প্রসেনজিৎ চৌধুরী: দক্ষিণ রায়, নামেই রক্ত জল হয়ে আসে সবার। এক হুঙ্কারে কেঁপে যায় বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য।

এই ভয়াল জল-জঙ্গলের দেশ বা সুন্দরী গাছের বনভূমি তার ঘন নিশ্ছিদ্র সূর্যালোক ঢুকতে না পারা আঁধারে-আবছায়ার মায়াজালে তৈরি করেছে ঘূর্ণিঝড় রুখে দেওয়ার প্রাকৃতিক বর্ম। সেই বর্মে ধাক্কা খেয়ে প্রবল শক্তিধর বুলবুল খানিকটা গতি হারাবে। যে সুন্দরবনের রাজা দক্ষিণ রায় রয়েল বেঙ্গল তার কাছেই নজরানা দিতে হবে সামুদ্রিক দানব বুলবুল-কে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া বিভাগ সূত্রে খবর, বুলবুল বাঁক নিয়েছে। তার গতি এখন সুন্দরবনের দিকে। আন্তর্জাতিক সীমান্তের দুই পারে ছড়িয়ে থাকা এই বনভূমি বারবার ঘূর্ণিঝড় কে প্রথম প্রাচীর তুলে প্রতিরোধ করে। নোনা মাটির গহীন অরণ্য এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক দেয়াল। এর গায়ে ধাক্কা লেগে গতি হারিয়েছিল সমুদ্রের দানব সিডার, আইলা, ফণী। আরও কতো ঘূর্ণি ঝড়।

উপগ্রহ ছবি থেকে যে তথ্য মিলছে তাতে আগেভাগেই প্রস্তুত ভারত ও বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু যখন এসবের ব্যবহার তেমন ছিল না, তখনও ভয়াল সামুদ্রিক ঝড়কেও রুখেছিল সুন্দরবন। তবে পূর্ব ঘোষিত সতর্কতা না থাকায় লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু সাক্ষী একদা পূর্ব পাকিস্তান পরে বাংলাদেশ। সীমান্তে এপারেও মৃত্যু মিছিল হয়েছিল দুই ২৪ পরগনার অংশে। এখন উপগ্রহ চিত্রের কারণে সেই পরিস্থিতি বদলেছে। তবে বঙ্গোপসাগরের দানব ঝড়গুলির চরিত্র বদলায়নি। এই ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক হামলা তাই সর্ব শক্তি দিয়েই রুখবে প্রকৃতির তৈরি দেয়াল-সুন্দরবন।

আরও পড়ুন – পশ্চিমবঙ্গে বুলবুল হানা, অন্যদিকে রুখতে তৈরি বাংলাদেশ নৌ বাহিনী

দুই দেশের বাদা অঞ্চল (সুন্দরবনের জমি ) পরিচিত ভয়ঙ্কর সুন্দর দক্ষিণ রায়ের দেশ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা। আর বাংলাদেশের খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম বিভাগ। বাংলাদেশ সরকারের আবহাওয়া বিভাগের সতর্কতার সূচকে, বুলবুলের হামলা মহাবিপদ-১০ পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১১টি স্তর নিয়ে হয় মহাবিপদ। খুলনার কীর্তনখোলা নদী সংলগ্ন এলাকা বা উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জারি এই সংকেত। লক্ষ লক্ষ মানুষকে আশ্রয় শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খুলনা, বরিশালের মতো সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা বা দূরবর্তী চট্টগ্রাম সর্বত্র জারি বিপদ সংকেত।

বাংলাদেশ আবহাওয়া বিভাগের দেওয়া তথ্য- ‘বুলবুল পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূল (সুন্দরবনের কাছ দিয়ে) অতিক্রম করতে পারে। এই সুন্দরবনকে রক্ষা করতে প্রকৃতিবিদ ও বিজ্ঞানীরা প্রবল আন্দোলন করছেন। দক্ষিণ রায়ের আবাসভূমি এবারেও হয়েছে বহু মানুষের জীবন রক্ষাকারী।

জলা-জঙ্গলের দেশ। এখানে জলে কুমির, ডাঙ্গায় বাঘ। বিশ্বের বিশ্ময় সুন্দরবনকে রক্ষা করলেই এমন বিপদ থেকে বারে বারে রক্ষা পাব আমরা। আর যাই হোক, যতই লাল চোখ নিয়ে গজরাতে গজরাতে সমুদ্রের দানব তেড়ে আসুক তাকে প্রথম রুখবে সুন্দর-ভয়ঙ্কর বনভূমি।