লিখলেন জয়ন্ত রায়- ব্যক্তি-পুঁজির হাত থেকে শিল্পের রাহুগ্রস্ত অবস্থার অবসান ঘটিয়ে বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে যে কর্মচারীরা ছিলেন সংগ্রামের সামনের সারিতে, যাঁদের অবদানে ব্যাঙ্কশিল্পের সিংহভাগই এসেছিল সরকারী ব্যবস্থাপনায় ১৯৬৯-এর ১৯শে জুলাই,

এবং তারপরে আবার ১৯৮০-তে; যাঁদের প্রচেষ্টা আর কর্মকুশলতায় সারা দেশেই সম্ভব হয়েছিল শিল্পের ব্যাপক প্রসার, দেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ব্যাঙ্কের সম্প্রসারণ, লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের বিস্তার, কৃষির ক্ষেত্রে ‘সবুজ বিপ্লব’ ইত্যাদি … তাঁরা সকলেই আজ অবসরপ্রাপ্ত অথবা মৃত।

জয়ন্ত রায়

ব্যাঙ্কশিল্পে পেনশন প্রদান শুরু হয় সর্বপ্রথম রিজার্ভ ব্যাঙ্কে ১৯৯০-এ, নাবার্ডে ১৯৯২-এ; আর অন্যান্য ব্যাঙ্কে ১৯৯৩ সালের পেনশন রেগুলেশন এ্যাক্ট অনুযায়ী ১৯৯৫ সাল থেকে।

সেই সময় ১৯৮৬ সাল থেকে অবসৃতদেরও এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু এই দুটি ব্যাঙ্ক ছাড়া বাকি সমগ্র শিল্পে যে ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছে আজ পর্যন্ত তা এক নির্মম পরিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে পেনশনভোগীদের কাছে। (অবশ্য স্টেট ব্যাঙ্কের পূর্বসূরী ইম্পিরিয়াল ব্যাঙ্কে এক বিশেষ পেনশন লাগু ছিল)।

এই শিল্পে কর্মচারিদের সংগঠনগুলি এবং ব্যাঙ্কারদের সংগঠন (আই বি এ)-এর মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মধ্য দিয়ে বেতন-কাঠামো এবং চাকুরির শর্তাবলীর সংশোধন ও উন্নীতকরণের ব্যবস্থা চালু হয়েছে ১৯৬৬ সাল থেকে,– প্রথম দিকে তিন/চার বছরের মেয়াদে এই ব্যবস্থা কার্যকরী হলেও পরে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলি কার্যকরী হয়ে আসছে।

সাম্প্রতিকতম চুক্তি—একাদশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, কার্যকরী হবে ২০১৭’র ১লা নভেম্বর থেকে। এই চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে শিল্পে ইউ এফ বি ইউ’র অন্তর্ভুক্ত মোট নয়টি সংগঠনের মধ্যে আটটির সাথে গত ২২শে জুলাই, ২০২০ একটি মৌ (মেমোর‍্যান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ঐ দিন থেকে ৯০ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ২০শে অক্টোবরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি রূপায়িত করার কথা।

অবশ্য ইউ এফ বি ইউ’র অন্তর্ভুক্ত একটি সংগঠন – বি ই এফ আই (ব্যাঙ্ক এমপ্লয়ীজ ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া) নীতিগত কারণে এই ‘মৌ’তে সই করেন নি।

প্রতিটি চুক্তি সম্পাদনের সাথে সাথে কর্মরতদের বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পায় এবং দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া বৃদ্ধির ফলে টাকার মূল্যের যে দ্রুত অবনমন হতে থাকে, অর্থাৎ ক্রয়ক্ষমতা নিম্নগামী হতে থাকে, তার কিছুটা সুরাহা হয়। অথচ, বিস্ময়ের কথা হলো পেনশনাররা এই সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। তাঁরা যেন অন্য গ্রহের জীব।

যাঁদের সম্বন্ধে ব্যাঙ্ককর্তাদের কোন দায়-দায়িত্ব নেই, নেই কোন ভাবনা-চিন্তা সরকারের, অর্থদপ্তরের ও অন্যান্য কেউকেটাদের। যাঁদের নিষ্ঠা আর শ্রমের বিনিময়ে গড়ে উঠেছে ব্যাঙ্কশিল্পের এই বিশাল ইমারত সেই পূর্বসূরীদের সম্বন্ধে আজকের উত্তরসূরীদের এই উদাসীনতা ও তাচ্ছিল্যের মনোভাব শুধু অন্যায় নয়, ন্যক্কারজনক; এটা এক ধরণের বিশ্বাসঘাতকতা।

যে কর্মচারী ১৯৮৬ সালে বা তারপর অবসর নিয়েছিলেন এবং তিনি যদি এখনও বেঁচে থাকেন তবে তাঁর পেনশন কিন্তু এখনও সেই ১৯৮৬-তে তিনি যে মূল বেতন (বেসিক পে) পেতেন সেই মূল বেতনের হারেই (বেসিক পে-র ৫০%) তিনি আজও, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিন দশক পরেও, পেনশন পেয়ে আসছেন।

এ রকম পেনশন প্রাপকদের বয়স আজ নব্বইয়ের কোঠায়। আর, যদি তিনি পেনশন বৃদ্ধির আশায় দিন গুণতে গুণতে চিরতরে বিদায় নিয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রী পেনশন পাচ্ছেন (অবশ্য তিনিও যদি আজ ইহলোকে বিদ্যমান থাকেন) আর সেই পেনশন স্থিরীকৃত হয়েছে সেই হতভাগ্য কর্মচারীর মূল বেতনের মাত্র ১৫% হারে, অর্থাৎ তাঁর অর্ধেক। আর এর বাইরেও ব্যাঙ্কশিল্পে আরও এক প্রায় বিলীয়মান শ্রেণী আছেন – যাঁরা ১৯৮৬ সালের আগেই অবসর নিয়েছিলেন। তাঁরা পেনশনের সুযোগ থেকেই বঞ্চিত।

তাঁদের দু’ চারজন এখনও জীবিত, আর এঁদের শতকরা ৯৫%ই ফ্যামিলি পেনশনার – এঁরাও সবাই নব্বই অতিক্রান্ত এবং শ’য়ের কোঠায়। সমগ্র ব্যাঙ্কশিল্পে এঁদের সংখ্যা প্রায় ১২০০’র মতো। এঁদের দেওয়া হয় ‘এক্স-গ্রাশিয়া’ নামে ভিক্ষের অনুদান। পরিমাণ? আগে দেওয়া হতো মাসিক ৫০০ টাকা, বিধবা পত্নীদের ২৫০ টাকা, পরে বারবার অনুরোধের পর পরিমাণ বাড়িয়ে করা হয়েছে যথাক্রমে ১.০০০ টাকা ও ৫০০ টাকা মাসিক।

তার সাথে অবশ্য ডি.এ যোগ করলে দাঁড়ায় যথাক্রমে ঊর্ধ্বপক্ষে ৫.০০০(জীবিত কর্মচারী হলে), স্ত্রীদের ক্ষেত্রে সর্বাধিক হাজার তিন-সাড়ে তিন! একজন ভিখারীও মাসে হাত পেতে এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা রোজগার করে! কি নিদারুণ পরিহাস আর লাঞ্ছনার শিকার এককালের কর্মচারীরা ও তাঁদের পরিবারবর্গ!

এই কর্মচারীরা উদয়াস্তই নয়, সকাল দশটার মধ্যে অফিসে এসে কাজ শেষ না করে, তা সে রাত দশটা-এগারোটা যাই হোক না কেন, বাড়ি ফেরার অনুমতি পেতেন না। অনেকে অত রাতে বাড়ি ফেরার ট্রেন না পেয়ে শিয়ালদা/হাওড়া স্টেশনে রাত কাটিয়ে আবার পরদিন অফিসে এসে কাজ করেছেন, ব্যাঙ্কের সমৃদ্ধি এনেছেন। খুব ভালো প্রতিদান আজ তাঁরা পেয়েছেন, আর পাচ্ছেন! সোজা কথায় ১৯৮৬ সাল থেকে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর পরেও মুল পেনশন আজও অপরিবর্তিত।

এই শিল্পে পেনশন লাগু হওয়ার, অর্থাৎ ১৯৯৫-এর পর থেকে ব্যাংকের কর্মচারীদের (অফিসার সমেত) বেতন কাঠামো ও অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত হয়েছে- ১৯৯৭, ২০০২, ২০০৭, ২০১২ এবং আর একটি চুক্তি আগামী দিন কয়েকের মধ্যেই লাগু হবার কথা ২০১৭ থেকে অর্থাৎ মোট পাঁচবার বেতন সংশোধনের মাধ্যমে। কিন্তু যে পেনশন প্রাপক যে সময় অবসর নিয়েছেন তাঁর পেনশন সেই সময়ের মূল বেতনের সাথে অলংঘ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে।

ফলে পেনশনের ক্ষেত্রে ঘটছে ক্রমাগত বৈষম্য, যিনি যত আগে অবসর নিয়েছেন তিনি তত কম, আর যিনি যত পরে অবসর নিয়েছেন তিনি তত বেশি পেনশন পাচ্ছেন। এ হলো যেন একুশে আইন! একটি উদাহরণই এই বৈষম্যের ধরণ বোঝার পক্ষে হয়তো যথেষ্ট – ২০০২-এ অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্কের একজন জেনারেল ম্যানেজারের পেনশন ২০১৮-য় অবসরপ্রাপ্ত একজন কেরাণির চেয়েও কম!

এই অব্যবস্থার প্রতিকারে ব্যাঙ্কশিল্পে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী সংগঠনগুলি দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পেনশনের দাবীতে সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে আবেদন নিবেদন করে চলেছেন, সুরাহা না দেখে বিভিন্ন প্রচারমুখী সংগ্রামও চালিয়ে যাচ্ছেন। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কর্মচারীদের ইউনিয়ন এবং রিটায়ারিদের সংগঠনগুলি যৌথভাবে একের পর লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পেনশনারদের সমস্যার উল্লেখযোগ্য সমাধান করতে পেরেছেন।

কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মচারীদের জন্য পে কমিশনের সুপারিশ ও ফরমুলা অনুযায়ী রিজার্ভ ব্যাঙ্ক পেনশনারদের পেনশন ২০১৯-এর মার্চ থেকে কার্যকরী হয়েছে আর, এর দেড় বছরের মাথায় ওই একই হারে নাবার্ডের পেনশনারদেরও পেনশন আপডেশন হয়েছে ২০২০’র আগস্টে। সামগ্রিকভাবে ব্যাঙ্কশিল্পে পেনশন প্রাপক কর্মচারীদের সংখ্যা প্রায় সাত লক্ষ—৬.৯১.০০০, যার মধ্যে রয়েছেন ১.২০.০০০ ফ্যামিলি পেনশনার।

কেন্দ্রের সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অর্থমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, লোকসভার স্পীকার, সমস্ত রাজনৈতিক দলভুক্ত এম.পি, বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নর, মুখ্যমন্ত্রী, আমলা, আই বি এ – প্রত্যেকের কাছেই দরবার করা হয়েছে একাধিকবার, দেওয়া হয়েছে স্মারকলিপি তথ্য ও যুক্তি সহ, প্রত্যেকেই দাবীর যৌক্তিকতা সম্বন্ধে মৌখিকভাবে ‘সহানুভূতি’ও প্রকাশ করেছেন, একাধিকবার পার্লামেন্টে বিষয়টি তোলাও হয়েছে।

কিন্তু সরকার বাহাদুর অনড়। পেনশনারদের মূল দাবীগুলি হলোঃ সুলভে এবং সকলের সাধ্যের মধ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ কেন্দ্রীয় পে কমিশনের সূত্র অনুযায়ী তথা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হারে পেনশন ব্যবস্থার উন্নয়ন পারিবারিক পেনশনের উন্নয়ন … ইত্যাদি।

কেন্দ্রীয় সরকারের নিযুক্ত পে কমিশন বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সময় চাকুরিরত এবং পেনশনারদের সংগঠনগুলির সঙ্গেও আলোচনা করেন এবং প্রয়োজনমতো পরামর্শ গ্রহণ করেন। কিন্তু ব্যাঙ্কশিল্পে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের অচ্ছুৎ করে রাখা হয়েছে, তাঁদের আবেদন-নিবেদন সত্বেও তাঁদের সাথে প্রত্যক্ষ আলোচনার দ্বার কোন এক অজ্ঞাত কারণে কর্তৃপক্ষ আজও রুদ্ধ করে রেখেছেন।

তবে রিটায়ারিদের দাবিগুলি সম্বন্ধে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ যা বলার চেষ্টা করেন তা হলো – পেনশন আপডেশন, ফ্যামিলি পেনশনের উন্নয়ন ইত্যাদি করতে হলে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তা দেবার মতো অর্থের সংস্থান নাকি তাঁদের নেই।

সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিমূলক কথা। ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁরা যে বিভ্রান্ত করছেন তা ভালো করেই জানেন ও বোঝেন কর্তারা। কেন অসত্য? ব্যাঙ্কশিল্পে রয়েছে এক পেনশন কর্পাস ফান্ড। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর প্রতিটি ব্যাঙ্ককে কর্মচারীদের বেতনের ১০% হারে এই ফান্ডে টাকা জমা রাখতে হয়। এই পুঞ্জীভূত ফান্ডে টাকার পরিমাণ – ২.৪০.০০০ কোটি টাকা।

এই ফান্ড থেকেই কর্মচারীদের পেনশন দেওয়া হয়; কর্মচারীদেরই টাকায় গড়ে উঠেছে এই ফান্ড। প্রতি বছর পেনশন বাবদ যে টাকা পেনশনারদের দেওয়া হয় তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা আয় হয় এই টাকাকে লগ্নী করার মাধ্যমে অর্জিত সুদ থেকে। ফলে টাকা বেড়ে চলেছে বছরের পর বছর ধরে। এই তথ্য ব্যাঙ্কাররা দিতে চান না।

আর টি আই এ্যাক্ট মারফত একটি রিটায়ারিদের সংগঠনের পাওয়া তথ্য অনুসারে জানা যায় যে ২০১৭-১৮ সালে পেনশন বাবদ মোট খরচ হয়েছে ১৪.৮০০ কোটি টাকা। আর ওই একই বছরে সুদ বাবদ আয় হয়েছে ১৮.৪০০ কোটি টাকা। এক বছরেই লাভের অঙ্ক – ৩.৬০০ কোটি টাকা।

এই লাভের অঙ্কও ক্রমবর্ধমান। এই যে ক্রমবর্ধমান তহবিল তার অর্জিত আয় থেকে পেনশন আপডেশন ও ফ্যামিলি পেনশন বৃদ্ধির দাবী সম্পূর্ণ পূরণ করা অনায়াসেই সম্ভব; শুধু তাই নয়, দাবীর দ্বিগুণ হারেও উন্নয়ন সম্ভব।

তহবিলের সৃষ্টিও শুধুমাত্র কর্মচারীদের পেনশনের জন্যই, এই অর্থ অন্য কোন খাতে খরচ করা বৈধ নয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কে ১৯৮৬ সাল থেকে পেনশনের উন্নয়ন বাবদ খরচ হয়েছে সেই ব্যাঙ্কের কর্পাস ফান্ডের ৮ শতাংশেরও কম পরিমাণ টাকা, একই ফরমুলা কার্যকর করে বাকি শিল্পে পেনশন উন্নয়ন করতে শতাংশের হিসেবে তো একই পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, বরং একটু কমই হওয়ার সম্ভাবনা যেহেতু সেখানকার কর্মচারীদের বেতনের হার অন্যান্য ব্যাঙ্ক কর্মচারিদের চেয়ে কিছু বেশি। অঙ্ক তো ভুল কথা বলবে না। কাজেই ব্যাঙ্কশিল্পে কর্পাস ফান্ডের ৮ শতাংশ হলে অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় – ১৯.০০০ থেকে ২০.০০০ কোটি টাকা।

যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে শতাংশের হিসেবে টাকার পরিমাণ আরও বাড়বে, কারণ, এর মধ্যেই এমন দু-চারটে ব্যাঙ্কের হদিস মিলেছে যারা প্রতি বছর তাদের স্ট্যাটুইটরি অবলিগেশন, অর্থাৎ দেয় টাকা এই ফান্ডে দিচ্ছে না। যেটা অন্যায় এবং এক ধরণের চৌর্যবৃত্তি ছাড়া অন্য কিছু নয়।

আর, এ অপকর্মটি না হলে পেনশন ফান্ড আরোও বাড়তে পারতো। যাই হোক, যদি সঞ্চিত তহবিলের মোট দশ শতাংশও ধরা হয় তাহলেও পেনশনের সমগ্র সুরাহার জন্য খরচ ২৪.০০০ কোটি টাকার বেশি কখনও নয়। ব্যাঙ্কের কর্তারা সমগ্র তথ্য কিছুতেই প্রকাশ্যে আনছেন না, ফলে কিছু ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে।

মোত কথা হলো – সরকারি কোষাগার থেকে একটি টাকাও দেবার কোন প্রয়োজন নেই। সরকারের কোষাগার থেকে একটি টাকাও দেবার দরকার নেই। যে ফান্ড আছে তাই যথেষ্ট। আর একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে পেনশন কর্মচারিদের ন্যায্য অধিকার, অর্থের সঙ্কুলানের অজুহাতে সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষ কর্মচারিদের বঞ্চিত করতে পারে না। আমাদের দেশের সুপ্রীম কোর্ট এবং বিভিন্ন হাইকোর্ট এই মর্মে অনেক রায় দিয়েছেন তাঁরা বলেছেন পেনশন হলো ডেফার্ড ওয়েজ বা বিলম্বে প্রাপ্য বেতন। বঞ্চনা তবু অব্যাহত।

তাছাড়া, এই শিল্পে ২০১০ সাল থেকে যাঁরা যুক্ত হয়েছেন তাঁরা সকলেই নয়া পেনশন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। পেনশন উন্নয়নের দাবী কার্যকর করতে হবে একমাত্র ২০১০-পূর্ববর্তী কর্মচারীদের জন্যই। দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছর, ২০১০-পূর্ববর্তী সময়কালে, এই শিল্পে নিয়োগ একরকম বন্ধই ছিল, যেটুকু নতুন নিয়োগ হয়েছে বিগত এক দশকে তা হয়েছে, এক ব্যাপক সংখ্যক অস্থায়ী-চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীকে দিয়ে ব্যাঙ্কের অনেক কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ফলে পেনশন ব্যবস্থার মধ্যে যাঁরা আছেন তাঁরা প্রায় সবাই আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ অবসর নেবেন। তারপরে আর এই ফান্ড থেকে পেনশন দেওয়ার প্রয়োজনও ফুরিয়ে যাবে। ব্যাঙ্কগুলির হাতে থেকে যাবে লক্ষ লক্ষ টাকার এই কর্পাস ফান্ড। এই ফান্ড চলে যাবে ঋণ খেলাপী রাঘব বোয়ালদের হাতে যারা এই ব্যবস্থার মালিক হতে উদ্গ্রীব হয়ে আছেন, আর যাঁদের হাতে এই শিল্পটাকেই তুলে দেবার মরীয়া চেষ্টা চলছে। অপরদিকে, বছরের পর বছর পেনশনের উন্নতির আশায় দিন গুণতে গুণতে হাজার হাজার প্রাক্তন কর্মচারী শেষ দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বিদায় নিয়ে চলেছেন!

অপেক্ষা যতই দীর্ঘ হোক না কেন প্রতীক্ষার সংগ্রাম জয়যুক্ত হবেই, সেই আশায় দিন গুণে চলেছেন বাকিরা। এই অবস্থার মধ্যেও আশার আলোকবর্তিকা দেখা দিচ্ছে বিচার ব্যবস্থার পর্যবেক্ষণে। কেরালা, মাদ্রাস হাইকোর্টগুলি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পেনশন সংক্রান্ত মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কগুলিকে নির্দেশ দিচ্ছেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পেনশন আপডেশন করতে।

মুম্বাই হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চ গত ২০শে আগস্ট, ২০২০ এই সংক্রান্ত বিবাদে আবেদনকারীর পক্ষে তাঁদের মূল্যবান অভিমত দিয়েছেন – The Bank is a trustee of the accont of the Pensioners, like the petitioner and has no authority in the eyes of law to dispute the entitlement of the pension payable to the employees, other than those in the employment of the Bank. To tamper with such account and effect of recovery of pension without any authority is nothing but a breach of trust of the petitioner by the Bank…

তাঁরা আরও বলেছেন – Before parting with this Judgment, we need to remind the Bank that the pension payable to the employee upon superannuation is a ‘property’ under Article 300A of the Constitution of India and it constitutes a fundamental right to livelihood under Article 21 of the Constitution of India. The deprivation, even a part of this amount, cannot be accepted, except in accordance with and authority of law.

একটা কথা অত্যন্ত পরিস্কার যে, পেনশন কোন দয়ার দান নয়, এটা কর্তৃপক্ষ ও সরকারের দায়িত্ব। একথাও ঠিক যে, কোর্টের মুখাপেক্ষী বা কারো অনুগ্রহে নয়, ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই দাবীর যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে, সংগ্রাম জয়যুক্ত হবেই; কারণ, সংগ্রামই দাবী আদায়ের একমাত্র হাতিয়ার। ইতিহাসের এই ধারারই অনুসরণ করে চলেছেন পেনশনাররা দৃঢ় প্রত্যয়ে।—

লেখক পরিচিতি-

  • জয়ন্ত রায়।

[দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে ব্যাঙ্কশিল্পের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। বর্তমানে ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারিদের সর্বভারতীয় সংগঠন ‘ফেডারেশন অফ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া রিটায়ারীজ এ্যাসোসিয়েশন’-এর অর্গ্যানাইজিং সেক্রেটারি, সারা দেশে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারিদের বৃহত্তম ও একমাত্র রেজিস্টার্ড সংগঠন ‘এ আই বি আর এফ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রাদেশিক সংগঠন ‘বি পি আর বি ই এ’-র ডেপুটি জেনারাল সেক্রেটারি।]

স্বামীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বস্ত্র ব্যবসাকে অন্যমাত্রা দিয়েছেন।'প্রশ্ন অনেকে'-এ মুখোমুখি দশভূজা স্বর্ণালী কাঞ্জিলাল I