প্রতীতি ঘোষ, বারাকপুর: পুলিশ দুষ্কৃতীদের খণ্ডযুদ্ধে গুলি, বোমা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা। আর এই ঘটনার মধ্যে পড়ে নিরীহ ২ যুবকের মৃত্যুতে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে উত্তর ২৪ পরগনার ভাটপাড়া থানার অন্তর্গত কাঁকিনাড়া বাজার এলাকা। বৃহস্পতিবার সকালে ভাটপাড়ায় নতুন থানা উদ্বোধনের মুহুর্তে পুলিশ ও দুষ্কৃতীদের খন্ডযুদ্ধ শুরু হয়। পুলিশের দাবি, বৃহস্পতিবার উদ্বোধন হওয়ার আগেই ভাটপাড়া নতুন থানা লক্ষ্য করে বোমাবাজি ও ইঁট বৃষ্টি শুরু করে বহিরাগত দুষ্কৃতীরা । পাল্টা প্রতিরোধে নামে পুলিশও।

শুরু হয় দুপক্ষের মধ্যে গুলি বোমার লড়াই। নতুন ভাটপাড়া থানার উদ্বোধন করতে আসার পথে এলাকার উত্তপ্ত পরিস্থিতির খবর পেয়ে মাঝ রাস্তা থেকে ফিরে যেতে বাধ্য হন রাজ্য পুলিশের ডিজি বীরেন্দ্র। অবস্থা এতটাই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে যে স্থগিত করে দেওয়া হয় ভাটপাড়া থানার উদ্বোধন।

ঘটনার পর রাতেই দিল্লী থেকে ব্যারাকপুরের সাংসদ অর্জুন সিং বলেন, “পুলিশ পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে নিরীহ মানুষদের খুন করেছে । আমরা এই ঘটনার প্রতিবাদে বৃহত্তর আকারে থানা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করব। নন্দীগ্রামের ধাঁচে আন্দোলন শুরু হবে । এই পুলিশি জুলুম চলবে না ।”

এদিকে এই ঘটনায় উত্তর ২৪ পরগনা জেলা তৃণমূল সভাপতি তথা রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, “আজকের ঘটনার সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের কোন সম্পর্ক নেই। আমাদের একটাও লোক ভাটপাড়ায় নেই। পুলিশ পুলিশের কাজ করছে এলাকা শান্ত করতে । তবে পুলিশের গুলিতে কেউ মারা যায়নি । ওরা নিজেরাই বন্দুক বোমা নিয়ে পুলিশের উপর হামলা করেছে । ওখানে আমাদের কর্মীরা মারা গেলেও বলছে বিজেপি মারা গেছে। পুলিশ এলাকায় শান্তি ফেরাতে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে ।”

অন্যদিকে, পরিস্থিতি শান্ত করতে ততক্ষনে পুলিশ ও দুষ্কৃতীদের সংঘর্ষ রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। এই সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ দেন কাঁকিনাড়া বাজার এলাকার ফুচকা বিক্রেতা রামবাবু সাউ (১৭)। অভিযোগ ওঠে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু রামবাবুর। এই ঘটনার জেরে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কাঁকিনাড়া বাজার এলাকার ৫ নম্বর গলি। শুরু হয় পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমাবাজি। এরই মধ্যে শূন্যে পাল্টা গুলি ছুঁড়তে শুরু করে পুলিশ। রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। এরই মধ্যে গুলি ও বোমার আঘাতে কাঁকিনাড়া বাজার এলাকায় ৭ জন জখম হয়।

তাদের কারুর পেটে, কারুর কাঁধে আবার কারুর পিঠে গুলি লাগে। ওই সাত জনকে স্থানীয়রা ও পুলিশ দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে ভাটপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে সেখানে তাদের প্রত্যেকের অবস্থার অবনতি হওয়ায় নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতা বাইপাসের ধারে এক বেসরকারি হাসপাতালে । সেখানে গুলিবিদ্ধ ধরমবীর সাউয়ের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় পাল্টা বোমা ও ইঁটের আঘাতে জখম হন মোট ৬ জন পুলিশ কর্মী । তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে।

এই ঘটনা সম্পর্কে ভাটপাড়া পুরসভার বিজেপির পুরপ্রধান সৌরভ সিং বলেন, “ব্যারাকপুরের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার অজয় ঠাকুরের নির্দেশে সাধারন নিরীহ মানুষের উপর গুলি চালানো হয়েছে। রামবাবু সাউ নামে যে ব্যাক্তি মারা গেছেন সে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। ডেপুটি পুলিশ কমিশনার অজয় ঠাকুর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের নির্দেশে এই গুলি চালিয়েছে । ওর বদলি না হলে এখানে অশান্তি আরো বাড়বে । এতদিন পুলিশ বিজেপি কর্মীদের উপর আক্রমন করছিল, এখন সাধারন মানুষকে মেরে ফেলছে ।”

বৃহস্পতিবার এই সংঘর্ষের ঘটনায় এলাকা অঘোষিত বনধের চেহারা নেয়। এমনকি বন্ধ করে দেওয়া হয় ভাটপাড়া পুরসভার এলাকা সংলগ্ন ঘোষপাড়া রোড। জগদ্দল ও ভাটপাড়া থানা এলাকা জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এলাকায় শুরু হয় নাকা চেকিং । এদিকে ভাটপাড়া থানার কার্যকারিতা নবান্নের নির্দেশে বৃহস্পতিবার থেকেই চালু করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশ ৫ নম্বর গলিতে ফের দুষ্কৃতীদের গ্রেপ্তার করতে গেলে এলাকাবাসীর বাঁধার মুখে পড়তে হয় তাদের । এমনকি পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর করা হয়। এরপরই পুলিশ এলাকায় ঢুকে নিরীহ মানুষদের উপর আক্রমন করছে এই অভিযোগে এদিন বিকেলে ভাটপাড়া থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখায় স্থানীয় মহিলারা ।

বিকেলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে ভাটপাড়া থানায় পৌঁছান রাজ্য পুলিশের ডিজি বীরেন্দ্র । সেখানে ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ও সি আই ডি দলের সদস্যেদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন । তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “কিভাবে ওদের মৃত্যু হল তার তদন্ত হবে । আমাদের ৬ জন পুলিশকর্মী জখম হয়েছে দুষ্কৃতীদের হামলায়। পুলিশ কাউকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়নি । পুলিশ শূন্যে গুলি চালিয়েছে।” ভাটপাড়ার হিংসার ঘটনায় শুক্রবারই নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে আসবেন কেন্দ্রীয় বিজেপির এক প্রতিনিধিদল । তারা এলাকা পরিদর্শন করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে রিপোর্ট জমা দেবে বলে জানা গিয়েছে।