আর্মান্দো কোলাসো ৷

শনিবার বাঙালির চিরআবেগের ম্যাচ ৷প্রথমবার কলকাতায় নেমেই ডার্বি জিতে নিয়েছিলেন তিনি ৷ দ্বিতীয় ডার্বিতে তিনি তো ছিলেনই না ৷ দেখতে দেখতে আরও একটা ডার্বি এসে গিয়েছে ৷ ইস্টবেঙ্গলের কোচ আর্মান্দো কোলাসো রিল্যাক্সড ৷ হাসছেন, সবার সঙ্গে মিশছেন ৷ উপর উপর দেখে মনেই হবে না তিনি চাপ অনুভব করছেন ৷ ডার্বির পরিকল্পনা করতে শুরু করে দিয়েছেন ৷ কলকাতার নতুন অতিথি কোলাসো বৃহস্পতিবার সকালে অনেক কথাই শোনালেন কৃশানু মজুমদারকে…..

আপনার নামের অর্থ কী ?
কোলাসো : আমার নাম আর্মান্দো কোলাসো ৷ আর্মান্দো শব্দের অর্থ হল হ্যাপিনেস ৷ আর্মান্দো সব সময়তেই খুশি ৷

তার মানে আপনি সবাইকে খুশি রাখতে চান, খুশি রাখার কৌশল জানেন ৷ 
কোলাসো : একদমই তাই ৷ আমি যেখানেই যাই, সেখানেই মানুষের সঙ্গে দ্রুত মিশে যাই ৷ হাসিঠাট্টা করি ৷ ঈশ্বর মানুষকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন ৷ কে কতদিন আছেন কেউ জানেন না ৷ তাই হাসখুশি থাক জীবনে ৷ জীবনকে উপভোগ কর ৷ ঈশ্বরের প্রার্থনায় ডুবে যাও ৷

এটাই আপনার দর্শন ৷ ফুটবল-দর্শন কী ?
কোলাসো : ফুটবল আমার জীবন ৷ শুনুন, আমি যখন ডেম্পোয় খেলতে যাই, তখন সিনিয়র ফুটবলাররা বলতেন, বল নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে খেল ৷ পরে বুঝতে পেরেছিলাম, বল নিজেদের কাছে রেখে খেললে, যা খুশি করা যায় ৷ ডেম্পোয় আমরা এভাবেই খেলতাম ৷ পরে ডেম্পোর কোচ হয়ে সেই পদ্ধতিতেই দলকে খেলাই ৷

নিজেকে কীভাবে দেখেন ? শুধুমাত্র একজন কোচ যিনি পাঁচবারের ভারতসেরা নাকি ফুটবলের প্রচারক ?
কোলাসো: আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ ৷ ভাল মানুষ ৷ ভাল কোচ না হতে পারি, মানুষ হিসেবে আমি খুবই ভাল ৷ নরম, সংবেদনশীল একটা হৃদয় রয়েছে ৷ তা দেওয়ার জন্য ঈশ্বরকে অনেক ধন্যবাদ ৷ যেখানেই যাই, সবাই আমাকে ভালবেসে ফেলেন ৷ ইস্টবেঙ্গলে এসেছি ৷ এখানেও সবাই আমাকে পছন্দ করেন ৷ গ্রাউন্ড স্টাফ থেকে খেলোয়াড়-সবাই ৷ আমার হৃদয় সোনায় মোড়ানো ৷এটাই আর্মানের জাদু ৷

আপনি তো ঈশ্বরে বিশ্বাসী ৷ যদি ঈশ্বরের কাছে তিনটি বর চান, তা হলে কী চাইবেন ?
কোলাসো : ঈশ্বরে আমার গভীর বিশ্বাস ৷ আমি ঈশ্বরের কাছে রোজ প্রার্থনা করি ৷ আজ যে জায়গায় পৌঁছেছি, তার পিছনে রয়েছেন ঈশ্বর ৷ খারাপ সময়ে ঈশ্বরকে স্মরণ করতাম ৷ তাঁর আশীর্বাদেই খারাপ সময় কাটিয়ে উঠেছি ৷ যদি তিনটি বর আমাকে চাইতে বলা হয়, তা হলে বলব, পৃথিবীতে যেন শান্তি ফিরে আসে ৷ আমার পরিবার যেন ভাল থাকে ৷ পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাই, সবাইকে যেন খুশি করতে পারি ৷ যে ক্লাবে কোচিং করাই, সেই ক্লাবকে যেন ট্রফি দিতে পারি ৷ ঈশ্বরের কাছে এটাই আমার চাওয়া ৷

কলকাতা কেমন লাগছে ?
কোলাসো : কলকাতায় সদ্য এসেছি ৷ মাত্র তিন মাস হয়েছে এখানে এসেছি ৷ বলতে পারেন আমি শিখছি ৷ গোয়ার ফুটবল সংস্কৃতি আর কলকাতার সংস্কৃতির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান ৷ এখানে যেদিন প্রথম পা রাখলাম, সেদিন থেকেই শুনে আসছি ডার্বি জিততে হবে ৷ আমি শুরুতে ডার্বিকে মোটেও গুরুত্ব দিইনি ৷ যদিও প্রথম ডার্বি জিতেছিলাম ৷ এখানে এসে এটাও বুঝতে পেরেছি, কলকাতার মানুষ, সমর্থকরা প্রতিটি ম্যাচ জিততে চান ৷ এখানকার সমর্থকরা খুব অল্পেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন ৷ এখানে সমর্থকদের চাপ রয়েছে ৷ মিডিয়ার চাপ রয়েছে ৷ আমি দেখছি ৷ শিখছি ৷ এক লহমায় এখানকার ফুটবল সংস্কৃতি বদলাতে পারব না ৷ একটু সময় লাগবে আমার ৷

তা হলে বলছেন ডার্বি ডার্বি করে চেঁচালে চলবে না ?
কোলাসো : শুধু ডার্বি কেন ? অন্য ম্যাচগুলোও তো রয়েছে ৷ সেই ম্যাচগুলোও তো কম গুরুত্বপূর্ণ নয় ! একটা কথাই আমি সবাইকে বলি, মনের আনন্দে খেল ৷ ফুটবল খেলে নিজে খুশি হও ৷ নিজে খুশি থাকলেই দেখবে অন্যকেও খুশি রাখতে পারবে ৷ উপভোগ করার জন্য ফুটবল খেলতে হবে ৷ প্রাণের আনন্দে খেল ৷ ডার্বির গুরুত্ব আমি জানি ৷ কেউ কারোর কাছে হারতে চায় না ৷এমনই এই ম্যাচের জাদু ৷

কোন মডেল ফলো করেন ?
কোলাসো : শুধু আক্রমণ বা শুধু রক্ষণ বলে কিছু হয় না ৷ ফ্লেক্সিবিলিটি আনতে হবে খেলায় ৷ প্রয়োজন অনুযায়ী খেলার ধরন বদলাতে হবে ৷ আমি একটা কথাই বলি, পারফর্ম করে যাও ৷
আপনি কি সংস্কারাচ্ছন্ন ?
কোলাসো : একদমই না ৷ আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী ৷ খেলার সময় যখনই সমস্যায় পড়ি, তখনই ঈশ্বরকে স্মরণ করি ৷ এই পযর্ন্তই ৷ সংস্কারাচ্ছন্ন আমি নই ৷
প্রতিটি ম্যাচের আগে নিজেকে কীভাবে তৈরি করেন ?
কোলাসো : প্র্যাকটিস তো রয়েইছে ৷ তা ছাড়া আমি একদমই টেনশনে ভুগি  না ৷ টেনশনে পড়ে গেলে খেলোয়াড়রাই বলতে শুরু করে দেবে, ওই দ্যাখো কোচ টেনশনে পড়ে গিয়েছেন ৷ সুতরাং, আমি রিল্যাক্সড থাকার চেষ্টা করি ৷ আমার মাথায় অন্য জিনিস ঘুরপাক খায় ৷ গোলকিপার হিসেবে কাকে খেলানো যায় ? মাঠে যদি কেউ লাল কার্ড দেখে, তা হলে কাকে নামাব ? কী ভাবে ছক বদলাব ? শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করি না ৷
এখানে বিদেশি খেলোয়াড়দের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় ?
কোলাসো : এটাই আমাদের সংস্কৃতি হয়ে গিয়েছে ৷ আমি বিদেশি খেলোয়াড়ের বিরোধী নই ৷ যদি বিদেশি খেলোয়াড় আনতেই হয়, তা হলে এখানকার স্থানীয় খেলোয়াড়দের থেকে ভালমানের আনতে হবে ৷ না হলে, শুধু শুধু বিদেশি খেলোয়াড় এনে লাভ কী ?
ছেলেরা যদি ভাল খেলতে না পারে তা হলে কোচ কী করবেন ?
কোলাসো : এটাই তো কথা ৷ আমি তো মাঠে নামার আগে ছেলেদের বলি, মাঠে কিন্তু তোমরাই কোচ ৷ আমি একরকম পরিকল্পনা করে পাঠাই ৷ মাঠে প্রতিপক্ষের জাল ভেদ করে বেরিয়ে আসতে হবে ফুটবলারকেই ৷ তাই ছেলেদের বলি, তোমরাই কোচ ৷