গুয়াহাটি: সেই শনিবার। জীবনের সবথেকে মারাত্মক দিনগুলোর একটা। বিরাট তালিকায় যদি নাম না থাকে তাহলেই স্পষ্ট দেশহীন হয়ে যাওয়া। তার মানে এতদিন ভারতে থেকে আর নিজের দেশ নেই। এরকমই আশঙ্কা নিয়ে দিনটা শুরু হল অসমে। বিবিসি জানাচ্ছে, জাতীয় নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত তালিকায় ৪১ লক্ষেরও বেশি মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে এদের মধ্যে কতজনের নাম আবার স্থান পাচ্ছে তাও দেখার বিষয়।

কারণ এনআরসি খসড়া তালিকায় ৪০ লক্ষের নাম বাদ পড়েছিল। পরে আর ১ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়ে। সবমিলে ৪১ লক্ষ অসমবাসী দেশহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। অসমের পরিস্থিতি যে কোনও সময় বিগড়ে যেতে পারে। তার জন্য প্রস্তুত বিরাট পরিমাণ নিরাপত্তারক্ষী। বিশেষ করে রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে। কারণ এনআরসি চূড়ান্ত তালিকায় নাম বাদ পড়েছে এমন মানুষের মধ্যে বাংলাভাষী মুসলমানদের সংখ্যাই বেশি। এর জেরে অসমবাসী বাঙালি ও অসমীয়াদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে চলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিবিসি জানাচ্ছে, অসমের ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস বা এনআরসির প্রথম তালিকাটি প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে। সেটা ছিল ভারত ভাগের চার বছর পর। সেই সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমন অসমের জনসংখ্যার ভারসাম্য টলিয়ে দিতে পারে এই আশঙ্কায় শুরু হয় জাতিভিত্তিক আন্দোলন। এর জেরে নাগরিকত্বের প্রথম তালিকাটি তৈরি হয়।

সমস্যা গুরুতর হয় ১৯৭০ দশকে। তখন পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ তৈরির হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলছে। ১৯৭১ সালের সেই রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ পালিয়ে ভারতে চলে আসেন। এদের একাংশ অসমেই আশ্রয় নেয়। ১৯৭৯ সাল থেক এবার তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু)। ১৯৮৩ সালে এই আন্দোলন তীব্র হিংসাত্মক হয়। মৃত্যু হয় অন্তত ২০০০ জনের। ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে চুক্তি করে আসু।

সেই চুক্তিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চ আগে থেকে আসামের বাসিন্দা কেউ এমনটা প্রমাণ করতে না পারলে তাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে এবং তাকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু চুক্তিটি কখনই বাস্তবায়ন করা হয়নি। ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোটে এক পিটিশন দায়ের করে এনআরসি চালুর আবেদন করা হয়। শুরু নতুন করে বিতর্ক। সেই বিতর্কিত তালিকার চূড়ান্ত রূপ শনিবার। তার পর থেকেই যথেষ্ট উত্তপ্ত হবে পরিস্থিতি। যদি অসম সরকার দাবি করেছে, যাদের নাম বাদ পড়বে তাদের পুনরায় আইনি সাহায্য দেওয়া হবে। কিন্তু ভয় সর্বত্র। কী হয় কী হয় ভাব ছড়িয়ে।