স্টাফ রিপোর্টার, বাঁকুড়া: উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ হতেই কেঁদে উঠেছিল ভেতরের ছোট্ট মনটা৷ শত কষ্টের মাঝ থেকে নানা প্রকার প্রতিকূলতা কাটিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল রাজ্যে যুগ্মভাবে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থানে৷ ইচ্ছা ছিল অনেক৷ সেই প্রতিজ্ঞায় নিজেকে স্থির রেখে ছিল সে৷ নাম অনিমা গরাই৷ আগে এক ডাকে না চিনলেও এখন সেই পরিচিতি বেশ হয়েছে৷

অভাব-অনটনের সংসারের মাঝ থেকে পড়াশোনা করে এই জায়গায় থাকাটা যেন এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না অনিমার বাবা-মা৷ তবে উচ্চ মাধ্যমিক তো হল৷ এরপর কিভাবে এগোবে অনিমা সেই নিয়েই বেশ চিন্তায় পড়েছিল পরিবার৷ তবে সেই সমস্ত চিন্তা থেকে তাদের মুক্তি দিল বাঁকুড়ার খাতড়া স্বরাজনগর বিএড কলেজ কর্তৃপক্ষ৷

শনিবার সকালে তাদের বাড়িতে যায় বাঁকুড়ার বিএড কলেজের কর্তৃপক্ষ থেকে কর্ণধার অনুপ পাত্র৷ সেখানেই তারা সুখবর দেন অনিমার বাবা ও মাকে৷ অনিমার কলেজে পড়ার যাবতীয় খরচ ও ব্যয় ভার গ্রহণ করতে ইচ্ছুক বাঁকুড়ার বিএড কলেজের কর্তৃপক্ষ৷ আগামী তিন বছরের পড়াশোনার সমস্ত খরচ বহনের আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি এদিন ভর্তির প্রাথমিক কাজের জন্য নগদ পাঁচ হাজার টাকা তুলে দেওয়া হয় অনিমার হাতে।

এ দিন অনুপ পাত্রের সঙ্গে অনিমা গরাইয়ের বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী শ্যামল সাঁতরাও। স্বরাজ নগর বিএড কলেজ কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগে খুশি মন্ত্রী শ্যামল সাঁতরাও। তিনি বাঁকুড়া শহরের সারদামণি মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ভূগোলে অনার্স পড়াশোনার ব্যাপারে যথা সম্ভব সাহায্যের আশ্বাস দেন।

উল্লেখ্য, মন্ত্রী শ্যামল সাঁতরা নিজে বাঁকুড়া সারদামণি মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের শিক্ষক। বাঁকুড়ার জঙ্গল মহলের রানীবাঁধের ঘাঘরা হলুদকানালী গ্রামের অনিমা গরাই এবার যুগ্মভাবে উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে। রানীবাঁধ হাই স্কুলের কৃতি এই ছাত্রীর বাবা মধুসূদন গরাই প্রান্তিক কৃষক। মেয়ে সাফল্যের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলেও তার বহু দিনের লালিত স্বপ্ন ভূগোলে অনার্স নিয়ে কিভাবে পড়াবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। শুক্রবার ফলপ্রকাশের পর এই খবর কলকাতা 24×7 সহ প্রথম সারির সব সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। এই খবরে জেলা জুড়ে তীব্র আলোড়নের সৃষ্টি করে।

শনিবার এই কৃতী ছাত্রীর বাড়িতে স্বরাজ নগর বিএড কলেজ কর্তৃপক্ষের সাহায্যের আশ্বাস নিয়ে পৌঁছে যান মন্ত্রী শ্যামল সাঁতরা সহ সমাজসেবী অনুপ পাত্র নিজেই। তাঁরা কথা বলেন ছাত্রী অনিমা গরাই ও তার বাবা-মায়ের সঙ্গেও। অনিমার পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হওয়ার খবরে আনন্দে চোখে জল চলে আসে প্রান্তিক কৃষক বাবা মধুসূদন গরাইয়ের। পরে সব সামলে নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমি ভাবতেই পারছি না মেয়ের এই সাফল্য৷ এ তো যেন কল্পনার জগৎ৷’’

অনিমা গরাই নিজে যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না গত ২৪ ঘন্টায় চিত্রটা এতোটাই বদলে যাবে। আগামী তিন বছরের সমস্ত পড়াশোনার খরচ বহন করার বার্তা নিয়ে দেবদূতের মতো তাদের বাড়িতে হাজির হবেন কেউ। কৃতি ছাত্রী অনিমা তার মাকে পাশে নিয়ে বলেন, ‘‘খুব ভালো লাগছে। আমার বাবার আর্থিক সামর্থ ছিল না, আমার ভবিষ্যৎ পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো। স্বরাজনগর বিএড কলেজ কর্ত্তৃপক্ষ আমার পাশে দাঁড়ানোয় কি বলব বুঝে উঠতে পারছি না৷ আমি তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম ভবিষৎ নিয়ে৷ কি বলে যে কৃতজ্ঞতা জানাব সত্যি ভাষা নেই৷’’
প্রসঙ্গত, স্বরাজনগর বিএড কলেজের কর্ণধার অনুপ পাত্র বলেন, ‘‘অনিমা আমাদের জেলার গর্ব। সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সে যেভাবে আজ জেলার মুখ উজ্জ্বল করলো তা দৃষ্টান্ত স্বরূপ।’’ আগামী তিন বছর অনিমার পড়াশোনার যাবতীয় খরচ তার কলেজ বহন করবে বলেও এদিন তিনি জানান।