‘রাজনীতির মধ্যে ধর্ম মিশলে সর্বনাশ’

অরিন্দম শীল(পরিচালক)
আমরা এই মুহূর্তে অদ্ভুদ একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি৷ চলচ্চিত্র, শিল্প সবক্ষেত্রেই নতুন নতুন ভাবনা আসছে৷নতুন নতুন কাজ হচ্ছে হিন্দি চলচ্চিত্র থেকে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে৷গানের ক্ষেত্রেও অনেক নতুন কাজ হচ্ছে৷ কিন্তু তারপরও কোথাও যেন মনে হচ্ছে আমরা মিডিওক্রিটিতে আটকে গেছি৷ মিডিওক্রিটিটার বাইরে বেরতে পারছি না৷

আজকে যদি বিশ্ব মানচিত্রে চলচ্চিত্রের কথা বলি তাহলে যখন রেভেন্যান্টের মতো ছবি হয়, ইনা রিতুর মতো পরিচালকরা কাজ করছেন, যখন মাজিদ মাজিদি, জাফার পানাহির মতো মানুষ বাড়ির মধ্যে থেকেও বিশ্ব চলচ্চিত্র নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, পড়াশোনা করছেন, দেশ ছেড়ে না গিয়েনিজের শহরে থেকে নিজের মতো করে প্রতিবাদ করবে, সিনেমা করবে এইসমস্ত কিছু করার কথা হচ্ছে সেখানে আমার মনে হয় চলচ্চিত্রের জায়গায় সঠিক রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের একটা বিশাল অভাব আমাদের দেশে দেখা গিয়েছে৷ এটা দীর্ঘদিন হয়ে চলেছে৷এটা বাহবা দেওয়ার মতো ঘটনা নয়৷ আমরা সবাই যে যার মতো করে চলচ্চিত্র বানাচ্ছি৷ বেটার চলচ্চিত্র করছি৷ টেকনিক্যালি অ্যাডভান্সড হচ্ছি৷ কিন্তু কোথাও যেন মূল একটা সত্যিকে এড়িয়ে যাচ্ছি৷ তার জন্য অ্যাবসোলিউটলি আমাদের দেশের রাজনৈতিক কারণটাই মূল কারণ৷

যেদেশের রাজনীতির মধ্যে ধর্ম মিশে যায় সেই দেশ সর্বনাশের দিকে ছাড়া আর কোথাও যেতে পারে না৷ সেটার একমাত্র কারণ কিন্তু বিজেপি নয়৷ এর অনেকগুলি কারণ আছে৷ এর অন্যতম হল প্রত্যেকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী যারা দিনের পর দিন তাদের ভোটব্যাঙ্কের জন্য ধর্মের কুসংস্কারের আগুনে হাওয়া দিয়ে আসছে৷ সেকারণে কখন যে আমরা এক একটা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করব তা আমরা নিজেরাও জানি না৷

- Advertisement -

একথা ঠিক যে ভারতবর্ষে এই মুহূর্তে প্রধান শক্তি যাঁরা দেশ চালাচ্ছেন তাদের পেছন থেকে পরিচালনা করছে এমন একটা দল, এমন একটা গোষ্ঠী যাঁরা সম্পূর্ণভাবে উঠে এসেছে ধর্মীয় কারণ থেকে৷ এবং এই রকম কোনও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বহিঃপ্রকাশ বা তার উন্নতি যে কোনও সমাজ জীবনের পক্ষে সেটা অন্তরায় হয়ে ওঠে৷ বাস্তবে আমরা তা বারবার দেখতে পাচ্ছি৷

আজকে শুধু ভারতবর্ষের কথা বললে হবে না, এরকম শক্তি চাগাড় দিয়ে উঠছে সর্বত্র৷ কোথাও যেন আমার বারবার বলতে ইচ্ছা করছে আমরা যাদের পাচ্ছি এরজন্য আমরাই দায়ী৷ আমেরিকায় ট্রাম্প হতে পারে যে সংস্কৃতির ‘স’ বোঝে না৷ যে মেরিল স্ট্রিপের মতো মানুষকে বলে ‘শি ইজ ওভাররেটেড’৷ যেখানে সমস্ত হলিউড প্রায় উঠে দাঁড়িয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে৷ নিউইয়ার্কের মেয়র যেখানে বলছেন একটা নির্বাচন আমাদের নিউইয়র্কের ভাগ্য বদলে দিতে পারে না৷

দুদিন আগে অ্যাশলি জার্ড কলকাতায় এসেছিলেন৷ আমি তাঁর সঙ্গে ডিনার করতে গিয়েছিলাম৷ সেখানেও এই একই ভাবনা উঠে এসেছে৷ এরই মধ্যে ট্রাম্প একটা অদ্ভুদ ঘটনা ঘটিয়ে ফেললেন৷ সাতটি দেশকে ভিসা দেওয়ার উপর অনির্দিষ্ট কালের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন৷ সবথেকে মজায় ঘটনা হল আমেরিকার রক্ত প্রবাহের মধ্যে ইসলামিক রক্ত প্রবাহ মিশে আছে৷ আমেরিকার সংস্কৃতির মধ্যে ইসলামিক সংস্কৃতি মিশে আছে সেটাকে ওইভাবে বাদ দেওয়া যায় না৷

ভারতবর্ষ হিন্দুদের দেশ সেকথাটা বলা অমূলক৷ ভারতবর্ষ সেই দেশ যে দেশ সমস্ত ধর্মকে একসঙ্গে নিয়ে বেঁচে আছে৷ এই দেশ বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথের দেশ৷ সারা পৃথিবীর কাছে ভারতবর্ষ উদাহরণ৷ সেরকম দেশে কাদের দেখছি যাঁরা পদ্মাবতীর সেটে দিয়ে তাদের ঐতিহ্য পরম্পরা নিয়ে চিৎকার করে একটা ফ্লোরে গিয়ে তুলকালাম করছে৷ যেখানে এরকম সাম্প্রদায়িক শক্তিরা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে গিয়ে অত্যাচার করছে৷ অথচ কী অদ্ভুদ পদ্মাবতী কিন্তু ঐতিহাসিক চরিত্র নয়৷ একটা ফিকশনাল ক্যারেক্টার৷ এবং পদ্মাবতী অ্যাট অল এগজিস্ট করতেন কিনা সেটার কোনও প্রমাণ আমরা পাই না৷ অথচ এমনভাবে ইতিহাস লেখা হয়েছে সেটা ইতিহাসের অঙ্গ হয়ে গিয়েছে৷ ইতিহাস লেখাটার উপরেও কিন্তু একটা জাতির মেরুদণ্ড নির্ভর করে৷ আমাদের দেশে যে যখন শক্তিতে এসেছে তখন সে ইতিহাস রচনা করেছে তার মতো করে৷ মুসলিম, পাঠান প্রত্যেক জাতি তাদের নিজেদের মতো করে ইতিহাস রচনা করেছে৷ সেকারণে ভারতবর্ষের সমস্ত ইতিহাসই সত্যি ইতিহাস নয়৷ সেরকম একটা জায়গায় ভারতবর্ষের একটা নাড়ি আছে, একটা সংস্কৃতি আছে, একটা ধারা আছে, আর আছে একটা সময়ের উপর দিয়ে গড়ে ওঠা সভ্যতা৷ সেইটাকে অস্বীকার করা যায় না৷ কিন্তু আমরা দেখছি সেগুলো আমরা অস্বীকার করছি৷ আমরা ভোটব্যাঙ্কের জন্য সেগুলো অস্বীকার করছি৷ অস্বীকার করতে করতে আমরা এখন এমন জায়গা পৌঁছে গিয়েছি যে নিজের সামনে আয়না ধরতে ভয় পাচ্ছি বলে সেই চলচ্চিত্রটাও তৈরি করতে পারছি না যেটা কিনা একটা যথার্থ রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হতে পারে৷ যে চলচ্চিত্র সটান দাঁড়িয়ে মোদী থেকে শুরু করে চন্দ্রবাবু নাইডু, ইন্দিরা গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সব্বার সমালোচনা করতে পারে৷ আমরা যদি সঠিকভাবে গঠনমূলক সমালোচনা করার পদ্ধতি ভুলে যাই তাহলে ঘটতে পারে সেটাই এখন ঘটছে৷

আমরা তো মনে হয় শেষ রাজনৈতিক বাংলা ছবি ‘কলকাতা ৭১’৷ মৃণাল সেনের পর সেইভাবে কেউ রাজনৈতিক চলচ্চিত্র করতেই পারেনি৷ ভারতবর্ষের আঙিনায় অনুরাগ কাশ্যপ কিছুটা চেষ্টা করেছেন৷ ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’ করে৷ এছাড়াও আরও দু-একটা হয়েছে৷এছাড়া রাজনৈতিক ছবির কথা বলতে গেলে প্রকাশ মেহেরার ছবি কথাই উঠে আসবে৷ আমরা যখন দুর্নীতি, অনিয়মের কথা বলি এদেশে সবথেকে বেশি দুর্নীতি, অনিয়ম, অনৈতিকতা দেখা যায় রাজনীতিবিদদের মধ্যে৷ সেটা একদম কাউন্সিলর লেভেল থেকে৷ এদেশের রাজনীতিবিদদের দেখলে বোঝা যায় একজন রাজনীতিবিদ কতটা অর্থ উপার্জন করতে পারে৷ এতটা অর্থ উপার্জন বোধহয় আর অন্য কেউ করতে পারে না৷ এইজন্য ছাড়পত্রগুলো আমরা সমানে দিয়ে চলেছই এটা কিন্তু আমাদের বিশাল বড় ক্ষতি করছে৷ অচিরেই আমাদের নিজেদের মধ্যে খন্ডযুদ্ধ লাগবে৷ আমাদের সারা ভারতবর্ষে বিভিন্ন জায়গায় কিভাবে সন্ত্রাসবাদ ঢুকে গিয়েছে সেটাও কোনও কোনও ক্ষেত্রে সুযোগ পাচ্ছে লালিত-পালিত হওয়ার৷ এই সমস্তটা জুড়ে আমি কোথাও ভাল, সুন্দর সময় দেখতে পাচ্ছি না৷ একজন শিল্পী হিসাবে সবসময় আমাকে এটা কষ্ট দেয়৷ আমি সবসময় আমার মতো করে প্রতিবাদ করতে পারি না৷ আবার কখনও কখনও এটা মনে হয় যে প্রতিবাদ করার থেকে নিজের মতো করে গড়াটা প্রয়োজন৷ সেটাই গুরুত্বপূর্ণ৷ আমাদের যতদিন না নিজেদের আউটলুক বদলাব, নিজেদের শিক্ষা আরও এগিয়ে নিয়ে যাব, ধর্মীয় চেতনা, কুসংস্কারকে সরিয়ে যতক্ষণ না আমরা নিজেদের আধুনিক মানুষ হিসেবে এগোবো যতক্ষণ না এগোতে পারব ততক্ষণ আমরা সুন্দর সমাজ সৃষ্টি করতে পারব না৷ ততক্ষণ কিন্তু আমাদের উপর রাজত্ব করবে মোদীর মতো লোকেরা৷ যেটা খুবই দুঃখের বিষয় আমাদের কাছে৷

সময় এসে গিয়েছে৷ এখনই আমাদের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবতে হবে কোন স্রোতে আমরা গা ভাসাব অথবা স্রোতের বিপক্ষে গিয়ে স্বকীয়ভাবে একটা স্থাপত্য গড়ব৷ যে স্থাপত্যটা সময়কে, কালকে অনুপ্রেরণা জোগাবে৷ আমাদের আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা যোগাবে৷ এটা ভেবে দেখা দরকার৷

All rights reserved by @ Kolkata24x7 II প্রতিবেদনের কোন অংশ অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ