সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্টি বন্দে মাত‌রম্ হয়ে উঠেছে এদেশের স্বদেশপ্রেমের সঞ্জীবনী মন্ত্র। ধরা হয় আনুমানিক ১৮৭৫/৭৬ সাল নাগাদ এটি প্রথম রচনা করা হয়। যার জন্য ১৯৭৬ সাল বন্দে মাতরম্ সংগীতের শতবর্ষ পূর্তির বছর হিসেবে পালন করা হয়েছিল।

এর রচনাকাল সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্রের অনুজ পূর্ণচন্দ্র এবং নীল দর্পণ নাটকের রচয়িতা দীনবন্ধু মিত্রের পুত্র ললিতচন্দ্র তাদের লেখায় আলোকপাত করেছেন। তবে প্রথম বন্দে মাতরম্ লেখার পিছনে এমন একটি অদ্ভুত ঘটনা রয়েছে যা শুনলে অবাক হতে হয়।

পূর্ণচন্দ্র তার বঙ্কিম প্রসঙ্গ বইতে জানিয়েছিলেন, তার দাদাকে বন্দে মাতরম্ গানটি লিখতে হয়েছিল বঙ্গদর্শন পত্রিকার একটি পাতার ফাঁকা অংশ ভরাট করার জন্য। এটা হয়তো অনেকের জানা আছে, পত্রপত্রিকা সম্পাদনার সময় দেখা যায় যেসব লেখাগুলি এসেছে তা দিয়ে সবকটা পৃষ্ঠা ভরাট হচ্ছে না। কোনও পৃষ্ঠায় কয়েক লাইন ফাঁকা থেকে গিয়েছে। তখন সে গুলি ভরাট করার জন্য ছোট ছোট কবিতা অথবা গদ্যাংশ কিংবা উদ্ধৃতির আশ্রয় নিতে হয়।

এইরকম একটা ঘটনা ঘটে যখন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসে বঙ্গদর্শনের প্রুফ রিডার তাকে জানান, প্রেসে ম্যাটার কিছুটা কম পড়েছে। কতটা তা জিজ্ঞেস করে বঙ্কিম জানতে পারেন, বারো পনেরো লাইনের মতো জায়গা রয়ে গিয়েছে। বঙ্গদর্শন বেরোনোর সময় হয়ে এসেছে, অর্থাৎ আর হাতে সময় নেই। ওই ফাঁকা জায়গাটা অবিলম্বে ভরাট করা প্রয়োজন। কি লিখে ভরাট করা যায় ভাবতে থাকেন বঙ্কিম।

মাথায় এলো বন্দে মাতরম্ কথাটা। তারপর লিখে ফেললেন সংস্কৃত বাংলা মিশিয়ে লাইনগুলো বন্দে মাতরম্/সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্……..।

পরবর্তীকালে অবশ্য বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৮২ সালে আনন্দমঠ উপন্যাসে বাংলা সংস্কৃত মিশ্রিত এলাইন কয়েকটি গান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। দেশমাতৃকার বন্দনার এই গানটি ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বন্দে মতরম শব্দযুগল স্বাধীনতা আন্দোলনে স্লোগান হয়ে যায়।

১৮৯৬ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে

সর্বপ্রথম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গাওয়া হয় বন্দে মাতরম গানটি। উক্ত অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।পাঁচ বছর বাদে ১৯০১ সালের কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেন দক্ষিণাচরণ সেন। ১৯০৫ সালে কংগ্রেসের বারাণসী অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেছিলেন সরলা দেবী চৌধুরানী।

এদিকে আবার ১৯০৯ সালে শ্রী অরবিন্দ Mother, I bow to thee! শিরোনামে বন্দে মাতরম্ গানটির ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। ইংরেজি ভাষায় এই অনুবাদটি বহুল প্রচলিত হয়।

তথ্য ঋণ: অশোক কুমার রায় সম্পাদিত “বন্দে মাতরম্ প্রেরণা ও বিতর্ক” বইটিতে নারায়ণ চৌধুরীর লেখা প্রবন্ধ
‘বন্দে মাতরম্ ধ্বনির রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র’
এবং
উইকিপিডিয়া

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV