তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: প্রাচীন লোক সংস্কৃতি ‘উঠোন যাত্রাপালা’ ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নিল বাঁকুড়া থিয়েটার অ্যাকাডেমি। বাংলাদেশের বিখ্যাত নাট্য পরিচালক শাহিদ সিদ্দিকিকে বাঁকুড়ায় এনে ‘কইন্যা শশীর পালা’ মঞ্চস্থের মাধ্যমে তারা এই কাজ শুরু করলেন। সম্প্রতি বাঁকুড়া শহর সংলগ্ন হরিয়ালগাড়া গ্রামে এই প্রাচীন লোক শিল্পের প্রথম মঞ্চাভিনয় হয়ে গেল।

বর্তমান সময়ের মতো যখন মানুষের মনোরঞ্জনের এত সব উপকরণ হাজির হয়নি, ঠিক তখন এই সব ‘উঠোন যাত্রাপালা’ই ছিল সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জনের এক মাত্র অবলম্বন। সময়ের দাবি মেনে বর্তমান হাজারও কেবল চ্যানেল আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে হারিয়ে গিয়েছে প্রাচীন এই লোক শিল্প।

যদিও বাংলাদেশে এখনও এই নাট্য শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। ওপার বাংলার মতো এপার বাংলার মানুষকেও খোলা আকাশের নিচে কারও বাড়ির উঠোন বা গ্রামের মাঝে ফাঁকা জায়গায় এই নাট্য শিল্পের স্বাদ দিতে দিন রাত এক করে খেটে চলেছেন বাঁকুড়া নাট্য অ্যাকাডেমির সদস্যরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিখ্যাত নাট্য পরিচালক শাহিদ সিদ্দিকির পরিচালনায় এই খোলা মঞ্চে নাটক দেখার সুযোগ পেয়ে খুশি বাঁকুড়ার নাট্য প্রেমী মানুষরা।

বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও পেশায় শিক্ষক শ্রীমহাদেব বলেন, ‘‘বাংলাদেশের অন্যতম নাট্য পরিচালক সিদ্দিকি সাহেবের পরিচালনায় আমাদের বাঁকুড়ার নাট্য শিল্পীদের দ্বারা অভিনীত ‘কইন্যা শিশুর পালা’ পালা গান দেখলাম। চিরায়ত স্রোত, চিরায়ত লোকগান, আঞ্চলিক লোক ধারার আবহের মধ্যে এই পালাগান দেখলাম। একজন লোকসংস্কৃতি প্রেমী হিসেবে এটা অনেক বড় পাওনা। সোশ্যাল মিডিয়া আর টিভি সিরিয়াল ছেড়ে এই পালাগানের আসরে খোলা আকাশের নিচে বসে অসংখ্য মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশ নিলেন।’’ এটাও একটা বড় প্রাপ্তি বলে তিনি মনে করেন।

বাঁকুড়া নাট্য অ্যাকাডেমির অন্যতম সদস্য ও এই নাটকের চরিত্রাভিনেতা অরুণাভ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। এই নাটকের মাধ্যমে আমরা দর্শকদের কতটা দিতে পারছি তা জানি না।’’ অন্যদিকে, অভিনেত্রী সুজাতা রাজা বলেন, ‘‘এই ধরনের নাটক করার অভিজ্ঞতা ছিল না। এই প্রথম সেই সুযোগ এল। অনেক পুরনো জিনিস, হারিয়ে যাওয়া লোকশিল্প দর্শকদের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ পেলাম।’’ যতক্ষণ তিনি মঞ্চে ছিলেন তার অভিনীত চরিত্রের মধ্যেই ছিলেন বলেও সুজাতা রাজা জানান।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্য পরিচালক শাহিদ সিদ্দিকি বলেন, ‘‘হাজার বছরের একটা লোকসংস্কৃতি ভারতবর্ষের বাঁকুড়ার এক গ্রামের উঠোনে মঞ্চস্থ করার সুযোগ পেলাম। এখানকার বর্তমান প্রজন্ম আদি নাট্যধারা এই পালাগান সম্বন্ধে কিছুই জানে না। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে এই নাট্যধারা এখনও টিকে রয়েছে। যতোই আমরা ভার্চুয়াল জগতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই না কেন এটাই আমাদের শিকড়। আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় আমরা বাঙালি। এই বাংলাদেশ-ভারত বলে কিছু হয় না। সাতচল্লিশ সালে শুধুমাত্র একটা ভাগ হয়েছে। কিন্তু মননে, আত্মিকে, মানসিকতায় আমরা এক। আমাদের এক ও একমাত্র পরিচয় আমরা বাঙালি। এই সুর ও ধারা আদিম কাল থেকে বয়ে চলেছে, এখনও চলছে।’’

 

বাঁকুড়া নাট্য অ্যাকাডেমির হাত ধরে সেই প্রাচীন লোক-সংস্কৃতিকে এপার বাংলার মানুষের মধ্যে তিনি ছড়িয়ে দিতে চান বলেও জানান। এই ধরনের হারিয়ে যাওয়া লোকশিল্পের সন্ধান পেয়ে খুশি দর্শকরাও। এই উদ্যোগ বাঁকুড়ার গণ্ডী ছাড়িয়ে রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ুক। এমনটাই চাইছেন বাঁকুড়া নাট্য অ্যাকাডেমির সদস্য ও কর্মকর্তারা।

পচামড়াজাত পণ্যের ফ্যাশনের দুনিয়ায় উজ্জ্বল তাঁর নাম, মুখোমুখি দশভূজা তাসলিমা মিজি।