সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় , কলকাতা : শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সঙ্গে তাঁর প্রথম আলাপে ঠাকুর তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন , “তুমি আবার কার ভাবে বাঁকা গো?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন , “সাহেবের জুতোর গুঁতোয়”। তিনি সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কলকাতা এবং হাওড়া বিভিন্ন স্থানে তাঁর স্মৃতি বর্তমান কিন্তু গঙ্গার দুই পাড়ের শহরেই কোথাও তিনি বিস্মৃত কোথাওবা তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িগুলি ভুগছে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে। অন্যতম কলকাতার ৫, প্রতাপ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িটি। অনেকটা শ্রী শ্রী ঠাকুরের কথার মতো, সাহিত্য সম্রাটের স্মৃতি বেঁকে চুরে একসা।

কলেজ স্ট্রীট চত্বরের সরু গলির মধ্যে অবস্থিত আসল বাড়ি অনেক আগেই ভেঙে ধ্বসে পড়ে গিয়েছিল। ২০০৬ সালে বাড়ি ভেঙে সেই জায়গায় বঙ্কিম গ্রন্থাগার করা হয়। গ্রন্থাগার রয়েছে। সদস্য সংখ্যাও মোটামুটি ভালোই। নতুন বই কম্পিউটার চিলড্রেন সেকশন এসব নানাবিধ ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরু গলির ভিতর শান্ত পরিবেশের এই লাইব্রেরীর ভিতরের অংশ যতটা উন্নত ততোধিক খারাপ অবস্থা রাজ্য সরকারের মডেল লাইব্রেরীর তকমা পাওয়া ৫, প্রতাপ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বঙ্কিম স্মৃতি বিজড়িত ৬ কাঠা এক ছটাক জায়গার উপর অবস্থিত নবনির্মিত এই ভবন।

সাহিত্য সম্রাটের জন্মদিন উপলক্ষে আজ সকাল বেলা লাইব্রেরীতে আলোচনা সভা হয়েছে। করা হয়েছে বঙ্কিমের আবক্ষ মূর্তিতে মাল্যদান। এসব থেকে চোখ সরিয়ে বাড়ির দিকে তাকালেই অবাক হতে পারেন। পনেরোও পেরোয়নি তার মধ্যেই চাঙর খসে পড়েছে একাধিক জায়গা থেকে। জানলার কাঁচ ভেঙে গিয়েছে, শিক বেড়িয়ে পড়েছে। মূর্তির পাশেই পড়ে রয়েছে একটি কেটে ফেলা গাছ। বিভিন্ন জায়গা থেকে কাপড়, ব্যাগ , জামা ঝুলছে যা সম্ভবত বঙ্কিমের প্রাপ্য ছিল না।

লাইব্রেরীর গ্রন্থাগারিক দেবাশিস গুপ্ত বলেন , “এই লাইব্রেরীকে মডেল লাইব্রেরী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক নতুন বই আনা হচ্ছে , এখন সদস্যদের থেকে চাঁদাও নেওয়া হয় না। সরকারী নির্দেশ মেনে কাজ হচ্ছে। তবে বাড়িটার অবস্থা ভালো নয়। দেখতেই পাবেন বাইরের অনেক অংশই ভেঙে গিয়েছে। আমরা সরকারকে আর্থিক সাহায্যের জন্য চিঠি পাঠিয়েছি। আশা করি অর্থ আসবে, কাজ হবে।”

এই বাড়ির ইতিহাস কি ? দেবাশিসবাবু বলেন , “এই বাড়িতে উনি জীবনের শেষ সাত বছর কাটিয়েছেন। এই বাড়িতে বসেই তিনি রচনা করেছিলেন তার সীতারাম উপন্যাস। বাড়িতে আসতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে স্বর্ণকুমারী দেবীর মতো ব্যক্তিত্ব। ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল এই বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাহিত্য সম্রাট।” বাড়ি ভেঙে নবনির্মিত বাড়ির অবস্থা খারাপ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে।

হাওড়ার পঞ্চাননতলা রোডের তাঁর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটির অবস্থাও একই। পুরসভা থেকে অনেক চেষ্টা করেও বাড়ির শরিকি সমস্যা মেটাতে পারেনি। গত বছর চারেক ধরে পুরসভা বারবার বঙ্কিম পার্কের বঙ্কিম মেলা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে বলেছিল ওই বাড়ি সংগ্রহশালা হবে, দেখার মতো করে দেওয়া হবে। আদতে কিচ্ছু করা যায়নি। এই বছরেও বঙ্কিম মেলা হচ্ছে। বাড়ি যেমন ছিল ইট বেড়িয়ে যাওয়া তেমনই রয়েছে। প্রসঙ্গত হাওড়ার পুরবোর্ডের মেয়াদই ফুরিয়ে গিয়েছে। কবে পুরসভা ভোট হবে তার উপর বিষয়টা নির্ভরশীল। পাশাপাশি রাজ্যে পালা বদল হলে তার প্রভাব কিভাবে সে বাড়িতে পড়বে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ বঙ্কিমকে নিয়ে বিজেপি বেশি আগ্রহ দেখায়।

শেষে অবাক করবে বাবুঘাট সংলগ্ন চার মাথার মোড়ে বঙ্কিমের যে বিশাল মূর্তিটি রয়েছে সেটিতে মাল্যদানের কোনও বালাই নেই। চিত্র দুপুর বারোটার। মূর্তির চারিদিকে রাজ্য সরকারের পর্যটন মেলার বিজ্ঞাপন দেওয়া। ২৬ জুন সাহিত্য সম্রাটের জন্মদিন তাই একটু রংচং করার জন্য কয়েকজনকে দেখা গেল মই নিয়ে হাজির হয়েছে। এমনই শ্রদ্ধা এবং সম্মানজ্ঞাপনের ঢল।