কলকাতাকে এখন কঙ্কালিতলা বললে ভুল হয় না৷ খবরের কাগজ হোক কিংবা চ্যানেল যেদিকেই তাকানো যাক, জায়গা জুড়ে বসে আছে কঙ্কাল৷ বাঙালি নাকি  সুন্দর ভালোবাসে৷ তা এত কঙ্কালপ্রীতি সে সইছে কেমন করে৷ শোনা যাচ্ছে, কেউ কেউ নাকি অফিস বন্ধ করে সাধ করে কঙ্কাল দেখতে যাচ্ছেন৷ হানাবাড়ির সামনে সেলফিও নাকি তুলেছেন কেউ কেউ৷ শুনে খটকা লাগে৷ এ যদি সত্যি হয়, তাহলে তো সামাজিক বিকৃতমনস্কতার ঠক বাছতে গাঁ উজাড় হবে৷ আর তখনই প্রশ্ন জাগে, যা শোনা যাচ্ছে তা কি সত্যি? নাকি সত্যির নামে পরমানন্দে কেউ শুনিয়ে চলেছে এই কঙ্কাল কাহিনি?
সোশ্যাল মিডিয়াকে যদি সমাজের মুখপত্র ধরতে হয়, তবে তো অনেকেই বলছেন, কঙ্কাল শব্দ চোখে পড়লেই তাঁদের গা গুলোচ্ছে৷ অথচ গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ ফলাও করে কঙ্কালকেই সামনে আনছে দিনভর৷ কোথাও একটা গোলমাল যেন থেকেই যাচ্ছে, লালমোহনবাবুর কথায় যাকে বলা যেতে পারে, ‘হাইলি সাসপিসিয়াস’৷

যা দেখা যাচ্ছে, বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়ে নাকি আর বাঙালির মাথাব্যাথ্যা নেই৷যত আগ্রহ নাকি শুধু ভূতে৷ গত কয়েকদিন ধরে সংবাদ মাধ্যম যা দেখাচ্ছে তা দেখে অনেকের এমনই প্রতিক্রিয়া৷ কঙ্কাল নিয়ে বাঙালির কি সত্যিই এতটা আগ্রহ ছিল নাকি হঠাৎ তা বাড়িয়ে দিল রবিনসন স্ট্রিটের ঘটনা? গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন কাগজ ও টেলিভিশন চ্যানেলের সিংহভাগ জায়গা নিয়ে নিয়েছে এই কঙ্কালকাহিনি৷ হয়তো মানুষ চাইছে বলেই তা পরিবেশন করা হচ্ছে ৷ শুধু তো কঙ্কাল নয় এই অদ্ভুত (পড়ুন ভূতের) কাণ্ডকারখানার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেচ্ছা, যৌন সুড়সুড়ি, পাগলামি, জমি বাড়ি, সম্পত্তিও ৷পাড়ার চায়ের দোকান, কফিহাউসের পাশাপাশি হাল আমলের সোশ্যাল মিডিয়া হোয়াটসঅ্যাপ ফেসবুক সর্বত্রই উঠে আসেছে দেবযানী-পার্থ- রবিনসন স্ট্রিট- প্রোমোটারি- কঙ্কাল-সাইকো ই্ত্যাদি৷robinson-street
আবার এটাও ঠিক এমন খবরে বিরক্তও হচ্ছেন কেউ কেউ৷

অনেকেরই মনে হয়েছে এটা মিডিয়ার বাড়াবাড়ি৷পথে-ঘাটে কান পাতলে অথবা ফেসবুকে চোখ রাখলে তারই প্রতিফলন মিলছে৷ কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন- কে বেশি অসুস্থ রবিনসন স্ট্রিটের এই দে পরিবার নাকি যারা তাদের নিয়ে মাতামাতি করছে তারা সকলে? কারও বা প্রশ্ন পাথর বা মাটির মূর্তিকে খাবার খেতে দেওয়ার মধ্যে যদি কোনও অস্বাভাবিকতা না থাকে তাহলে কঙ্কালকে খেতে দেওয়া নিয়ে এত কথা কীসের? আসলে বোধহয় সবাই কমবেশি সাইকো ৷সবাই পুরোপুরি স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা অস্বাভাবিক৷ কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে বলে ফেলছেন খবরের কাগজে যা লেখা হচ্ছে তা তো ছোটদের পড়ার বা দেখার উপযুক্ত নয়৷কারও বা প্রশ্ন সীমান্তে গুলি চলেছে, পাকিস্তান যখন যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে-সেই সময় এই কঙ্কালকাণ্ড খবর হিসেবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কেন ?
তবে অস্বীকার করা যায় না যে, এমন রগরগে ব্যাপারে একদল মানুষের তো আগ্রহ আছেই৷ তা না হলে শহরে সদ্য আবিষ্কৃত এমন হানাবাড়িটি দেখতে অফিস চলতি মানুষেরও ভিড় জমত না৷ কেচ্ছার প্রতি মানুষের আগ্রহ আগেও ছিল৷নইলে আজ থেকে ৩৫-৪০ বছর আগে দেবযানী বণিক এবং সুরূপা গুহ হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলি নিয়ে দিনের পর দিন খবরের কাগজে লেখা হত না ৷ সেটা লোকে পড়ত বলেই তা ছাপা হত ৷ তখন অবশ্য বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যম ছিল না৷তবে অত পুরনো দিনে যেতে হবে না, ২০০৪ সালে ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের ফাঁসি নিয়েও রীতিমতো বিতর্ক দানা বেঁধেছিল ৷ হেতাল পারেখ নামে এক কিশোরীকে হত্যা ও ধর্ষণ করার অপরাধে ধনঞ্জয়ের ফাঁসি হয়৷বহুদিন পরে আবার কলকাতায় ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, তাই সেই সংক্রান্ত খবর তুলে ধরতে সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলিকে সক্রিয় হতে দেখা গিয়েছিল৷ যদিও তা তুলে ধরতে গিয়ে সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা দেখে তা বাড়াবাড়ি বলে তখন অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন৷ সেই খবরের একটা চাহিদা অবশ্যই ছিল তার কারণ তখন কিছু লোক ওই ফাঁসি সরাসরি দেখার অনুমতি চেয়ে জেল দফতরে আবেদন করেছিলেন ৷ যদিও সে আবেদন তখন মঞ্জুর হয়নি৷ কিন্তু এমন আবেদনই ইঙ্গিত করে মানুষের মানসিকতার৷ জানি না এই সব ‘বিকৃত মস্তিকের’মানুষগুলি ব্যতিক্রমী কি না৷ তবে এটা তো ঠিক খাবার টেবিলে বসে পৃথিবীর কোনও প্রান্তে হওয়া যুদ্ধের ছবি অনেকেই এখন দেখেন৷
ছোটবেলায় দেখতাম অনেক ছবিতে লেখা থাকত শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য৷তার কারণ কিন্তু শুধুমাত্র যৌনতা নয়৷হাড় হিম হিম করা ভৌতিক ব্যাপার থাকলেও সেটা ছোটদের দেখার উপযুক্ত বলে মনে করা হত না৷তাই কোনও কিশোর অমন ছবি দেখতে চাইলেও বহু ক্ষেত্রেই সিনেমা হলের টিকিট চেকার তাদের আটকে দিত ৷কারণ তেমন ছবি দেখে সেই কিশোরের রাতের ঘুম নষ্ট হতে পারে ৷অমন ভৌতিক ব্যাপার স্যাপারের জেরে দুঃস্বপ্ন দেখে কখনও কখনও আতঙ্কে উঠে বসত তারা ৷এখন অবশ্য সময় বদলেছে – বাড়ির অন্দরে যেভাবে ঢুকে পড়েছে কেবল টিভি তাতে কোনও ছবি আজ আর বলতে গেলে শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নয়৷বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে ঘরের আলো জ্বালিয়ে চাইলে সব ছবিই সপরিবারে এখন দেখা যেতে পারে ৷তাহলে নিউজ চ্যানেল এবং খবরের কাগজ নিয়ে এমন ছুৎমার্গ কেন থাকবে? পরিবর্তন অথবা বিবর্তন কিছু একটা হচ্ছে চারপাশে৷বাজার অর্থনীতিকে মেনে নেওয়া যখন হচ্ছে তখন সংবাদ মাধ্যমের এ ভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াটাকেও না চাইলেও মেনে নিতে হবে৷ অর্থাৎ কোনও ভূত যদি থেকে থাকে সে আসলে‘টিআরপি’র ভূত৷ আর তার জেরেই চাপা পড়ছে একদল মানুষের কণ্ঠস্বর৷ প্রাপ্তবয়স্ক কিংবা প্রাপ্তমনস্ক হওয়া এক জিনিস, কিন্তু ব্যবসা আর মুনাফার খাতিরে, সামাজিক দায়বদ্ধতাকে শিকেয় তুলে, মানুষকে খবরের ক্যাপসুল গেলানো আর এক জিনিস৷ সন্দেহ নেই, আমবাঙালিকে কঙ্কালের এই তেতো ক্যাপসুলই গিলতে হচ্ছে ক’দিন ধরে৷kankal-final

আসলে সবকিছু বোধহয় মেনে নেওয়া যায় না৷ এক বিকৃতমনস্ক মানুষের কাহিনি যেভাবে অনবরত হাতুড়ি মেরে মানুষের মনে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা চলছে তাতে প্রশ্ন ওঠে, এই কি সঠিক পথ? সকালে কাগজ হাতে বিবমিষা আসছে সাধারণ মানুষের, বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমগুলি যেন হরর চ্যানেলে পর্যবসিত৷ খবর দেওয়ার দায় নিশ্চয়ই থাকবে, কিন্তু খবরকে খাবার করে তোলার দায় কার? বিকৃতমনস্কতাকে নিয়ে অষ্টপ্রহর কীর্তন বসানোর দায় কার? প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা৷ আর জানা বলেই, সাধারণ মানুষের কাতর প্রার্থনা, প্লিজ এই কঙ্কাল-বন্দনা বন্ধ হোক৷

প্রতিবেদক: সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়