তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: বাঁকুড়া সহ রাঢ় বঙ্গের এক সময়ের অন্যতম বড় লোক উৎসব ‘ভাদু পুজো।’ কিন্তু এই মুহূর্তে অন্যান্য জায়গার মতো দক্ষিণের এই জেলার সর্বত্রও লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া।সহজ কথায় বলতে গেলে আরো অনেকের মতো পাশ্চাত্য সংস্কৃতির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছেন এখানকার সিংহভাগ মানুষ। ফলে আগের মতো ‘ভাদু পুজো’কে কেন্দ্র করে মানুষের মাতামাতি নজরে পড়েনা।

তবে এসবের মাঝেও বাঁকুড়া আছে বাঁকুড়াতেই৷ ভাদ্র মাসের শেষ দিনটিতে প্রাচীন এই লোক-উৎসবের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন এখানকার মানুষ৷ বিক্রি হবে এই আশা নিয়ে এখনো ভাদু প্রতিমা তৈরী করেন তালডাংরার পাঁচমুড়া, বিবড়দার কুমোরপাড়ার শিল্পীরা।

আরও পড়ুন : পাটের তৈরী মাইক্রো দুর্গা প্রতিমা তৈরী করে চমক পলতার শিল্পী

রাঢ় বঙ্গ সহ বাঁকুড়ায় ভাদু উৎসবের ইতিহাস বহু পুরনো। প্রাচীন এই লোক উৎসবকে ঘিরে অনেক লোককথা প্রচলিত রয়েছে। যদিও কোনটিরই প্রামাণ্য কোন তথ্য নেই। তার মধ্যে জনপ্রিয় লোককথা হলো, বর্তমান পুরুলিয়া জেলার কাশীপুর রাজবাড়ির রাজকন্যা ভদ্রাবতী। রাজবাড়িতে সবাই তাঁকে আদর করে ‘ভাদু’ নামে ডাকতেন। রাজবাড়ির বাইরে প্রজাদের কাছেও অত্যন্ত প্রিয় পাত্রী ছিলেন ভাদু। ভাদু বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠলে বীরভূমের এক রাজপুত্রের সঙ্গে ভাদুর বিয়ে ঠিক করা হয়। কিন্তু বিয়ের দিন সেই বর বেশী রাজপুত্র কাশীপুর রাজবাড়িতে আসার পথে ডাকাতদের হাতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

এই খবর রাজবাড়িতে পৌঁছলে শোকের ছায়া নেমে আসে সেখানে। খবর যায় কনেবেশী ভাদুর কাছেও। তিনি সেই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে রাজবাড়ির সামনের এক পুকুরের জলে ডুবে আত্মঘাতী হন তিনি। তখন থেকেই রাজকন্যা ভাদুর স্মৃতি রক্ষার্থে ‘ভাদু উৎসবে’র সূচনা বলে অনেকে মনে করেন। আর সেই কারণেই হয়তো ভাদু উৎসবে কোনও মন্ত্র নেই। বৈদিক মন্ত্রপাঠের জায়গা দখল করেছে ভাদু গান। যা এই এই উৎসবের অন্যতম প্রধান অঙ্গ। কারণ ভাদু এখানে কোন লৌকিক দেবী নন। ঘরের মেয়ে।

তবে সময় বদলেছে। মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে বাঁকুড়াবাসীর কাছে ভাদু নিয়ে উন্মাদনা কমেছে। জেলার প্রায় সব কটি ব্লকেই এখন ভাদু উৎসব এখন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই হওয়ার পথে। একটা সময় এই উৎসবের সঙ্গে আঞ্চলিক অর্থনীতির একটা বিশেষ যোগ ছিল৷ শারদোৎসবের আগে ভাদু প্রতিমা তৈরী করে অনেক শিল্পীই পুজোর খরচ তুলতেন। ভাদু নিয়ে মানুষের মাতামাতি কমেছে, আর তেমন বিক্রি হয়না প্রতিমাও। ফলে আঞ্চলিক অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই মুহূর্তে।

কেমন আছেন ভাদু প্রতিমা তৈরীর সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা। তা দেখতেই আমরা পৌঁছৈ গিয়েছিলাম ‘টেরাকোটার দেশ’ বলে পরিচিত তালডাংরার পাঁচমুড়া গ্রামে। খুব ছোটো বেলা থেকে টেরাকোটার অন্যান্য দ্রব্য তৈরীর পাশাপাশি ভাদু প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ষাটোর্দ্ধ হেলারাম কুম্ভকার বলেন, এখনকার মেয়েরা আঞ্চলিক সংস্কৃতি নিয়ে আর এতোটা ভাবেনা। ভাদু নিয়েও নেই তেমন কোন উন্মাদনা। সবাই এখন পড়াশুনামুখী, ফলে ভাদু পুজো করে সময় কাটানোর সময় তাদের নেই। এবছর মাত্র দু’শো প্রতিমা তিনি তৈরী করেছেন। শেষ মুহূর্তে পৌঁছেও সব ক’টি প্রতিমা বিক্রি হবে কিনা এখনো নিশ্চিত নন তিনি।

আরও পড়ুন : স্মার্টফোন আর ইউটিউবের দাপটে কাজ উঠেছে মাথায়, পেশাহারা রেডিও মেকানিকরা

ভাদু প্রতিমাতে রং করার ফাঁকে মহিলা শিল্পী মমতা কুম্ভকার বলেন, একটা সময় ভাদু বিক্রির টাকাতেই বাড়ির সবার পুজোর জামা, কাপড় কেনা হয়ে যেত। এই বিক্রি নেই, ফলে সেই পথ বন্ধ। মেয়েরা পড়াশুনার প্রতি আরো বেশী আগ্রহী হয়ে পড়াতেই ভাদুর কদর কমছে বলে তিনিও মনে করেন।

একটা সময় ছিল যখন পুরো ভাদ্র মাস ভাদু প্রতিমা বাড়িতে রেখে পুজো করা হত, এখন সেখানে ভাদ্র সংক্রান্তির চার পাঁচ দিন আগে বাড়িতে প্রতিমা আনা হয়। কেউ কেউ পুজোর দিনেও তা কিনে আনেন। এই পুজোতে কোনও পুরোহিত বা মন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে না। ভাদু গানই এই উৎসবের প্রধান অঙ্গ। তাছাড়া নৈবেদ্য হিসেবে জিলিপি আর বাড়িতে তৈরী বিভিন্ন ধরণের পিঠে দেওয়া হয়৷

এবিষয়ে দীর্ঘদিন লোকসংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে যুক্ত, বিশিষ্ট লেখক পার্থসারথী গোস্বামী এবিষয়ে বলেন, গ্রামের মেয়েদের হাতেও এখন সময় অনেক কম। লেখাপড়ার সুযোগ বৃদ্ধি হওয়ায় ইঁদুর দৌড়ে তারাও আজ পিছিয়ে নেই। পাশাপাশি গ্রামের মানুষও এখন ভীষণভাবে শহরমুখী, ফলে প্রায় লোকশূণ্য হয়ে পড়ছে গ্রাম গুলি। একই সঙ্গে টিভি, মোবাইল আর ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তিও এই ভাদু উৎসবের আনন্দ ম্লান হওয়ার পিছনে অনেকটাই দায়ী বলে তিনি মনে করেন।