গৌতম রায়: রাজনৈতিক হিন্দুরা ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের আগে অনেকবার চেষ্টা করেছিল ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের। বিপক্ষ দল পরিচালিত রাজ্য সরকার উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতাসীন থাকায় অতীতে আর এস এস এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি মসজিদ ভাঙতে সফল হয়নি।নিজেদের দলের কল্যাণ সিং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মসজিদ ভাঙতে সমর্থ হয় রাজনৈতিক হিন্দুরা। কেবলমাত্র কল্যাণ সিংয়ের সরকারই নয়, কেন্দ্রে সেই সময়ে ক্ষমতাসীন পি ভি নরসিংহ রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসি সরকার শীতল মনোভাব রাজনৈতিক হিন্দুদের কাছে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়।

ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর রাজনৈতিক হিন্দুরা দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে সবথেকে বেশি তৎপর হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের স্বার্থে গোটা দেশের যে প্রান্তে যেভাবে সম্ভব নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি “সাম্প্রদায়িকতা”র প্রচার, প্রসার এবং প্রয়োগে আত্মনিয়োগ করে। এইকাজে সবথেকে বেশি কর্মতৎপতা দেখাতে শুরু করে আরএসএস। তারা তাদের বিভিন্ন প্রকারের শাখা সংগঠনগুলি যেমন; বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, রাষ্ট্রীয় সেবিকা বাহিনী, ভারতীয় মজদূর সঙ্ঘ, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, দুর্গা বাহিনী ইত্যাদির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক অর্থে সামাজিক প্রযুক্তি জোরদার ভাবে চালু করে দেয়।

ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ভিতর দিয়ে প্রবাহমান ভারতবর্ষকে পিছনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করে গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক,মৌলবাদী শক্তি। যুগ যুগ ধরে যে সম্প্রীতির ভারতবর্ষ তার নিজস্ব আঙ্গিকে প্রবাহিত হয়ে চলেছে তাকে ধ্বংস করাই ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ কে ধুলিসাৎ করবার পর থেকে আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির এক এবং একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ভিতর দিয়ে যে সামাজিক বিভাজনের লক্ষণরেখা তারা গোটা দেশে টানতে সমর্থ হয়েছিল, সেই রেখাটিকেই অত্যন্ত যত্ন সহকারে তারা প্রলম্বিত করেছে। সেই প্রলম্বনের ফল হচ্ছে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ নামক নীতিবিহীন সুবিধাবাদী জোট সরকার। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ভিতর দিয়ে সম্প্রীতির,সমন্বয়ী সাধনার যে চিরন্তন ভারতবর্ষকে ভাঙতে সচেষ্ট হয়েছিল অসভ্য বর্বর রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি, বাজপেয়ীর সরকারের আমলে সেই ভারতবিরোধী চেতনাকেই গোটা দেশে ছড়িয়ে দিতে তারা তৎপর হয়ে উঠেছিল।

বাজপেয়ীর আমলে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। সেইসময়ে তাঁদের তৃণমূল কংগ্রেস, বিজু জনতা দল, জাতীয় সন্মেলন, এআইএডিএমকে’র মতো আঞ্চলিক দলগুলির সমর্থনের উপর ভিত্তি করে সরকার পরিচালনা করতে হয়েছিল। এইসব আঞ্চলিক দলগুলির কাছে নিজের নিজের রাজ্যের ভোট সমীকরণটাই ছিল সবথেকে প্রথম এবং প্রধান বিষয়। তাই সেই সময়ে আরএসএস তাদের অভিন্ন দেওয়ানী বিধি,গোরক্ষা, সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারার অবলুপ্তি, সর্বোপরি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে বদলে দিয়ে তথাকথিত “হিন্দুরাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলি নিয়ে খুব একটা এগিয়ে যেতে পারেনি।

যদিও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের মতো আরএসএসের শাখা সংগঠনগুলি সঙ্ঘের কর্মসূচির রৃপায়ণের লক্ষ্যে ওড়িশার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আদিবাসী খ্রিস্টানদের উপর বিভৎস অত্যাচার চালিয়েছে, অস্ট্রেলিয় মিশনারি ফাদার গ্রাহাম স্টুয়ার্স স্টেইনসকে দুই শিশুপুত্র সহ জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে, গুজরাতে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক সাম্প্রদায়িকীকরণ চালিয়ে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেই ব্যাহত করবার সব রকমের চেষ্টা চালিয়ে গেছে।