সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: এশিয়ার সব থেকে বড় দুটটি শিবলিঙ্গ আছে মন্দির দুটিতে। এর মধ্যে একটি বড় কালো কষ্টি পাথরে তৈরি প্রায় ১১ ফুট উচ্চতার শিবলিঙ্গ। শিব মন্দির দুটি ছাড়াও চৌহদ্দির মধ্যে একটি পতিতপাবনী দুর্গার মন্দির। তৈরি হয়েছিল ১৭৮২ সালে। এখনও বিশাল ধুমধাম করে পালিত হয় শিবরাত্রি। এমনই হল কলকাতার খিদিরপুরের ‘ভূকৈলাস’ রাজবাড়ির শিব মন্দির। হিসাবেই পরিচিত।

প্রায় ২৫০ বছর আগে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে খিদিরপুরে ঘোষাল রাজবাড়ি স্থানান্তরিত হয়। রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল এই দুটি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। গোবিন্দপুর ত্যাগ করে ঘোষালরা খিদিরপুরে বিশাল রাজবাড়ী নির্মাণ করেন জয়নারায়ণ ঘোষাল। পঞ্চাশ একর জমির উপর শিবগঙ্গা নামে একটি বিশাল দিঘী খনন করেন। ১৭৮১ সালে রাজা জয়নারায়ণ ঘোষালা দিল্লীর সম্রাটের থেকে ‘মহারাজা বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন।

ওই ১৭৮১ সালেই শিব-গঙ্গা পুকুরের পাড়ে নির্মিত হয় শিব মন্দির দুটি। মহারাজের বাবা ও মায়ের নাম অনুসারে নামকরণ করা হয় মন্দির দুটির। জয়নারায়ণ নির্মিত মন্দিরগুলি রক্তকমলেশ্বর ও কৃষ্ণচন্দ্রেরশ্বর নামে খ্যাত । তৎকালীন মহারাজ জয়নারায়ণ প্রাসাদে অষ্টধাতুর কুলদেবী মা পতিত পাবনী মন্দির নির্মাণ করেন। পরে ওই মন্দিরের পাশে আরও চারটি মন্দির স্থাপন করেন। সেগুলি মকরবাহিনী গঙ্গা, পঞ্চানন দেব, রাজেশ্বর মহালিঙ্গ ও জয়কালী ভৈরব প্রভৃতি।এই সুন্দর মন্দির গুলি হিন্দু মুসলমান ও গ্রীক স্থাপত্যের নিদর্শন স্বরূপ বিরাজ করছে।

শোনা যায় সাধক রামপ্রসাদ ওই শিব মন্দির দর্শন করতে এসেছিলেন। তিনি এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে একশো পঞ্চাশ বিঘার উপর নির্মিত শিবমন্দির ও প্রাসাদের নাম রেখেছিলেন ভূকৈলাস (অর্থ পৃথিবীতে শিবের বাসস্থান কৈলাস)। ভূকৈলাসের শিবলিঙ্গ দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ বলেই খ্যাত। দুটি মন্দিরের মধ্যে রয়েছে শিব গঙ্গা নামে বিশাল দিঘী ও মন্দিরের সামনে রয়েছে নন্দীর বিরাট মূর্তি । প্রতিবছর এখানে ধুমধাম করে শিবরাত্রি পালিত হয়,মেলা বসে । খিদিরপুর ট্রাম ডিপোর উল্টোদিকের গলির বেশ কিছুটা ভেতরে অবস্থিত এই রাজবাড়ি।

বাকুলিয়ার ঘোষাল বংশের রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল ছিলেন যেমন (১৭৫২-১৮২১) শিক্ষিত, তেমনই বিচক্ষণ এবং বহুভাষায় পারদর্শী। বাংলা, হিন্দি, পার্সি ও ইংরেজি ভাষা জানতেন। তিনি ‘provincial counsel’ নির্বাচিত হয়ে ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান ও পাটনা দেখাশোনার দায়িত্ব পান। দিল্লির বাদশাহ জাহাঙ্গীর তাঁকে রাজা উপাধি দেন এবং প্রচুর পরিমাণে অর্থ লাভ করেন। ভূকৈলাস রাজবাড়ীর সমস্ত সম্পত্তি এখন পতিতপাবনী মন্দিরের নামে দেবোত্তর করা হয়েছে ।

১৯৯৬ সালে কলকাতা পুরসভা এই মন্দিরগুলিকে ‘হেরিটেজ সাইট’ হিসাবে চিহ্নিত করেন। কবছর আগে রাজ্য সরকার মন্দিরগুলি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করে। একসময় রাজা রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের সাথে সমাজ সংস্কারে হাত লাগিয়েছিলেন।

শিবরাত্রি হল হিন্দুধর্মের সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবাদিদেব মহাদেব ‘শিবের মহা রাত্রি’। অন্ধকার আর অজ্ঞতা দূর করার জন্য এই ব্রত পালিত হয়। অগণিত ভক্ত এইদিন শিবলিঙ্গে গঙ্গাজল, দুধ, বেলপাতা, ফুল দিয়ে পূজা করে থাকে। অন্ধকার আর অজ্ঞতা দূর করার জন্য এই ব্রত পালিত হয়। অগণিত ভক্ত এইদিন শিবলিঙ্গে গঙ্গাজল, দুধ, বেলপাতা, ফুল দিয়ে পূজা করে থাকেন।

শিবমহাপুরাণ অনুসারে এইরাত্রেই শিব সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মহা তান্ডব নৃত্য করেছিলেন । আবার এইরাত্রেই শিব ও পার্বতীর বিবাহ হয়েছিল । এর নিগুঢ় অর্থ হল শিব ও শক্তি তথা পুরুষ ও আদিশক্তি বা পরাপ্রকৃতির মিলন। এই মহাশিবরাত্রিতে শিব তার প্রতীক লিঙ্গ তথা শিবলিঙ্গ রূপে প্রকাশিত হয়ে জীবের পাপনাশ ও মুক্তির পথ দিয়েছিলেন।

হিন্দু শাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী, ব্রতের আগের দিন ভক্তগণ নিরামিষ আহার করতে হয়। রাতে বিছানায় না শুয়ে মাটিতে শুতে হয়। ব্রতের দিন উপবাস করতে হয়। তারপর রাত্রিবেলা চার প্রহরে শিবলিঙ্গকে দুধ, দই, ঘৃত, মধু ও গঙ্গাজল দিয়ে স্নান করানো করাতে হয়। তারপর বেলপাতা, নীলকন্ঠ ফুল, ধুতুরা, আকন্দ, অপরাজিতা প্রভৃতি ফুল দিয়ে পূজা হয়।

শিবরাত্রিতে ভারতের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ অর্থাৎ সোমনাথ, মল্লিকার্জুন, মহাকালেশ্বর, ওঁকারেশ্বর, কেদারনাথ, ভীমশঙ্কর, বিশ্বেশ্বর, ত্র্যয়ম্বকেশ্বর, বৈদ্যনাথ, নাগেশ্বর, রামেশ্বর ও ঘুশ্মেশ্বরে বহু মানুষের সমাগম হয় পুজো দেওয়ার জন্য।

পচামড়াজাত পণ্যের ফ্যাশনের দুনিয়ায় উজ্জ্বল তাঁর নাম, মুখোমুখি দশভূজা তাসলিমা মিজি।