তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: বাঁকুড়ার হীড়বাঁধের প্রত্যন্ত গ্রাম দোমোহানিতে আদিবাসী রমণী সরস্বতী হাঁসদার হাতে দেবী দুর্গা পূজিত হন। ‘মারাং বুরু যাহা ইয়ুব মায়েন’ মন্ত্রে মায়ের আরাধনা হয়। এখানে নেই থিমের ভাবনা, নেই আলোর জৌলুস। সাঁওতালী ভাষাতেই মন্ত্রোচারণে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে নিয়ম ও নিষ্ঠাভরে দেবী দুর্গার আবাহন করে আসছেন জঙ্গল মহলের সরস্বতী হাঁসদা।

সারা বছর নিত্য পুজো হলেও সপ্তমী থেকে দশমী নিয়ম মেনেই এখানে পুজো করেন সরস্বতী দেবী। ঝাঁ-চকচকে কোন মন্দির নয়, খড় আর পলিথিন দিয়ে ঢাকা চালা ঘরেই এখানে মা দুর্গার অধিষ্ঠান। সারাবছর প্রতিমা রেখে পুজো হলেও শারদোৎসবের শুরুর দিন সপ্তমী তিথিতে নবনির্মিত দুর্গা প্রতিমা এনে পুজা শুরু হয়।

যদিও তার আগে পুরনো প্রতিমা অন্যত্র নতুন কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়। পরে সেই প্রতিমা বিজয়া দশমীর পর দিন একাদশী তিথিতে বিসর্জন দেওয়া হয় হয়। কিন্তু এবছর নানান কারণে নতুন প্রতিমা তৈরী সম্ভব হয়নি। পুজো হবে পুরাণো প্রতিমাতেই।

কিন্তু প্রায় কুড়ি বছর আগে যখন এই পুজো শুরু হয়, সেই শুরুর দিন গুলো খুব সুখের ছিলনা সরস্বতী হাঁসদা ও তাদের পরিবারের লোকেদের কাছে। আদিবাসী সমাজে মূর্তি পুজোর প্রচলন নেই। ফলে দেবী দূর্গার মূর্তি তৈরী করে পুজোর বিরোধীতা করেছিলেন আদিবাসী সমাজের অনেকেই। বিষয়টি থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। সমস্ত ঝড় ঝাপটা সহ্য করে নিজেদের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন সরস্বতী হাঁসদা।

তিনি বলেন, স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর পুজো শুরু করতে গিয়ে গ্রামের মানুষের বাধার সম্মুখীন হই। আমাদের আদিবাসী সমাজে মূর্তি পূজার প্রচলন নেই, এই অজুহাতে অনেকেই পুজো বন্ধের কথা বলেন। পরে হীড়বাঁধ থানার মধ্যস্থতায় সমস্যার সমাধান হয়, পুজো শুরু হয়।

কিন্তু এতো সবের পরেও সরস্বতী হাঁসদার আক্ষেপ, রাজ্যের অসংখ্য পুজো সরকারী সাহায্য পাচ্ছে। বহু আবেদন নিবেদন পরেও সেই সরকারী সাহায্য থেকে বঞ্চিত তাদের পুজো। আদিবাসী সমাজের এই পুজোর টানে যখন এরাজ্যের মেদিনীপুর, কলকাতা, বর্ধমান ছাড়িয়ে ওড়িশা থেকেও মানুষ আসেন। কিন্তু তার পরেও তার কেন সরকারী সাহায্য থেকে বঞ্চিত সেবিষয়ে প্রশ্ন তোলেন দেবী দুর্গার এই আদিবাসী পুজারিণী।

সরস্বতী হাঁসদার ভাগনে রবিলোচন হেমব্রম বলেন, এখানে কোন ব্রাহ্মণ পুরোহিত নয়, একজন মহিলা পুজো করেন। তেমনি যেকোন ধরণের বলিপ্রথা এখানে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ বলেও তিনি জানান।

এক দিন স্বপ্নাদেশে পুজো শুরু করতে গিয়ে সরস্বতী হাঁসদা বাধা পেলেও এখন গ্রামের সবাই অপেক্ষা করে থাকেন বছরের এই চারটি দিনের জন্য। তাই এখন আর হাঁসদা বাড়ির পুজো নয়, এইপুজো এখন সার্বজনীন। তাই লক্ষ-কোটি টাকা মূল্যের থিমের চাকচিক্য আর আলোর রোশনাই না থাকলেও শান্তি আর প্রাণের এই পুজোয় দোমোহানি গ্রামের মানুষ এই চারদিন সব আনন্দ চেটে পুটে ভাগ করে নেন নিজেদের মধ্যে।

স্বামীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বস্ত্র ব্যবসাকে অন্যমাত্রা দিয়েছেন।'প্রশ্ন অনেকে'-এ মুখোমুখি দশভূজা স্বর্ণালী কাঞ্জিলাল I