দেবযানী সরকার, কলকাতা: দিন দিন পশুপাখির পিছনে খরচের বহর বেড়েই চলছিল।ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল সরকারি অনুদানের টাকায় বাঘ-সিংহেরহররোজ মাংসের জোগান৷ সমস্যার সুরাহায়তাই লখনউ-মহিশূর-রাঁচিকে মডেল করেছে আলিপুরচিড়িয়াখানা।ওইসব শহরের চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের মতো খরচের ভার লাঘব করতে আলিপুর চিড়িয়াখানাও ২০১৩ সালথেকে পশুপাখিদের দত্তক দেওয়া শুরু করেছে৷ কিন্তু শুরুতে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষযে দর হেঁকেছিল,তিন বছর পরেই সেই দর একলাফে কমিয়ে দিতে বাধ্য হল তারা৷ আগ্রহের অভাবই কীএর কারণ?

২০১৩ সালে দত্তক নেওয়ার ভালোই সাড়া মিলেছিল৷ কিন্তু মাঝে কিছুদিন পশুপাখির দত্তক দেওয়া বন্ধ রাখে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ৷ ফের দত্তক দেওয়া শুরু হয় ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষ থেকে৷ ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষ মিলিয়ে মোট দুবছরে মোট ১৫টি পোষ্য দত্তক দিয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ৷ বিভিন্ন পশুপাখিকে দত্তক নিয়েছে কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিবিশেষ৷ এরমধ্যে বাঘ, জিরাফ, শিম্পাঞ্জি, ম্যাকাও পাখি– সবই রয়েছে৷ দত্তকের বিনিময়ে ‘পালকে’রা নিখরচায় চিড়িয়াখানায় ঢুকতে পারবেন৷ প্রবেশপত্রে চারজন ওই সুবিধা পাবেন। সংশ্লিষ্ট পশুপাখির খাঁচার সামনে তাঁরা নিজেদের বোর্ড ঝোলাতে পারবেন। প্রাণীটির ছবি তোলার সব স্বত্ব থাকবে পালকেরই।

একটা হাতি বা একটা বাঘকে পোষ্য নিতে হলে কত টাকা দিতে হবে?২০১৩ সালের শুরুতেই আলিপুর চিড়িয়াখানাকর্তৃপক্ষ হাতি-বাঘ-সিংহ,জিরাফ, শিম্পাঞ্জির জন্য মাথাপিছু দর হেঁকেছিল দেড় লক্ষ টাকা। তাদেরব্যাখ্যা, এদের খোরাকির খরচ বেশি। যত্নআত্তিরও বেশি দরকার। তাই এই দর। যদিও, সেইসময়ই চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের একটি অংশের বক্তব্য ছিল, বাস্তব খরচ ও এই দামের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্য নেই। তাদের মতে, কর্তৃপক্ষের দেওয়া দত্তকের দর প্রকৃত খরচের এক-তৃতীয়াংশ মাত্র।
চিড়িয়াখানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধিকর্তা বিনোদকুমার যাদব বলেছিলেন, ‘‘আমরা এটা চালু করছি পরীক্ষামূলকভাবে। প্রথমেই পাঁচ লাখ চাইলে অনেকে পিছিয়ে যেতে পারেন। তাই রয়ে-সয়ে এগচ্ছি।’’তিনি ভেবেছিলেন, আগ্রহী সংস্থাগুলি কাজে নেমে বুঝতে পারবেআসল খরচ কত। তখন তারা নিজেরাই অনুদান বাড়িয়ে দেবে। তিনি এ-ও বলেন, ‘‘এ বছর ভালো সাড়া পেলে পরের বছর দর একটু বাড়াব।’’

কিন্তু আলিপুর চিড়িয়াখানার রেকর্ড বলছে, ২০১৩ সালে কর্তৃপক্ষ যে দর হেঁকেছিল এবছর সেখান থেকে পিছু হটছে তারা৷ যাদের খোরাকির জন্য বাৎসরিক দেড় লক্ষ টাকা ধার্য করা হয়েছিল এবার সেই জিরাফ ও শিম্পাঞ্জিদের দত্তক দর এক ধাক্কায় অনেকটা কমে গেল৷ ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে একটি বেসরকারি সংস্থার ডিরেক্টর সুদীপ গঙ্গোপাধ্যায়কে ৮ জুলাই, ১০১৬ থেকে ৭ জুলাই, ২০১৭ পর্যন্ত ১ লক্ষ টাকায় একটি পুরুষ জিরাফ দত্তক দিয়েছে কর্তৃপক্ষ৷ দক্ষিণ কলকাতার সুচিত্রা ঘোষ নামে এক বিত্তবান মহিলাকে ২০১৬ তেসরা আগস্ট থেকে এ বছরের দোসরা আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ৪০ হাজার টাকায় একটি শিম্পাঞ্জি দত্তক দিয়েছে আলিপুর৷
প্রশ্ন উঠছে, দিন দিন যেখানে দ্রব্যমূল্য বাড়ে সেখানে হঠাৎ করে দাম কমিয়ে দেওয়ার কারণ কি?তাহলে কি দত্তক নেওয়ার চাহিদা কম বলেই দর কমাতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ?বর্তমান অধিকর্তা আশিসকুমার সামন্ত অবশ্য আগ্রহ কমছে এ কথা মানতে নারাজ ৷ উলটে তাঁর দাবি, আগ্রহ বাড়ছে৷ তিনি বলেন, আমাদের প্রতিবছর দত্তকদর ধার্য করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি রয়েছে৷ তাঁরাই দাম ঠিক করে৷ টাকার অঙ্কটা আমাদের কাছে বড় কথা নয়৷ পশুপ্রেমীদের দত্তক নেওয়ার উৎসাহ দিতে চাই আমরা৷
বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মন বলেন, ওয়েস্ট বেঙ্গল জু অথরিটি এই মূল্য ধার্য করে৷জিরাফ ও শিম্পাঞ্জির দাম কমলেও বাঘ, সিংহ, হাতির খোরাকির দাম ৫০ হাজার টাকা বেড়েছে৷চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের অনেকেই জানাচ্ছেন, জিরাফ ও শিম্পাঞ্জিকে দত্তক নিতে সেভাবে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছিলনা৷তাই বাধ্য হয়ে দাম কমাতে হয়েছে অথরিটিকে৷

২০১৩ সালে দত্তক দেওয়া যখন শুরু হয় তখন একটি জাগুয়ার দত্তক নিয়েছিলেন জগমোহন ডালমিয়ার মেয়ে বৈশালী ডালমিয়া৷ পরে অবশ্য আর সেই দত্তকের পুনর্নবীকরণ করাননি তিনি৷ বৈশালীর কথায়, মাঝখানে তো চিরিয়াখানা কর্তৃপক্ষ বন্ধ রেখেছিল দত্তক দেওয়া৷ শুনেছি ওরা নতুন করে আবার দত্তক দেওয়া চালু করেছে৷ বৈশালী ডালমিয়ার মতে, এ নিয়ে একটু প্রচারের দরকার৷ চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ যদি সেটা করেন তাহলে ভালো হয়৷
অতঃপর আলিপুরের নিরীহ অবলাদের কী অবস্থা হয় সেটাই দেখার৷ নিন্দুকেরা বলছে, দত্তকের ঠেলায় এর পর এতকালের ঐতিহ্য চিড়িয়াখানা কার্যত ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ হয়ে দাঁড়াবে না তো?