তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: এক দিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, অন্য দিকে ইতিহাসের পদধ্বনি। এই দুইয়ের টানে চলতি পর্যটন মরশুমে পর্যটকদের ঢল নেমেছে বাঁকুড়ার জয়পুরে। রাজ্য ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পরিযায়ী পর্যটক এখানে ছুটে আসছেন। আর সেই সব পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য দিতে চেষ্টার কসুর করছেন না স্থানীয় প্রশাসন।

‘বাঁকুড়ার জয়পুর’ বললেই সবার প্রথমে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘন শাল, মহুল, পিয়াশাল, বহেড়া, হরিতকির এক বিশালাকার জঙ্গল। ৬হাজার ৩৩১ হেক্টর জায়গা নিয়ে এই বনাঞ্চলে ভাগ্য সহায় হলে দেখা মিলতে দলমার দাঁতালদের। তাছাড়া হরিণ, ময়ূর, বন শুয়োরদের অবাধ এই বিচরণ ক্ষেত্রে মন ভালো করা পরিবেশে কিছুটা সময় নিজের মতো করে কাটানোর সুযোগ মিলবে।

এই জঙ্গলেই রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। আর এখান থেকেই সহজেই দেখা মিলতে পারে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো ময়ূর আর হরিন। এখান থেকেই খুব কাছেই রয়েছে বাঁকুড়া জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাশয় সমুদ্র বাঁধ। প্রশাসনের উদ্যোগে এখন এই সমুদ্র বাঁধে শুরু হয়েছে বোটিং এর ব্যবস্থা। পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে জয়পুর পঞ্চায়েত সমিতি তৈরী করেছে ‘বনবিতান’ লজ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি ইতিহাস প্রেমী মানুষ ঘুরে দেখছেন বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির ও স্থাপত্য ভাস্কর্য৷ পাশাপাশি মল্লরাজাদের প্রাচীন রাজধানী প্রদ্যুম্নগড় ঘুরে দেখছেন পর্যটকরা। তাছাড়া এই এলাকায় মল্লরাজাদের তৈরী অসংখ্য টেরাকোটা সমৃদ্ধ মন্দিরের পাশাপাশি রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের তৈরী সুবিশাল রানওয়ে।

ফলে জল, জঙ্গল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, প্রাচীন স্থাপত্য ভাস্কর্যের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে বাঁকুড়ার জয়পুরে। যার টানেই চলতি মরশুমে পর্যটকের ঢল নেমেছে এখানে।

মুকুটমনিপুর, শুশুনিয়া, বিষ্ণুপুর ঘুরে জয়পুরে আসা পর্যটক মধুছন্দা ঘোষ বলেন, সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ করলাম। জয়পুর জঙ্গলে হাতির গল্প শুনেছিলাম। ‘জঙ্গল সাফারি’তে গিয়েও হাতির দেখা না পাওয়ায় কিছুটা হতাশ বলেই তিনি জানান।

জয়পুরের বিডিও বিট্টু ভৌমিক বলেন, বাঁকুড়া জেলা পর্যটন মানচিত্রে জয়পুর বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক দুই ধরণের সম্পদেই সমৃদ্ধ আমাদের জয়পুর এলাকা। এখানকার সমুদ্রবাঁধকে আরো আকর্ষণীয় ভাবে সাজানোর কাজ চলছে। ইতিমধ্যে বোটিং চালু হয়েছে। তাছাড়া ঐ বাঁধের ঠিক মাঝে যে দ্বীপের মতো জায়গা রয়েছে, সেখানে বসে যাতে পর্যটকরা জলখাবার খেতে পারেন তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জয়পুরে বেড়াতে সমস্ত মানুষকে প্রশাসনের তরফে সমস্ত রকম সাহায্য করা হবে বলেও তিনি জানান।

স্থানীয় বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী শ্যামল সাঁতরা বলেন, এখানে বিস্তীর্ণ বনভূমিকে কেন্দ্র করে পিকনিক স্পট রয়েছে। তাছাড়া বৈতলের কাছে ঝগড়াই মায়ের মন্দির, শ্যাম রায়ের মন্দির, সলদা অঞ্চলে গোকুল চাঁদের মন্দির, শিব মন্দির রয়েছে। এছাড়া রাজগ্রাম, রাউৎখণ্ড, জয়পুরের হাট তলা, দে পাড়া সহ প্রায় পুরো ব্লক এলাকা জুড়েই অসংখ্য প্রাচীন স্থাপত্য, ভাস্কর্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

একদিকে বিস্তীর্ণ বনভূমি অন্যদিকে মল্ল রাজাদের বিভিন্ন কীর্তি, প্রাচীন রাজধানী প্রদ্যুম্নগড়কে কেন্দ্র করে অনেক মন্দির, পরিখা রয়েছে। সেকারণেই একদিনের জন্য জয়পুর ব্লক এলাকা ঘুরে দেখার ক্ষেত্রে ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে অন্যতম পছন্দের জায়গা হিসেবেই চিহ্নিত হতে চলেছে বলে তিনি জানান।