শংকর দাস, বালুরঘাট: দেবীপুরাণের মন্ত্রোচ্চারণে প্রথমেই আত্রেয়ী নদীর নামের উল্লেখ রয়েছে। দুর্গাপূজার মহাস্নানের মন্ত্রচারণে বলা রয়েছে….”ওঁ আত্রেয়ী ভারতী গঙ্গা যমুনা চ সরস্বতী। সরযুর্গণ্ডকি পুণ্যা শ্বেতগঙ্গা চ কৌশিকী। ভোগবতী চ পাতালে স্বর্গে মন্দাকিনী তথা….”।

কথিত আছে মহর্ষি নারদের মানস পুত্র অত্রি মুনির আশ্রম ছিল আত্রেয়ী নদীর তীরেই। তাঁর মেয়ে আত্রেয়ীর নাম থেকেই এই নদীর নামকরণ তিনি আত্রেয়ী করেছিলেন। ইতিহাসে তন্ত্র সাধনার অন্যতম পীঠস্থান ছিল আত্রেয়ী নদীর দুই পারে বিস্তীর্ন অঞ্চল। আত্রেয়ী পাড়ে যার নির্দশন হিসেবে রয়েছে অসংখ্য কালী মন্দির।

পৌরাণিক কালে অবিভক্ত দিনাজপুরের বিশেষ করে বালুরঘাট ও কুমারগঞ্জের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া আত্রেয়ী তীরে বসেই বিভিন্ন তন্ত্রসাধক তাঁদের তন্ত্র সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। মুনি ঋষিদের যে সাধনার মূল আরাধ্য দেবীই ছিলেন কালী। সেই সব তন্ত্রসাধকদের মধ্যে স্বয়ং বামাক্ষ্যাপার নামও যেমন শোনা যায় তেমনই ভবাণীপাঠক অঘোরী বাবাও ছিলেন অন্যতম। আত্রেয়ীর দুই পাড়ের জঙ্গল ও তার নির্জনতা ছিল তপস্যার অন্যতম আধার। স্বাভাবিক ভাবেই পৌরাণিক কালে এই আত্রেয়ীর পাড় ছিল অন্যতম দেবীপীঠ।

বিশিষ্ঠ তন্ত্র সাধক বাপ্পাদিত্য বন্দোপাধ্যায় জানিয়েছেন তন্ত্র সাধনা বিষয়টি সম্পূর্ণ একান্তের। যার জন্য নির্জন নিরিবিলি ও জঙ্গলাকীর্ণ নদী তীর সব চাইতে উপযুক্ত। আর এসবের জন্য অন্য সব নদী থেকে পবিত্রস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল আত্রেয়ী নদী তীরের অঞ্চল। যার প্রমাণ দেবীপুরাণেও রয়েছে। সেখানে মন্ত্রোচ্চারণে গঙ্গা যমুনা সরস্বতীরও আগে পবিত্র এই আত্রেয়ী নদীর নাম উল্লেখ রয়েছে। যে কারণে সাধক বামাক্ষ্যাপার মত সাধকরাও তাঁদের মোক্ষলাভের সাধনার জন্য এখানে ছুটে এসেছিলেন।

ইতিহাস গবেষকদের মতে স্বয়ং বামাক্ষ্যাপাও পায়ে হেঁটে এসে বর্তমান পতিরামে আত্রেয়ী নদীর ধারে বর্তমান পতিরাম এলাকায় অবস্থিত বিদ্দেশ্বরী মন্দিরে নিয়মিত পুজো দিয়ে সাধনা করে গিয়েছেন। সুপ্রসিদ্ধ তন্ত্রসাধক তথা সিদ্ধপুরুষ অঘোরী বাবা আত্রেয়ী নদীর ধারে চকভবানী এলাকাকে তাঁর তন্ত্র সাধনার জন্য বেছে নিয়েছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর পর সমাধিস্থলের উপরেই পরবর্তীতে তাঁর মন্দির গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়াও ভবাণীপাঠক ও দেবী চৌধুরানী সহ আরও অনেকেই কুমারগঞ্জ এলাকায় বর্তমান ধাদলপাড়ার নিকট অবস্থিত প্রাচীন কালী মন্দির ও পতিরামের বিদ্দেশ্বরী মন্দিরে পূজো দিয়ে তবেই ডাকাতির উদ্দেশ্যে রওনা দিতেন।

বিশিষ্ঠ ইতিহাসবিদ সমিত ঘোষ জানিয়েছেন যে আত্রেয়ী নদীকে কেন্দ্র করে বালুরঘাট তথা আশপাশের বিস্তীর্ন অঞ্চল তন্ত্র সাধনার অন্যতম সাধনা ক্ষেত্র হিসেবে কালী সাধকদের কাছে প্রিয় ছিল। বিখ্যাত সব সাধকরা তাঁদের সিদ্ধিলাভের জন্য এই অঞ্চলকে বেছে নিয়ে ছিলেন।

যাঁদের মধ্যে দেবীচৌধুরাণী ভবাণীপাঠক ও সিদ্ধপুরুষ সাধক অঘোরীবাবা থেকে শুরু করে বামাক্ষ্যাপাও রয়েছেন। পবিত্র আত্রেয়ী নদীর তীরই যে সাধকদের বিচরণভূমি ও তন্ত্রসাধনার পীঠস্থান ছিল তার নিদর্শন সুপ্রাচীন বিভিন্ন কালীমন্দিরগুলি আজও বহন করে চলেছে।