স্টাফ রিপোর্টার, বালুরঘাট: স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য শহরের নাম হল দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট। এই জেলার প্রানকেন্দ্র তথা সদর শহর বালুরঘাট থেকে বহু বিপ্লবী ইংরেজদের বিরুদ্ধে দেশের স্বাধীনতার জন্য সক্রিয় ভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই জেলার সরোজরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, পুলিনবিহারি দাশগুপ্ত, রাধামোহন মোহান্ত সহ অন্যান্য বিপ্লবীদের নাম আজও স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে স্বরনীয় হয়ে আছে। আর এই কালীপুজো নিয়ে এই জেলার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে ছোট্ট ইতিহাসও রয়েছে।

জানা গিয়েছে, এখানে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আরাধ্য মা মশানকালীর পুজো আজও তাঁদের বংশধরেরা করে আসছেন। ৪২’এর ভারতছাড়ো থেকে শুরু করে বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ সহ স্বাধীনতার যত গুলো আন্দোলন বালুরঘাট থেকে সংগঠিত হয়েছিল। সেগুলির প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই শহরের সরোজরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় পুলিনবিহারি দাশগুপ্ত রাধামোহন মোহান্ত সহ অন্যান্য বিপ্লবীরা সক্রিয় ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই আত্রেয়ী নদীর তীরে অবস্থিত মশানকালী মন্দিরে পুজো দিয়ে তবেই আন্দোলনে নামতেন। শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামীরাই নন মৎসজীবিরাও এই মন্দিরে পুজো দিয়ে তবেই আত্রেয়ী নদীতে মাছ ধরার জাল নামান। কয়েক দশক ধরে চলে আসা জেলেদের এই রীতি আজও বর্তমান। প্রতিবছরের মতো এবারেও আত্রেয়ী নদী তীরে অবস্থিত কংগ্রেস পাড়ার মন্দিরে পূজিত হবেন মা মশানকালী।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বালুরঘাটের গুরুত্বের কথা সকলেরই জানা। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অন্যতম পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত আত্রেয়ী পাড়ে অবস্থিত এই শহরের কংগ্রেস পাড়া। এই পাড়ারই বাড়িতে ছোট থেকে বড় হয়ে উঠেছিলেন ৪২এর ভারতছাড়ো আন্দোলনের পুরভাগে থাকা তিন ভাই সরোজরঞ্জন সুরেশরঞ্জন ও সুশীলরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় সহ মহারাজা বোস। শুধু তাই নয়, এই পাড়ারই বাসিন্দা ছিলেন লতা সিকদাররা। শুধু তাই নয় এই পাড়াতেই কংগ্রেসের কার্যালয়ের উদ্ববোধনে এসেছিলেন স্বয়ং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। তবে কংগ্রেস পাড়ায় অবস্থিত এই মা মশানকালীর পুজো কবে ও কারা প্রথম শুরু করেছিলেন তা কারও জানা নেই বলেই কথিত আছে।

তবে পরবর্তীতে এই কালীই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছিলেন আরাধ্য দেবী। জানা গিয়েছে, পুজো থেকে শুরু করে মন্দিরের দেখভাল সব কাজই করতেন স্বাধীনতা সংগ্রামী লতা সিকদার ও মহারাজা বোস। আজও এই মশানকালী মন্দির ও পুজো পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন তাঁদেরই বংশধরেরা। এই পূজোর বিশেষত্ব হলো এখানে দেবী পশ্চিম মুখী। অবিভক্ত দিনাজপুরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বুড়িমাকালীর বড় বোন হিসেবে মানেন এলাকার মানুষজন। প্রথমে মশানকালীকে পুজো দিয়েই তবেই বুড়িমাকালীর পুজোর নিয়ম আজও নিষ্ঠার সহিত পালিত হয়ে আসছে।

বিপ্লবী সরোজরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের পৌত্র সুশোভন চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ছোট বেলা থেকেই তাঁরা এই মন্দিরের মাহাত্ম্যর কথা শুনে এসেছেন। তাঁদের এই পাড়াটির স্বাধীনতার আন্দোলনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ৪২এর আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী দুরদুরান্ত থেকে আসা মানুষজনকে এই পাড়াতে রেখেই নিজের খরচে রান্না করে খাইয়েছিলেন সরোজরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছেই নয় জানা গিয়েছে, অন্যান্যদের কাছেও আরাধ্য দেবী হয়ে পূজিত হন এই পাড়ার দেবী মশানকালী। তিনি আরও জানিয়েছেন যে, বাবা মায়ের কাছে শুনেছেন আন্দোলনে যাওয়ার আগে বিপ্লবীরা মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে তারপর রওনা দিতেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামী লতা সিকদারের পুত্র অসিতবরণ সিকদার জানিয়েছেন যে, কবে এই পুজো চালু হয়েছে তা কারও জানা নেই। এটা মূলত মশানকালী হলেও অনেকে এটাকে ডাকাতকালী বলেও চেনেন। আগে নাকি ডাকাতরা এখানে পুজো দিয়ে যেতেন। পরবর্তীতে তাঁর মা লতা সিকদার ও মহারাজা বোস দুইজনে মিলে এই পুজো চালু রাখেন। বংশধর হিসেবে এখনও তাঁরা মশানকালীর পুজো ধরে রেখেছেন।