হাওড়ার বালিতে কি বৈশালী ডালমিয়া জিতবেন? উত্তর হাওড়ায় লক্ষ্মীরতন শুক্লা? দুজনেই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী৷ লক্ষ্মীরতন এলাকার লোক হলেও বৈশালী বহিরাগত৷ দুজনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী৷ মমতা নিজেই বলেছেন, ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন ওঁর কাছে গিয়েছিলেন এলাকায় একটা মাঠের আরজি নিয়ে৷ উনি ওঁকে ফেরত পাঠালেন উত্তর হাওড়া আসনের প্রার্থী করে৷ হাওড়া জেলায় সোমবার ভোট৷ গতবার জেলার সব আসনেই জিতেছিল তৃণমূল৷ তার পর পাঁচ বছরের সরকার চলেছে৷ সরকারে থাকলে যা হয়, সেই দলের বিরুদ্ধে না পাওয়ার ক্ষোভ দেখা দেয় সাধারণ মানুষের মধ্যে৷ মমতার সরকারের ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক উলটোটা৷ হাওড়া পুরসভার মেয়র রথীন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, হাওড়া এবং নতুন সংযুক্ত বালি পুরসভায় ছ’শো পাকা রাস্তা হয়েছে, বাড়ি বাড়ি জল, পুরসভার মাধ্যমেই হাজার দশেক কর্মসংস্থান হয়েছে৷ দরিদ্ররা পাচ্ছেন ২ টাকা কেজি চাল৷ একশো দিনের কাজের প্রকল্প কেন্দ্রীয় সরকার বন্ধ করে দেওয়ার পরেও রাজ্য সরকার তা চালিয়ে যাচ্ছে৷ মূলত, যা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেয় সেই দিক থেকে ক্ষুব্ধ হওয়ার জায়গা নেই৷ গ্রামীণ হাওড়াতেও এইসব কাজ প্রচুর হয়েছে৷ রাস্তাঘাট, জল-আলো, কর্মসংস্থান৷ তার পরও কি তৃণমূলের পক্ষে সব কটি আসনই ধরে রাখা সম্ভব?

আরও পড়ুন

এবারও তৃণমূল ২০০-রও বেশি আসনে জিতে ক্ষমতায় আসবে

অশোক বসু
অশোক বসু

অনেকেই বলছেন, ছ’-সাতটি আসনে তৃণমূল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে৷ তার মধ্যে বালি একটি৷ বালি এক সময় ছিল সিপিএমের ঘাঁটি৷ সেখানে গতবার তৃণমূল প্রার্থী, প্রাক্তন পুলিশ কর্তা সুলতান সিং জিতেছিলেন৷ সুলতানও ছিলেন বহিরাগত৷ তবুও৷ তার পর বালি পুরসভা হাওড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে৷ ফলে, নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য বেড়েছে অনেকটাই৷ সেই আসনে এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী করেছেন জগমোহন ডালমিয়ার মেয়ে বৈশালীকে৷ বৈশালীর অ্যাডভান্টেজ এবং ডিসঅ্যাডভান্টেজ, তিনি রাজনীতির লোক নন৷ সেখানেও বহিরাগত৷ তাঁর বিরুদ্ধে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী, শিক্ষাবিদ অঞ্জন বেরা৷ গত লোকসভা নির্বাচনে সিপিএমকে খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ কংগ্রেসকেও না৷ এবার সাপ-নেউলের জোট হওয়ায় অঞ্জনের হয়ে ভোটের মাঠে নেমেছেন কিছু কর্মী৷ তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতাদেরও অনেকের পছন্দের প্রার্থী নন বৈশালী৷ প্রথম দিকে তাঁর হয়ে অনেকেই নামেননি৷ পরে বুঝেছেন, বৈশালী খোদ মুখ্যমন্ত্রীর প্রার্থী৷ তাঁদের কারও জন্য যদি বৈশালীকে হারতে হয়, তাহলে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রীর কোপে পড়তে হবে৷ কিছুটা সংশয় থাকলেও, শেষ দিকের পরিস্থিতি বিচার করে বলা যায়, বৈশালী জিতে যাবেন৷ একই অবস্থা লক্ষ্মীরতনের৷ নিজে স্থানীয় বাসিন্দা হলেও রাজনীতির ময়দানে বহিরাগত৷ তিনিও তৃণমূলের অনেকের পছন্দের প্রার্থী নন৷ তাঁর বিরুদ্ধে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী সন্তোষ পাঠক৷ এই আসনের অনেকটা জায়গা জুড়েই অবাঙালিদের দাপট৷ তাতে অবশ্য লক্ষ্মীরতনের সমস্যা নেই৷ কিন্তু সন্তোষ পাঠক নিজের দাপটেই টক্কর দিতে পারেন৷ এখানে বিজেপি-র প্রার্থী অভিনেত্রী রূপা গাঙ্গুলি৷ এই আসনের মধ্যে থাকা পনেরো নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা ৩৫ হাজারের মতো৷ সবাই প্রায় অবাঙালি৷ সঙ্গে ১৩ এবং ১৪ নম্বর ওয়ার্ড৷ এই তিনটে ওয়ার্ডের উপর ভরসা করেই রূপা গাঙ্গুলিকে প্রার্থী করা হয়েছিল৷ প্রথম দিকে রূপা তাঁর অভিনেত্রীসুলভ কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে খানিকটা প্রভাব বিস্তারও করেছিলেন৷ পরে অবশ্য তা অনেকটাই থিতিয়ে গিয়েছে৷ এখন লড়াই মূলত লক্ষ্মীরতন এবং সন্তোষ পাঠকের মধ্যে৷ লক্ষ্মীরতনও খোদ মুখ্যমন্ত্রীর প্রার্থী৷ তাই তাঁকে জিতিয়ে আনতে শেষ দিকে অন্তর্কোন্দল সরিয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে তৃণমূলের সব গোষ্ঠী৷ তবুও সন্তোষ পাঠক লক্ষ্মীরতনের কাছে কড়া চ্যালেঞ্জ৷

আরও পড়ুন

মমতার কি বুক শুকিয়ে গিয়েছে?

baishali
এই দুটি আসন ছাড়া বাকি শহরাঞ্চলের কোনও আসন নিয়েই তৃণমূলের সংশয় নেই৷ কিঞ্চিৎ সমস্যা আছে দক্ষিণ হাওড়া নিয়ে৷ প্রার্থী ব্রজমোহন মজুমদার বয়সের ভারে কিছুটা স্থবির৷ তাও এলাকার তৃণমূল নেতৃত্ব নিঃসংশয়, এখানে ব্রজবাবুই জিতবেন৷ মধ্য হাওড়ায় প্রার্থী বিদায়ী মন্ত্রী অরূপ রায় ফিরতে নাও পারেন বলে একটা হাওয়া উঠে গিয়েছে৷ মনে হয় না, সেই হাওয়ায় খুব জোর আছে৷ শিবপুরে জটু লাহিড়ির জয় নিয়ে কোনও সংশয় নেই৷
ডোমজুড়ে বিদায়ী মন্ত্রিসভার সদস্য রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি লক্ষাধিক ভোটে জিতবেন৷ রাজ্যে জয়ের ব্যবধানের রেকর্ডও করতে পারেন৷ এমনও মনে করছেন কেউ কেউ৷ এখানে নাকি বাম-কংগ্রেস জোট ওয়াক ওভার দিয়ে দিয়েছে রাজীবকে৷ গ্রামীণ হাওড়ায় সাঁকরাইল কেন্দ্রে তৃণমূলের শীতল সর্দার, উলুবেড়িয়া পূর্বে হায়দার আজিজ শফি, পাঁচলায় গুলশন মল্লিক চাপের মধ্যে আছেন৷ তবুও মনে হয় না, এঁরা হেরে যাবেন৷ গ্রামীণ হাওড়ার বাকি আসনগুলিতে নিঃসংশয়ে তৃণমূল৷ জেলার মোট ১৬টি আসনের মধ্যে ১৩-১৪টি আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনা প্রবল৷ হাতছাড়া হতে পারে বড়জোর দু-তিনটি আসন৷ যদি আগেরবারের মতো সব আসনই তৃণমূল দখল করে নেয়, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই৷

(লেখক ‘বর্তমান’ পত্রিকার প্রাক্তন কার্যনির্বাহী সম্পাদক এবং ‘সংবাদ প্রতিদিনে’র প্রাক্তন সহযোগী সম্পাদক)

আরও পড়ুন :

গোটা বীরভূমই কি তৃণমূলের দখলে আসছে?

ম্যাজিক না হলে উত্তর কলকাতা তৃণমূলেরই থাকবে