প্রসেনজিৎ চৌধুরী:  শিউলির ছোঁয়ায় শরতের ভোর জানিয়ে দেয় ওপার বাংলার শারদোৎসবের দিনলিপি৷ কাশফুলের শুভেচ্ছায়  সাড়ম্বরে আরাধনা হয় দেবী দুর্গার৷  বাংলাদেশে শারদোৎসবের মূল কেন্দ্র হল রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির৷ শারদোৎসবের চারটি দিন হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়ে জমজমাট থাকে এই মন্দির প্রাঙ্গন৷ পুজো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত থাকেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী৷

ঢাকার ঈশ্বরী থেকেই ঢাকেশ্বরী- কথিত আছে দেবী স্বয়ং মহানগর ঢাকার রক্ষাকত্রী৷ তাই তিনি ঢাকার ঈশ্বরী অর্থাৎ ঢাকেশ্বরী৷ মন্দিরটি ঢাকার বক্সিবাজারে অবস্থিত৷ ধারণা করা হয় যে, সেন রাজবংশের রাজা বল্লাল সেন ১২শ শতাব্দীতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে অনেক ইতিহাসবিদ এই ধারণার সঙ্গে একমত নন৷  আরও একটি প্রবাদ, সতী দেহ ছিন্ন হবার পর এই স্থানে তার কিরীটের ডাক এই জায়গায় পড়ে তাই এটা উপপীঠ।ডাক হল উজ্জ্বল গহনার অংশ। ডাক থেকেই ঢাকেশ্বরী নামের উৎপত্তি।

দেশভাগের পর পাকিস্তানের ভূখণ্ডে পড়ে গোটা পূর্ব বাংলা৷ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরটিও সেই অর্থে পাকিস্তানের ঐতিহ্যশালী স্থাপত্য হিসেবে পরিচিত হয়৷ দেশবিভাগের পর থেকেই বেশকয়েকবার মন্দিরটি আক্রান্ত হয়েছে৷

মুক্তিযুদ্ধের সময় লণ্ডভণ্ড হয়েছিল ঢাকেশ্বরী
১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে লাগাতার পাক সেনার আক্রমণে বহু মানুষের মৃত্যু হয়৷ ঢাকেশ্বরী মন্দিরটিও আক্রান্ত হয়৷ মন্দিরের বেশকিছু অংশ গুঁড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনা৷ এর প্রতিবাদে গর্জে  উঠেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের লাখো স্বাধীনতাপ্রেমী হিন্দু-মুসলিম জনতা৷ পরবর্তী কালে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হয়৷ মন্দিরটির সংস্কার হয়৷

জাতীয় মন্দিরের স্বীকৃতি
১৯৮৮ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ইসলামকে জাতীয় ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করে৷ ধর্মনিরেপেক্ষ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে৷ এই আশঙ্কায় সেদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় চিন্তিত হন৷ ১৯৯২ সালেও আক্রান্ত হয় মন্দিরটি৷ ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা৷ তখনই বিশেষ আইন বলে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির হিসেবে চিহ্নিত হয় এই ঐতিহ্যশালী স্থাপত্য৷  জাতীয় সম্পত্তি হিসেবে মন্দিরটির রক্ষার দায়িত্ব এখন বাংলাদেশ সরকারের৷

প্রতিবছর শারদোৎসবের সময় দুই বাংলার জনসাধারণ মেতে ওঠেন৷ কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গা বন্দনা এক ঐতিহ্যশালী রীতি৷  ঠিক তেমনই ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দুর্গা আরাধনাও ঐতিহ্যের ধাত্রী৷