নিখিলেশ রায়চৌধুরী: গুজরাতের স্কুলপাঠ্যে যীশু খ্রিস্টের নামের আগে বিশেষণ হিসাবে ‘হাওয়ান’ শব্দটি ব্যবহৃত হওয়ায় ওই রাজ্য সহ গোটা দেশেই শিক্ষিত মানুষজন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছেন৷ গুজরাত স্টেট স্কুল টেক্সটবুক বোর্ড বা জিএসএসটিবি-র প্রকাশিত নবম শ্রেণির সেকেন্ড ল্যাঙ্গোয়েজ হিন্দি-র পাঠ্যপুস্তকে এই কাণ্ডটি ঘটেছে৷ বইয়ের ষোড়শ অধ্যায় ‘ভারতীয় সংস্কৃতি মেঁ গুরু-শিষ্য সম্বন্ধ’-এর এক জায়গায় লেখা হয়েছে— ‘ইস সম্বন্ধ মেঁ হাওয়ান ইশা কা এক কথাঁ সদা স্মরণীয় হ্যায়…’৷ হিন্দিতে ‘হাওয়ান’ মানে ‘ডেমন’ বা রাক্ষস-খোক্কস৷

গুজরাত রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ভূপেন্দ্রসিং চূড়াসামা এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন৷ বলেছেন, এটা ছাপার ভুল৷ শুধরে দেওয়া হবে৷ কিন্তু এমন ভুলটাই যদি ভারতের সনাতন ধর্মের মনু কিংবা আদি শঙ্করাচার্যের ক্ষেত্রে ঘটত, তাহলে মন্ত্রী মহোদয় সে ব্যাপারে কী বলতেন? যদিও ভারতের সনাতনপন্থী হিন্দুধর্মের সহিষ্ণুতাই তার সব চাইতে বড় শক্তি৷ স্বামী বিবেকানন্দই বলেছেন, প্রাচীন ভারতে নাস্তিকেরা মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে বিগ্রহ পূজার মুণ্ডপাত করতেন৷ তা বলে পুরোহিতরা সেই নাস্তিকদের তেড়ে মারতে যেতেন না৷ বৈদান্তিকেরাও বিগ্রহ পূজার কড়া সমালোচক ছিলেন৷ স্মৃতিশাস্ত্রে বিদেশিদের (অর্থাৎ, কুষাণ-শকদের) অনুকরণে বিগ্রহ পূজার নিন্দা করা হয়েছিল৷ তার জন্য বৈদান্তিকদের উপর চড়াও হওয়ার কথা কেউ কল্পনাও করত না৷ কিন্তু আজকের যুগ সনাতন ধর্মের যুগ নয়৷ অতএব, আজ যদি কেউ আরাধ্য দেবদেবীদের সম্পর্কে হিন্দুদের মনে আঘাত দিয়ে কোনও কুৎসিত বিশেষণ ব্যবহার করে, তাহলে কি সেটা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভালো লাগবে? না, তাঁদের মধ্যে যাঁরা ‘মহাতেজা’, তাঁরা তাদের ছেড়ে কথা বলবেন?

আসলে, সব ধর্মেই নানা রংয়ের ‘হাওয়ানে’র দেখা মেলে৷ ধর্মে ধর্মে লড়াই লাগিয়ে দিতে তারা ওস্তাদ৷ নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে না হতেই হঠাৎ রাজ্যে রাজ্যে চার্চে তাণ্ডবের ধুম পড়ে গিয়েছিল৷ যার জন্য জুলিও রেবেইরোর মতো খলিস্তানি জঙ্গিদমনের নায়ক আইপিএস-কেও দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়েছিল, এতকাল বাদে এসে নিজেকে এদেশের বাসিন্দা বলে আর তাঁর মনে হচ্ছে না৷ এই ধরনের ‘হাওয়ানে’রাই যে গুজরাত সহ বিভিন্ন রাজ্যের শিক্ষা জগতে পর্যন্ত ঢুকে যা ইচ্ছা তা-ই করছে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না৷

এর উদাহরণ আমরা আগেও দেখেছি৷ যেমন অন্তত বছর দশেক আগের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে৷ সেবার সিবিএসই-র মতো কোনও বোর্ডের পাঠ্যপুস্তকে ছাপা হয়েছিল— বঙ্গাল মে বহুত কঙ্গাল হ্যায়৷ আবার তারও আগে, পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের অনুমোদিত সপ্তম-অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইতেও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনার অংশ তুলে দেওয়ার অছিলায় নমুনা প্রশ্নের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার নজির দেখেছি৷ অতএব এর সঙ্গে রাজনৈতিক রংয়ের কোনও সম্পর্ক নেই৷ ধর্মের নামে ধর্মনাশকারী হাওয়ানেরা সর্বত্রই রয়েছে৷ আর, তারা আগেও ছিল৷ এখনও আছে৷ হয়তো তাদেরই কারও কলমের খোঁচায় গুজরাতের পাঠ্যপুস্তকে যীশু খ্রিস্ট হাওয়ানে পরিণত হয়েছেন৷

বহুকাল আগে কুম্ভমেলা নিয়ে লিখতে গিয়ে আচার্য যদুনাথ সরকার ভণ্ড ধার্মিকদের একেবারে দফারফা করে ছেড়েছিলেন৷ সেখানে যে সাধুসন্তদের ভিড় লেগে থাকে, তাদের বেশিরভাগই যে আসলে ঘোরতর অধার্মিক সে কথা তিনি নির্দ্বিধায় লিখে গিয়েছেন৷ এক জায়গায় তো তিনি সরাসরি লিখছেন : গীতা পড়া তো দূরস্থান, ইহারা গীতার নাম পর্যন্ত শোনে নাই!

আরও সাঙ্ঘাতিক সব কথা লিখে গিয়েছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী৷ এক সময় বাংলায় হিন্দু ও বৌদ্ধ তান্ত্রিক আচারের তাণ্ডব নৈতিকতার সব সীমা ছাড়িয়ে এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো নিষ্ঠাবান পণ্ডিত ব্রাহ্মণ এক জায়গায় লিখছেন— এই বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটিয়াছিল আশীর্বাদ রূপে৷

আর, কালীপ্রসন্ন সিংহ অর্থাৎ হুতোম প্যাঁচার কথা তো না বললেই নয়৷ হুতোম তাঁর নকশায় লিখেছেন, এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে কী রকম ‘গুরুপ্রসাদী’র চল ছিল৷ কোনও হিন্দু গেরস্তঘরে বিয়ের অনুষ্ঠান থাকলে উপাস্য ‘বাবাজি’রা সেখানে হাজির হতেন এবং নববিবাহিতাকে প্রথম উপভোগ করার (পড়ুন, ধর্ষণ করার) অধিকার পেতেন৷ এরই নাম ছিল ‘গুরুপ্রসাদী’৷ অবশেষে এক শিক্ষিত তরুণের লাঠির বাড়িতে এক ‘বাবাজি’র ভবলীলা সাঙ্গ হওয়ায় তবেই বাংলায় ‘গুরুপ্রসাদী’-র চল চিরতরে বন্ধ হল৷

এখন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-যদুনাথ সরকার-কালীপ্রসন্ন সিংহের মতো মনীষীদের হাতের কাছে না পাওয়া যাক, হিন্দু বক ধার্মিকদের নিয়ে তাঁরা যা লিখে গিয়েছেন, তাহলে তো ধর্মরক্ষায় তাঁদের যাবতীয় রচনাই পুড়িয়ে দিতে হয়! নাম মুছে দিতে হয় স্বামী বিবেকানন্দেরও৷ কারণ, তাঁরই তো বজ্রনিনাদ ছিল এ-ই : তোমরা, ভারতীয় উচ্চবর্ণেরা কি আদৌ বেঁচে আছ? তোমাদের দেখলে মনে হয় যেন দশ হাজার বছরের জীবন্ত মমি৷..আসল ‘চলমান শ্মশান’ হচ্চ তোমরা! তোমরা উচ্চবর্ণেরা৷ তোমাদের দেখছি বলে যে বোধ হচ্ছে, ওটা আসলে অজীর্ণতাজনিত দুঃস্বপ্ন৷

স্বামী বিবেকানন্দ মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন এইসব হাওয়ানের দল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শূন্যে বিলীন হোক৷ তোমাদের যাই বিলীন হওয়া, অমনি শুনতে পাবে কোটীজিমূতসান্দী ত্রৈলোক্যকম্পনকারী নবভারতের উদ্বোধনধ্বনি : ওয়াহে গুরু কী ফতে! দুঃখের বিষয়, তারা যে তা হয়নি, গুজরাতের স্কুলপাঠ্য থেকে আবারও তার প্রমাণ মিলল৷

 

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ