বিশ্বজিৎ ঘোষ

অটো চালকের বয়স কত হতে পারে…! খুব বেশি হলে ১৬! রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা৷ ধর্মতলা থেকে পার্ক সার্কাসের লোহাপুল যাওয়ার ওই অটোর পিছনের আসনে তখন তিন আর, সামনে চালকের বাম দিকে এক জন যাত্রী৷ অটো তখনও যাত্রা শুরু করেনি৷

আরও পড়ুন: সন্তানের পরিচয় জানাতে প্রথমেই আসুক মায়ের নাম!

অটোয় সওয়ার হওয়ার জন্য আরও যাত্রী আসছেন৷ আর, ওই অটোয় চালকের বাম দিকে আরও এক এবং ডান দিকে এক জন বসলেন৷ না৷ ছয় জন যাত্রী নিয়েও সন্তুষ্ট হতে পারলেন না ওই কিশোর চালক৷ যে কারণে, পিছনে অটোর ডান দিকে এক পা বাইরে দিয়ে বসলেন আরও এক জন যাত্রী৷ অথচ, লোহাপুল যাওয়ার জন্য সেখানে যে তখন আর কোনও অটো ছিল না, তাও নয়৷

আরও পড়ুন: প্রথার নামে প্রকাশ্যে গণধর্ষণ যেখানে এখন এক খেলা!

যদিও, এই ঘটনা ২০০৬-এর৷ তবে, ২০১৬-য়-ও যে এমন ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় না, তাও নয়৷ গড়িয়াহাট থেকে গড়িয়া যাওয়ার অটো এমনিতেই রাত ১০টা পেরিয়ে গেলে পিছনের আসনে তিন আর সামনে চালকের বাম এবং ডান দিকে এক জন করে যাত্রী না নিয়ে যাত্রা শুরু করে না৷ আর, রাত সাড়ে ১১টা পেরিয়ে গেলে, অটোয় উঠলেই ১০ টাকা ভাড়া দিতে হয়৷ চালকদের দাবি, রাতে তাঁরা সার্ভিস দিচ্ছেন, তাই বেশি ভাড়া নিচ্ছেন৷

আরও পড়ুন: বিশ্বাসযোগ্যর নামে ভোটারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা!

মাস খানেক আগের ঘটনা৷ গড়িয়াহাট থেকে গড়িয়া যাওয়ার একটি অটো তখন যাদবপুর ৮বি বাস স্টপ ছেড়েছে৷ রাত তখন সাড়ে ১২টা৷ গড়িয়াহাট থেকে যাদবপুরের মাঝে অবশ্য কোনও যাত্রী যেমন নেমেছেন, তেমনই কোনও যাত্রী আবার ওই অটোয় সওয়ারও হয়েছেন৷ তবে, ওই অটোয় তখনও পাঁচ জন যাত্রী আর চালক৷ যাদবপুর স্টেশন রোডের সংযোগস্থলে আরও দু’ জন যাত্রী ওই অটোয় সওয়ার হতে চাইলেন৷ অগত্যা, চালকের বাম দিকে এক যাত্রীর পাশে বসলেন ওই দু’ জনের এক জন৷

আরও পড়ুন: ভালো বাসা-র তুলনায় ইলিশ যে বেশি ভালোবাসার!

আর, অন্য জন পিছনের আসনের যাত্রীদের বাম দিকে অটোর রড ধরে দাঁড়িয়ে গেলেন৷ স্বাভাবিক ভাবেই ওই যাত্রীর গোটা শরীর অটোর বাইরে থেকে গেল৷ এই যাত্রী দাঁড়িয়ে সওয়ার হলেন৷ কিন্তু, এমনও হয়, অটোর পিছনে তিন জনের আসনে চার জনও সওয়ার হন৷ এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বলতে পারেন, এই দু’টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা৷ তাঁরা এমন মনে করতেই পারেন৷ কিন্তু, ১০ বছর আগের এবং পরের এই দুই ঘটনার মধ্যে মিলও তো এড়ানো গেল না৷ তার উপর, এই দুই ঘটনা-ই খোদ কলকাতার৷

আরও পড়ুন: হাসপাতালে বেড না পেলে পৌঁছে যেতে হবে কালীঘাটে!

কলকাতার আশপাশ অঞ্চল সহ এ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তেও অটো রয়েছে৷ কলকাতায় অটোর পিছনের আসনে তিন আর সামনে চালকের বাম পাশে এক জন যাত্রী বসানোর কথা৷ কিন্তু, রাজ্যের এমন বিভিন্ন প্রান্ত রয়েছে, যেখানে অটোয় যাত্রীদের আসন সংখ্যা আরও বেশি৷ এবং, ওই ধরনের অটোয়-ও অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া হয়৷ এমনও হয় যে, অটোর পিছনে যাত্রীদের ওঠা-নামার সিঁড়ির উপরও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সওয়ার হন যাত্রীরা৷ এবং, এই দুই ঘটনা বাদে শুধুমাত্র কলকাতায়-ই যে এই ১০ বছরে এ ভাবে অন্য আর কোনও অটোয় অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া হয়নি, তাও তো নয়৷

আরও পড়ুন: ‘বৈপ্লবিক উন্নয়নে’র পিজি-তেও ভরসা নেই সরকারের!

তার উপর, বিভিন্ন সময় কোনও না কোনও অটো চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগও তো উঠছে৷ অথচ, এই ১০ বছরে যেমন বিভিন্ন বিষয়ে আরও এগিয়ে গিয়েছে এই দুনিয়া৷ তেমনই, এই ১০ বছরে আবার এ রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবাদলও ঘটেছে৷ যদিও, সব অটো চালক এবং যাত্রী এক রকম নন৷ কিন্তু, চালকদের অটোক্রেসি (Autocracy) আর অটো-ক্রেজি (Auto-Crazy) যাত্রীদের মানসিকতায় কি খুব একটা হেরফের ঘটেছে? সেই তো আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেমন অটোয় অতিরিক্ত যাত্রী নিচ্ছেন বিভিন্ন চালক৷

আরও পড়ুন: সরকারি নির্দেশেই অকেজো মাল্টি-সুপার হাসপাতাল

তেমনই আবার, চালকের অতিরিক্ত যাত্রী-ও হচ্ছেন বিভিন্ন যাত্রী৷ কেননা, কোনও যাত্রী যদি কোনও অটোর নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন ফাঁকা না থাকলে ওই অটোয় সওয়ার না হন, তা হলে হয়তো অন্য কোনও যাত্রী অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে সওয়ার হবেন৷ কিন্তু, সব যাত্রীই যদি এমন করেন যে, নির্দিষ্ট আসন ফাঁকা না থাকলে কোনও অটোয় সওয়ার হবেন না, তা হলে, চালক কীভাবে অতিরিক্ত যাত্রী নিতে পারবেন? কাজেই, আইনকে না হয় বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন বিভিন্ন অটো চালক৷ কিন্তু, আইন ভাঙার সেই সুযোগ তো আবার বিভিন্ন যাত্রী-ই করে দিচ্ছেন৷

আরও পড়ুন: মুমূর্ষুর প্রাণরক্ষায় ক্যাসুয়ালটি ব্লক চাইছেন ডাক্তাররা

অনেকে এমন বলতেই পারেন যে, কর্মস্থল অথবা কোনও গন্তব্যে পৌঁছনো কিংবা ঘরে ফেরার তাড়া রয়েছে যেখানে, সেখানে কোনও অটোয় অতিরিক্ত যাত্রী না হয়েও কি আর উপায় আছে? কেননা, এমনও হয় যে, দেখা গেল গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্য সংশ্লিষ্ট স্থানে অন্য অটো-ও আছে৷ কিন্তু, স্ট্যান্ড থেকে যেমন এক জন যাত্রীকে নিয়ে এ রাজ্যে সাধারণত যাত্রা শুরু করে না কোনও অটো৷ তেমনই, মাঝ পথের কোনও অটোয় নির্দিষ্ট সংখ্যক আসনের কোনওটি ফাঁকা নাও থাকতে পারে৷ অন্যদিকে, রাত বেশি হলে সমস্যাও আরও বেশি৷

আরও পড়ুন: পূর্ব ভারতের বিরল নজিরে রক্ষা পেল কিশোরীর প্রাণ

কারণ, গভীর রাত নয়, মধ্য রাত পর্যন্ত-ই কলকাতার অধিকাংশ স্থানে থাকে না সরকারি অথবা বেসরকারি কোনও বাস৷ পশ্চিমবঙ্গে তথ্য-প্রযুক্তির খাস তালুক হিসেবে খ্যাত সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের পরিস্থিতিও একই রকম৷ যে কারণে সেক্টর ফাইভ এবং সল্টলেকের অন্যত্র সহ খোদ কলকাতার বিভিন্ন অংশে একটু রাত হলেই শাটল গাড়ি-ই অনেকের কাছে অন্যতম ভরসা৷ শাটল গাড়িকে অবশ্য শুধুমাত্র রাতের অন্যতম ভরসা বলেও মনে করেন না সেক্টর ফাইভের বিভিন্ন যাত্রী৷ যদিও, শাটল গাড়িকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে৷

আরও পড়ুন: শিক্ষক হওয়ার জন্য চাকরি ছাড়তে হচ্ছে চিকিৎসকদের

অনেকে এখন অ্যাপ নির্ভর ক্যাবে-ও ভরসা করেন৷ তবে, এই ধরনের ক্যাবের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠছে৷ সব মিলিয়ে, অনেকে এমনও বলতে পারেন যে, প্রশাসনের তরফে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত এবং মনোভাব থাকা উচিত, যাতে কোনও যাত্রীকে অবাঞ্ছিত কোনও ঘটনার সম্মুখীন হতে না হয়৷ কিন্তু, শুধুমাত্র প্রশাসন কঠোর হলেই কি বিভিন্ন অটো চালকের অটোক্রেসি থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হবে? না কি, প্রশাসনের কঠোর মনোভাবের সঙ্গে নাগরিক হিসেবে যাত্রীদের দায়িত্ব পালনও প্রয়োজন?

আরও পড়ুন: সিলেবাসে চাই ওষুধবিজ্ঞান, পাঠে মগ্ন স্কুল-পড়ুয়ারা

এ ক্ষেত্রেও অনেকে এমন বলতেই পারেন যে, কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন অটো চালক যেভাবে অটোক্রেসি জারি রেখেছেন, তার পিছনে আসলে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব৷ তার উপর, কোনও এক জন যাত্রীর তরফে কোনও অটো চালকের অটোক্রেসির বিরুদ্ধে সাধারণত রুখে দাঁড়ানো সহজ বিষয়-ও নয়৷ কেননা, সংশ্লিষ্ট যাত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টিও রয়েছে৷ কারণ, এমনও হয়, কোনও কারণে কোনও যাত্রীর সঙ্গে কোনও অটো চালক দুর্ব্যবহার করছেন৷ অথচ, চুপ করে রয়েছেন সহযাত্রীরা৷

আরও পড়ুন: ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয় অ্যাজমার ভ্যাকসিন’

যদিও, কোনও না কোনও যাত্রী কোনও না কোনও সময় কোনও না কোনও সহযাত্রীকে সহায়তাও করেন৷ তবে, সব যাত্রী না হলেও অধিকাংশ-ই যদি চুপ করে না থাকেন, তা হলেও কি জারি থাকতে পারে বিভিন্ন অটো চালকের অটোক্রেসি? ধরা যাক, কোনও একটি অটো রুটে এক হাজার নিয়মিত যাত্রী রয়েছেন৷ এমন হল, বিভিন্ন উপায়ে জারি রাখা বিভিন্ন চালকের অটোক্রেসির বিরুদ্ধে সরব হতে অটো বয়কট করলেন অধিকাংশ যাত্রী৷ তা হলে নিশ্চয় আর জারি থাকবে না সংশ্লিষ্ট অটো চালকদের অটোক্রেসি?

আরও পড়ুন: ৪.৫ কোটি ভুক্তভোগীতেও চাপা পড়ে যাবে সারদাকাণ্ড!

তবে, মনে হয় না এমনটা সম্ভব হবে৷ কেননা, বিভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন অটো চালকের অটোক্রেসি অর্থাৎ, স্বৈরতন্ত্রের শিকার হতে থাকলেও, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মনে হয় না যাত্রীদের সকলে না হলেও তাঁদের বড় অংশ একজোট হয়ে অটো বয়কট করতে পারবে৷ তার উপর, অটোর প্রতি বিভিন্ন যাত্রীর বিভিন্ন ধরনের প্রীতি যেমন রয়েছে৷ তেমনই, বিভিন্ন স্থানে অটো-ই আবার বিভিন্ন যাত্রীর অন্যতম ভরসা৷ যে কারণেও না, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহলে অটোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা গেলেও, শেষ পর্যন্ত অটো-ই ভরসা হয়ে থাকে ওই সব মহলে!

আরও পড়ুন: সারদাকাণ্ডে এক সাংবাদিকের আত্মহত্যা এবং মিডিয়া

যে কারণেও না, স্ট্যান্ড থেকে প্রতিটি আসনে এমনকী সম্ভব হলে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরুর পরেও মাঝ পথে যখন এক অথবা দু’ জন যাত্রী হয়ে যায় কোনও অটোয়, তখন কি আর নির্দ্বিধায় অন্য ফাঁকা আসনের যাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করতে পারেন চালক? এবং, ওই কারণেও না, ওই এক অথবা দু’ জন যাত্রী তখন সাধারণত চালকের অনুগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন যে, কখন তিনি আবার অটোর যাত্রা শুরু করবেন? স্বাভাবিক ভাবেই, এই বিষয়টিও কি অস্বীকারের যে, অটোর প্রতি বিভিন্ন যাত্রীর বিভিন্ন ধরনের ক্রেজ অর্থাৎ, অটো-ক্রেজি যাত্রীরা আছেন বলেই না বিভিন্ন অটো চালকও বহাল তবিয়তে জারি রাখতে পারছেন তাঁদের অটোক্রেসি!

_____________________________________________________________________

আরও পড়ুন:
(০১) কলকাতায় এ বার উবের ক্যাব চালাবেন যৌনকর্মীরা
(০২) ‘চিকিৎসায় উন্নয়নের নামে ভাঁওতা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী’
(০৩) ‘সারদার সত্যকে ধামাচাপা দিয়েছে মমতার সরকার’
(০৪) সারদা-নারদের সত্য এবং মদন বনাম মদন আর মিত্র
(০৫) বিপর্যয় মোকাবিলায় নিধিরাম মমতার ‘উন্নত’ দফতর

_____________________________________________________________________