাকে শুনতে ভালোই লাগে।’ তাঁর কাজের জন্য সরকারি স্বীকৃতির আশা করেন না তিনি। না ৭৩ বছরের এই ‘যুবক’ সবার কাছে আজীবন ‘গাছ দাদু’ হিসেবেই পরিচিত হয়ে থাকতে চান।