তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: কয়েক শতাব্দী প্রাচীন বুনো শিবের গাজনে অংশ নিলেন কয়েক হাজার মানুষ। রাঢ় বঙ্গের বিভিন্ন অংশে সাধারণভাবে চৈত্র সংক্রান্তিতে শিবের গাজন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাঁকুড়ার ইন্দাসের শাশপুরের মানুষ প্রাচীন প্রথা মেনে আরও এক মাসের অপেক্ষা শেষে প্রখর তাপ প্রবাহ উপেক্ষা করে বৈশাখ সংক্রান্তিতে বুনো শিবের গাজনে অংশ নেন।

এই বুনো শিবের গাজন উৎসবে নানান লোককথা প্রচলিত আছে। তার মধ্যে সর্বজন গ্রাহ্য ও বহুল প্রচারিত লোককথা হল, কয়েকশো বছর আগে ইন্দাসের এই শাশপুর এলাকা ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। সাধারণভাবে সেই কারণেই এই জঙ্গলেই ছিল এলাকার সমস্ত গরু ছাগলের চারণভূমি। গ্রামের রাখাল বালকরা দিনের এক বিশেষ সময়ে লক্ষ্য করে একটি গরু হঠাৎ করেই কিছু সময়ের জন্য উধাও হয়ে যায়। আবার বাড়ি ফেরার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে সে দলে ফিরে আসে।

এইভাবে বেশ কিছু দিন যাওয়ার পর বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় রাখাল বালকরা ওই নির্দিষ্ট গরুটির উপর নজরে রাখে। পরে তারা লক্ষ্য করে জঙ্গলের ভিতরে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে গরুটি দাঁড়িয়ে পড়ে৷ গরুটির নিজে থেকেই বাঁটের দুধ বর্ষিত হয়ে একটি শিব লিঙ্গকে ধুইয়ে দিচ্ছে। ভীত সন্ত্রস্ত রাখাল বালকরা বাড়ি ফিরে গ্রামের সকলকে বিষয়টি জানায়। তারপরেই ওই জঙ্গল পরিষ্কার করে মন্দির নির্মাণ করে শিবের পুজো ও গাজন শুরু হয়।

জঙ্গলের মধ্যে শিব লিঙ্গ পাওয়া যাওয়ার কারণেই সম্ভবত ‘বুনো শিব’ নামকরণ বলে অনেকে জানিয়েছেন। এই গাজন উৎসবে শাশপুরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইন্দাস, বৈকুন্ঠপুর, আকুই, বনকী, মঙ্গলপুর, বামনিয়া সহ পাশের জেলা বর্ধমান, হুগলি থেকেও অসংখ্য মানুষ যোগ দেন বলে জানা গিয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুনো শিবের গাজনের জৌলুস বেড়েছে। গাজন মেলার দিনগুলিতে অসংখ্য মানুষ এখানে ভিড় করেন। নানান জিনিসের পসরা নিয়ে ব্যবসায়ীরা দোকান দেন। সব মিলিয়ে উৎসবের মেজাজে গাজনের কটা দিন কাটে এলাকার মানুষের।

এই বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও বুনো শিব গাজন কমিটির সদস্য কৌশিক সরকার বলেন, ‘খুব ছোট বয়স থেকে বুনো শিবের গাজনে আসছি। বর্তমানে গাজন পরিচালন কমিটির দায়িত্বে আছি।’ এবারের গাজনের সূচনা করেছেন স্থানীয় মঙ্গলপুর শ্রীরামকৃষ্ণ সেবা সংঘের অধ্যক্ষ প্রশান্তানন্দজী মহারাজ৷

তিনি জানান, প্রাচীন প্রথা মেনে পূজার্চনার পাশাপাশি নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত। সবচেয়ে আকর্ষণের বিষয় হল রাত গাজনের দিন আতসবাজির প্রদর্শনী। এছাড়াও কমিটির পক্ষ থেকে ধারাবাহিকতা মেনে প্রতি বছর অসহায় দরিদ্র মানুষের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।