শংকর দাস, বালুরঘাটঃ দুর্গাকে সামনে এগিয়ে মহিষাসুরের সঙ্গে প্রতারণা করেছে দেবতারা। চিরাচরিত দুর্গা পূজার কাঠামোয় অসুরকে যতই হিংস্র আর অত্যাচারী দেখানো হউক না কেন। বাস্তবে মহিষাসুর ছিল তার উলটো ও নীতিবান। যুদ্ধে সে কোন মহিলা ও শিশুদের আঘাত করতেন না। যে কারণে নিজেরা বিজয়লাভ করতে না পেরে দুর্গাকে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠিয়ে দেন দেবতারা।

আর তাতেই নিজের নীতিতে অবিচল মহিষাসুর দুর্গার সামনে পরাজিত হতে বাধ্য হন। এমনটাই বিশ্বাস মহিষাসুরের বংশধর বর্তমান আদিবাসী সম্প্রদায়ের একাংশ। হুদুরদুর্গা নামক সেই মহিষাসুরকে আজও খুঁজে বেড়ান আদিবাসীরা।

প্রতিবছর দুর্গাপূজায় শহরের রাস্তায় অতি পরিচিত দৃশ্য আদিবাসীদের নাচ। যে নাঁচের মাধ্যমে এই সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁদের অনার্য ভগবানকে খুঁজে চলেছেন। আসলে ভাদ্র মাস শেষ হতেই শুরু হয়ে যায় আদিবাসীদের দাসাই পরব। প্রতিদিন হাড় ভাঙা খাটুনির শেষে তাঁরা এই পরবে সামিল হন। ধামসা মাদল নিয়ে শুরু হয় দাসাই নাচ। দশমী পর্যন্ত চলা এই দাসাই পরবে তাঁরা খুঁজে ফেরেন তাঁদের অনার্য ভগবান হুদুড় দূর্গাকে। মহিষাসুরই হুদুড় দুর্গা নামে পরিচিত।

দাসাই পরব হলো হুদুড় দূর্গা নামক মহিষাসুরের জন্য শোক পালনের উৎসব। আদিবাসী সংস্কৃতি অনুযায়ী, আর্যরা কখনোই অনার্য দেবতা হুদুড় দূর্গার সঙ্গে পেরে উঠতে পারছিলো না। শেষে প্রতারণা করে তাঁকে বধ করা হয়েছিল। সেই থেকে দুর্গাপূজার সমকালে অন্যান্যরা যখন দুর্গাপূজার আনন্দে মাতোয়ারা তখন আদিবাসীরা হুদুড় দূর্গার স্মরণে দাসাই পরব পালন করেন।

প্রতি বছরের মতো এবারেও ভাদ্র মাস শেষ হতেই দাসাই পরব শুরু হয়েছে দক্ষিণ দিনাজপুরের অধিকাংশ আদিবাসী পাড়ায়। বাদ যায়নি বালুরঘাটের খরাইল এলাকার আদিবাসী পাড়াও। প্রতিদিন এখানকার আদিবাসী মানুষজন স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে বিকেল থেকে দাসাই পরব পালন করতে শুরু করেন। ধামসা মাদলের তালে নাঁচতে নাচঁতে এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে ঘুরে চাল ও টাকা পয়সা সংগ্রহ করেন। শুধু গ্রামের মধ্যেই নয় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বালুরঘাট শহরের রাস্তাতেও পূজার চারদিন তাঁরা হুদুড় দূর্গার স্মরণে নাঁচ করেছেন। রবিবার একাদশীর দিন সংগ্রহের সেই চাল ও টাকা দিয়ে গ্রামের সকলে মিলে খাওয়াদাওয়াও করছেন তাঁরা।

খরাইল আদিবাসী পাড়ার বাসিন্দা প্রবীণ সমলা মুর্মু জানিয়েছেন ভাদ্র মাসের পর থেকে শুরু হয় তাঁদের শোকের পরব। এই সময়টা দাসাই নাঁচের মধ্য দিয়ে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া ভগবান হুদুড় দূর্গাকে খুঁজে ফেরেন তাঁরা। বেশি অর্থ সংগ্রহের জন্য শহরের রাস্তা ও পূজা মণ্ডপ গুলিতে গিয়েও তাঁরা নেঁচে থাকেন। যে কারণে অনেকেরই ভেবে থাকেন যে দাসাই পরবের এই নাঁচ তাঁদের আনন্দের প্রকাশ। কিন্তু না, আসলে এই নাঁচ ও দাসাই পরবটা সম্পূর্ণ শোকের উৎসব।