প্রতীতি ঘোষ, বারাকপুর : নিমতায় ম্যানেজমেন্ট পড়ুয়া দেবাঞ্জন হত্যাকাণ্ডের দশ দিন পর অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়ল মূল অভিযুক্ত প্রিন্স ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিশাল মারু। বিশাল মারুকে শুক্রবার রাতেই গ্রেফতার করেছিল পুলিশ, শনিবার সন্ধ্যায় গোপন সূত্রে খবর পেয়ে মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে পুলিশ অভিযুক্ত প্রিন্সকে বজবজে তার আত্মীয়র বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে ।

প্রসঙ্গত, গতকাল রাতে টাওয়ার লোকেট করে বজবজে এক বান্ধবীর বাড়িতে প্রিন্সের সন্ধানে যায় নিমতা থানার পুলিস। যদিও সেখানে তাঁর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওই বান্ধবী ও তার মাকে জিজ্ঞাসাবাদ এর জন্য থানায় আনা হয়। এরপরে শনিবার এই হত্যাকাণ্ডে সাফল্য পেল পুলিশ। অন্যদিকে, শুক্রবার রাতে প্রথমে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় মূল অভিযুক্ত প্রিন্স সিংয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিশাল মারুকে। জিজ্ঞাসাবাদে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ায় রাতেই তাকে গ্রেফতার করে নিমতা থানার পুলিশ। শনিবার ধৃতকে বারাকপুর আদালতে তোলা হলে বিচারপতি এগারো দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয়।

পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত বিশাল মারু এই ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত এবং পরোক্ষ ভাবে এই খুনের ঘটনায় জড়িত সে। সূত্রের আরও খবর, দেবাঞ্জনের বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায় বিশাল মারুর নাম। বিশালের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে পুলিশ জানতে পারে, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পর অপরাধ জগতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তার। কিছু অপরাধীর সঙ্গে ওঠাবসাও ছিল । দেবাঞ্জন খুনের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যদিও তার নামে সরাসরি এর আগে কোনও অপরাধের অভিযোগ নেই। তবে, এই ঘটনায় তার নামেও অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। তদন্তকারীরা আরও জানতে পেরেছেন, খুনের পরে প্রিন্সের সঙ্গে একাধিকবার কথা হয়েছে বিশালের। এমনকী, গা ঢাকা দেওয়ার আগে, বিশালের বাড়িতেই একদিন ছিল প্রিন্স। এরপরই দেবাঞ্জন খুনে বিশাল মারুর জড়িত থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত হয় পুলিশ। তারপরেই শুক্রবার গভীর রাতে দমদম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

এদিকে, নবমীর রাতে সল্টলেক সেক্টর ফাইভে যে পাবে দেবাঞ্জন তার বান্ধবীকে নিয়ে গিয়েছিল সেখানার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তদন্তকারি আধিকারিকেরা দেবাঞ্জনের পাঁচজন বন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এদিন নিমতা থানায় ডেকে পাঠায়। সেখানেই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব চলে। সূত্রের খবর, নবমীর মাঝ রাতে ওই ঘটনা ঘটার আগে সল্টলেকের একটি পানশালার পার্টিতে দেবাঞ্জনের বন্ধু এবং তাঁর পরিচিতদের ভূমিকায় খুনের রহস্য লুকিয়ে রয়েছে বলে অনুমান নিমতা থানা ও বারাকপুর কমিশনারেটের আধিকারিকদের। তাই নিহতের বন্ধুদের ডেকে পাঠানো হয়েছে ওইদিন রাতে কি হয়েছিল জানার জন্য।

সূত্রের খবর, নবমীতে রাত সাড়ে ১০টা থেকে ওই পানশালায় পার্টি শুরু হয়। দেবাঞ্জনের পরিচিত ১৭ জন ছিল সেখানে। পার্টিতে ছিল তাঁর বান্ধবীও। সেখানে আগে থেকেই হাজির ছিল শনিবার নিমতা কাণ্ডে ধৃত বিশাল মারু। পার্টি শেষ হয় রাত ১টা নাগাদ। সেখান থেকে বেরোতে আরও ২০-২৫ মিনিট লেগে যায় দেবাঞ্জনের। সূত্রের আরও খবর, ওই দিন পার্টি চালাকালীন দেবাঞ্জন কি কারও সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন? নাকি তাঁর পরিবারের দাবি অনুযায়ী তৃষা সরকারের প্রাক্তন প্রেমিক প্রিন্স সিংই কাউকে দিয়ে দেবাঞ্জনকে খুন করিয়েছে? এ সব বিষয় খতিয়ে দেখার জন্য এক দিকে যেমন ওই পানশালার ভিডিয়ো ফুটেজ দেখা হচ্ছে, তেমনই ওই দিন যে বন্ধুরা সেখানে হাজির ছিলেন তাঁদের সঙ্গেও কথা বলছে পুলিশ।

এদিন দেবাঞ্জনের বন্ধুরা সংবাদমাধ্যমকে জানায়, ওইদিন তারা মোট ১৭জন মিলে পাবে গিয়েছিলেন পার্টি করতে। তারমধ্যে ৪ জন মেয়ে বন্ধু ছিল বাকি সবাই ছেলে বন্ধুই ছিল। রাত দেড়টা নাগাদ তারা সবাই পাব ছেড়ে বেরিয়ে আসে। দেবাঞ্জন তার বান্ধবীকে নিয়ে গাড়ি উঠে চলে যায়। এরপর তারাও যে যার মত বাড়ি ফেরে। তাদের আরও দাবি, দেবাঞ্জন তাদের জানিয়েছিল প্রিন্সের হুমকি দেওয়ার বিষয়টি। তবে তারা প্রিন্সকে চিনত না। আর ধৃত বিশাল তাদের মধ্যেই কয়েকজনের স্কুলের সিনিয়র ছিল। বর্তমানে তারা সকলেই ম্যানেজমেন্টের দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া। তবে ওইদিন সেক্টর ফাইভের ওই পাবে ধৃত বিশালও অন্য একটি দলের সঙ্গে উপস্থিত ছিল। এদিন দেবাঞ্জনের বন্ধুরা আরও জানায়, ওইদিন দেবাঞ্জন কোন মদ্যপান করেনি। এমনকি দেবাঞ্জনের সঙ্গে তার বান্ধবীর পরিচয় সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বলেই তারা জানে।

তবে সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, এদিন পাঁচজনের হাজির হওয়ার কথা থাকলেও চার জন উপস্থিত হয়। বিশাল নামে দেবাঞ্জনের একজন বন্ধু উপস্থিত হয়নি। বিশালের এই অনুপস্থিতি নিয়ে এখন ধন্দে পুলিশ। তবে তদন্তে এখন আর কোন খামতি দিতে নারাজ নিমতা থানা ও বারাকপুর কমিশনারেট। এরজন্য এদিন ফের একবার ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত হয়। এদিন ফরেন্সিকের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নুমনা সংগ্রহ করার পাশাপাশি নিহতের গাড়িটিও পরীক্ষা করে। পুলিশ ও

ফরেন্সিক বিভাগ সূত্রে খবর, ম্যানেজমেন্টের পড়ুয়া দেবাঞ্জন দাসকে লক্ষ্য করে দু’টি গুলি করা হয়েছিল। তার পরেও তিনি গাড়ি নিয়ে প্রায় ১০০ মিটার গিয়েছিলেন। গুলি শরীরে লাগার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন দেবাঞ্জন। গতি কম থাকায় এয়ার ব্যাগ খোলেনি। তবে কোন যান্ত্রিক ত্রুটি আছে কিনা তার পরীক্ষা হবে। দুর্ঘটনার সময় গাড়ির গতি জানার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। গাড়ির ইভেন্ট ডেটা রেকর্ডারের খোঁজ করা হচ্ছে। কেন না গাড়ির সামনের অংশ ছাড়াও রাস্তার পাশের একটি ল্যাম্পপোস্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেঙে যায় পাঁচিলের একাংশও। ফরেন্সিকের এই প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে তদন্তকারীদের অনুমান ওই সময় পর্যন্ত আততায়ী ঘটনাস্থলের আশপাশেই ছিল বলে অনুমান। এরপরে পুলিশ চলে আসায় তারা গা ঢাকা দেয়।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার গাড়ি থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল। রক্ত শুধুই দেবাঞ্জনের কিনা তার পরীক্ষা হবে। গাড়িতে ধস্তাধস্তি হয় কিনা জানার চেষ্টা চালাচ্ছে তদন্তকারী অফিসাররা। তবে খুনের ঘটনায় প্রিন্সই দায়ী, নাকি অন্য কারও সঙ্গে যড়যন্ত্র করে দেবাঞ্জনকে খুন করা হয়েছে? বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কেনই বা দেবাঞ্জনকে খুন করা হল? কে বা কারা এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে রয়েছে— তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশায় রয়েছে। তবে শনিবার সন্ধ্যায় শেষ পাওয়া খবর অনুসারে নিমতা থানার তদন্তকারী পুলিশ অফিসাররা বজবজের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিনা সিনেমা হলের কাছে তার মাসীর বাড়ি থেকে গ্রেফতার হয়েছে।

পুলিশ সূত্রের খবর, রাতভর তার জিজ্ঞাসাবাদ চলবে, আগামীকাল তাকে বারাকপুর কোর্টে তোলা হবে। পুলিশ তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জেরা করবে। অপর অভিযুক্ত বিশাল মারুর সঙ্গে মুখোমুখি বসিয়ে প্রিন্সকে জেরা করা হবে বলে জানা গিয়েছে।