বিভাস ভট্টাচার্য, কলকাতা: একটি দু’টি নয়, আন্তঃরাজ্য এবং বিদেশ মিলিয়ে গত ১৫ বছরে প্রায় ৩০০টি শিশু পাচার হয়েছে৷ এ দেশে ছাড়াও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিদেশে বসবাসকারী সন্তানহীন দম্পতিরাও এই শিশুদের কিনে নিয়েছেন৷ জলপাইগুড়ি হোমের শিশু পাচার চক্রের তদন্তে নেমে এ রকমই জানতে পেরেছেন সিআইডি আধিকারিকরা৷ টাকার অংকটা কখনও ১০ লাখ, কখনও আবার ৪০ লাখ পর্যন্ত উঠেছে৷

এই কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে হোমের দুই আধিকারিক চন্দনা চক্রবর্তী ও সোনালি মণ্ডলকে গ্রেফতার করা হয়েছে৷ রবিবার আদালত এই দু’জনকে ১৩ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে৷ যে হোমটির বিরুদ্ধে অভিযোগটি উঠেছে, তার নাম নর্থ বেঙ্গল পিপলস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার৷ ধৃত ওই দু’জনই এই হোমটির আধিকারিক বলে জানা গিয়েছে৷ এই হোমটি সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত৷ জলপাইগুড়ির এক রাজনৈতিক নেত্রীর নামেও এই চক্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে এসেছে৷ ওই নেত্রীর নাম জুহি চৌধুরী৷ রাজ্য সিআইডি-র প্রধান ড: রাজেশ কুমার শনিবার www.kolkata24x7.com-কে বলেছেন, ‘‘জলপাইগুড়ির এই শিশু পাচার চক্রে বিদেশের এই যোগসূত্রটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে৷’’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডি-র এক আধিকারিক বলেন, ‘‘প্রায় ১৫ বছর ধরে শিশু পাচার কাণ্ডে জড়িয়ে রয়েছে এই হোমটি৷ মূলত ইউরোপের দেশগুলিতেই এরা শিশু পাচার করত৷ তদন্তে এই দু’জন ছাড়াও উঠে এসেছে বেশ কিছু সরকারি আধিকারিকের নাম৷ যাদের মধ্যে রাজ্যের সমাজকল্যাণ দফতরের কিছু আধিকারিকের নামও উঠে এসেছে৷ শিশু দত্তক নেওয়ার সমস্ত নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এরা বিদেশে দিনের পর দিন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পাচার করে যাচ্ছিল৷ আমাদের ধারণা, গত ১৫ বছরে এরা অন্তত ৩০০-র কাছাকাছি শিশু পাচার করেছে৷’’

গত বছর নভেম্বর মাসে উত্তর ২৪ পরগণার বাদুরিয়ায় একটি নার্সিংহোমের সন্ধান পায় সিআইডি৷ তদন্তে নেমে মোট ১৩টি শিশু ছাড়াও গ্রেফতার করা হয় মোট ২০ জনকে৷ পাশাপাশি উঠে আসে কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভূমিকাও৷ সিআইডি-র এক সিনিয়র আধিকারিকের কথায়, ‘‘বাদুরিয়া কেসের সঙ্গে এই কেসটির মিল আছে৷ ওখানে যেরকম গরিব মহিলাদের টার্গেট করা হত, যাঁরা ইতিমধ্যেই কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন৷ তাঁদের বোঝানো হত যে তাঁরা ফের আরও একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিতে চলেছেন৷ এখানেও তাই৷ ওই মায়েরা যখন সন্তানের জন্ম দিতেন তখন নার্সিংহোমের সঙ্গে যোগসাজশে তাঁদের বলে দেওয়া হত, হয় তাঁরা কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন, অথবা মৃত সন্তান প্রসব করেছেন৷ এ ছাড়া পরিত্যক্ত শিশুদেরও এই হোমে নিয়ে এসে পরবর্তীকালে তাদেরকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পাচার করত জলপাইগুড়ি হোমের এই আধিকারিকরা৷ খরিদ্দারের সঙ্গে পাকাপাকি কথা বলার পর এরা খরিদ্দারকে টাকা ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিতে বলত৷ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নজর এড়ানোর জন্যই এরা এই বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে টাকা ভাগ করে দিত৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘বিভিন্ন রাজ্যেও শিশু পাচার করছিল এই হোমটি৷ নি:সন্তান দম্পতিরা সরাসরি যোগাযোগ করতেন এদের সঙ্গে এবং পরবর্তীকালে জলপাইগুড়িতে এসে বাচ্চা নিয়ে যেতেন৷’’

কীভাবে এই চক্রটি ধরা পড়ল? সিআইডি সূত্রে জানা গিয়েছে এক মাস আগে সিআইডি-র এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের কাছে অনাথ ও ভবঘুরে শিশুদের উপর কাজ করা কেন্দ্রীয় একটি সংস্থা Central Adoption Resource Agency (CARA) অভিযোগ জানায় যে, উত্তরবঙ্গের এই হোমটি থেকে শিশু পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে তাদের সন্দেহ হচ্ছে৷ বিষয়টি তারা সিআইডিকে খতিয়ে দেখতেও অনুরোধ করে৷ অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে নামে সিআইডি৷ সিআইডি-র আধিকারিকরা জানিয়েছেন, এর পরই তাঁরা খোঁজ খবর নিতে শুরু করেন৷ আড়িপাতা হয় হোমের আধিকারিকদের ফোনে৷ সেখানেই তাঁরা শুনতে পান কীভাবে তারা পরবর্তী শিশু পাচারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন৷

সিআইডি-র এক আধিকারিক বলেন, ‘‘আমরা চেয়েছিলাম একেবারে বামাল সমেত গ্রেফতার করতে৷ কিন্তু সেটা করতে গেলে অনেকটাই দেরি হয়ে যেত৷ সে কারণে আমরা আর দেরি করিনি৷ পাশাপাশি হোমের কাগজপত্র পরীক্ষা করে আমরা প্রচুর অসঙ্গতি পেয়েছি৷ এক শ্রেনির সরকারি আধিকারিকের সহায়তায় এরা নকল কাগজপত্র তৈরি করে ক্রেতার হাতে তুলে দিত৷’’

# Shocking revelation has marred the history of West Bengal. Not one or two but atleast 300 children were trafficked for the last 15 years due to child trafficking.