স্টাফ রিপোর্টার, বাঁকুড়া: নেই রাজা নেই তাঁর সভাসদ। নেই আর তাঁর সাম্রাজ্য। রাজতন্ত্র যুগের অবসান ঘটেছে সে অনেকদিন আগেকার কথা। শুরু হয়েছে গণতন্ত্রের। তাই বলে রাজবাড়ির নিয়ম কানুন সব বিসর্জন যাবে? তাই আবার হয় নাকি। তাইতো শতাব্দী পেরিয়ে আজও বাঁকুড়া জেলায় বিষ্ণুপুর রাজবাড়িতে মল্ল রাজাদের প্রাচীন রীতিনীতি মেনে আজও চলে আসছে দুর্গা পুজো।

জানা গিয়েছে, বিষ্ণুপুর রাজ বাড়িতে মা দুর্গার নাম ‘মৃন্ময়ী’। ৩০৩ মল্লাব্দে, বাংলার ৪০৪ সালে এই পুজোর প্রচলন করেন মহারাজা জগত মল্ল। সে সময়, সম্পূর্ণ গঙ্গা মাটির প্রতিমা চালচিত্র নির্মাণ হত। ডান দিকে কার্তিকের নিচে সরস্বতী, বাঁ-দিকে গণেশের নিচে লক্ষ্মী, উপরে ভূত-প্রেত নিয়ে নন্দী-ভৃঙ্গি সহ শিব, মাঝে অসুরের সঙ্গে যুদ্ধরত দুর্গা। ফলে প্রথা মেনে ঢাকে কাঠি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানে শুরু হয়ে যায় পুজো।
জানা গিয়েছে, পূর্ব প্রথা মতই প্রাচীণ রীতি মেনে মহাষ্টমীর সন্ধিক্ষণে বিষ্ণুপুর রাজ বাড়িতে শুরু হয়ে গেল ‘বড় ঠাকরুন’-এর দুর্গোৎসব।

সূত্রের খবর, রাজবাড়ির উলটো দিকে গোপালসায়রে নবপত্রিকার স্নান পর্ব শেষ হতেই গর্জে ওঠে তিনটি কামান। প্রথা মেনেই মৃন্ময়ী মন্দিরে পটদুর্গা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আরও তিনটি। সবশেষে দুপুরে ভোগপর্বের পর ফের দাগা হয় তিনটি তোপ। জানা গিয়েছে প্রতি বছর এই কামান গর্জানোর সঙ্গে সঙ্গেই যেন মল্ল রাজাদের রাজধানী বিষ্ণুপুর জেনে যায় রাজবাড়ির পুজো শুরুর কথা ।

জানা গিয়েছে, এখানে অষ্টমীর সন্ধিক্ষণ ঘোষণা করা হয় বড় কামানের গর্জনের শব্দে। যার আওয়াজে রাজবাড়িতে আরতি নৃত্যও শুরু হয়ে যায় বলে জান্স গিয়েছে। মহানবমীর খচ্চর বাহিনীর পুজোও বেশ বৈচিত্রময়। মাঝ রাতের এই পুজোয় রাজবাড়ির সদস্য ও পুরোহিত ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ। জনশ্রুতি, এই দেবী মহামারির হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করেছিলেন। দেবীর রূপ দর্শন না করে পিছন ফিরে এখনও পুজো করেন পুরোহিত। মল্লরাজারা নেই, সময়ের বাঁকে হারিয়ে গিয়েছে সেই রাজত্বও। তবু রাজবাড়ির পুজো রয়ে গেছে প্রথা আর নানা কাহিনিকে আঁকড়ে বিষ্ণুপুর ছাড়িয়ে বাঁকুড়া জেলার প্রতিটি মণ্ডপে মণ্ডপে।

বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের ইতিহাস থেকে জানা যায় মল্লরাজা জগৎ মল্ল ৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে, (বাংলা ৪০৪ বঙ্গাব্দ ও ৩০৩ মল্লাব্দ) দেবী প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর থেকেই এই ধারাবাহিকতা সমানে বজায় আছে। মল্লরাজারা নেই। কিন্তু আজও সেই প্রাচীন প্রথা মেনে হয় আসছে পুজোও। পুরনো রীতি মেনে পনের দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে গেল পট পুজোও। বংশ পরম্পরায় এখনও শহরের শাঁখারি বাজারের ফৌজদার পরিবারের পটুয়ারা সরবরাহ করেন পট। জিতাষ্টমির পর দিন মোর্চা পাহাড়ে কামানের তোপধ্বনির মাধ্যমে শুরু হয়।

এদিন প্রাচীন রীতি মেনে হস্ত লিখিত নারায়ণী পুঁথি মেনে নয় বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে গোপালসায়র থেকে দেবী মহাকালী অর্থাৎ বড় ঠাকুরানিকে মন্দিরে আনা হয়। ঠিক একইভাবে মেজো ঠাকুরানি অর্থাৎ দেবী মহা লক্ষ্মীকে মান চতুর্থীতে আর ছোট ঠাকুরানি অর্থাৎ দেবী সরস্বতী আসেন সপ্তমীতে।