সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : অখণ্ড ভারত তখন স্বাধীনতা অর্জনের জন্য লড়াই করছে। এমন এক সময়ে উত্তর কলকাতার এক সরু গলিতে তৈরি হল এক গুপ্ত সমিতি, যা পরবর্তীকালে ভারতের ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অন্য মুখ হয়ে উঠেছিল। নাম অনুশীলন সমিতি, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯০২ সালে ২৪ মার্চ আজকের দিনেই।

বিপ্লবী আন্দোলনের প্রস্তুতির অঙ্গ হিসাবে অতীস চন্দ্র বসুর উদ্যোগে এবং ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্রের সভাপতিত্বে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে ২৪ মার্চ কলকাতার ১২ নম্বর মদন মিত্র লেনে অনুশীলন সমিতি স্থাপিত হয়। সহসভাপতি ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস এবং অরবিন্দ ঘোষ। প্রাথমিক পর্যায়ে অনুশীলন সমিতি সদ্যসদের শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করার মাধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ১৯০৭ থেকে তাঁরা বীর বিক্রমে পথে নেমে পড়েন।

১৯০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নব প্রতিষ্ঠিত পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর যে ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন সেটি বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর অল্প কয়েকদিন পর ২৩ ডিসেম্বর তারা ঢাকার প্রাক্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অ্যালেনকে হত্যা করার চেষ্টা করে। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল তারা ভুলবশত দুজন নিরপরাধী মহিলা মিসেস ও মিস কেনেডিকে হত্যা করে। অথচ তাদের টার্গেট ছিল কলকাতার ম্যাজিস্ট্রেট ও পরবর্তীকালে বিহারের মুজাফ্ফরপুরের জেলা জজ ডগলাস কিংসফোর্ড। মুজাফ্ফরপুরের ঘটনা বাংলার স্বাধীনতা বিপ্লবের ইতিহাসে একটি বিখ্যাত ঘটনা। কে না জানে ঘটনার জেরে ফাঁসি হয় বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর। আত্মহত্যা করেন বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। পরবর্তী সময়ে কলকাতার মানিকতলার বাগানে একটি বোমা তৈরীর কারখানা আবিষ্কার হয়। অনুশীলন সমিতির জনৈক নেতা বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে তথাকথিত আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলার আওতায় বিচারাধীনে আনা হয়।

আলিপুর মামলার কারণে ধরপাকড় ও পুলিশি হানা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। ফলে অনুশীলন সমিতিতে বিভাজন দেখা দেয়। যদিও সমিতিগুলি একটির থেকে অন্যটি স্বাধীন ছিল, তবুও প্রমথনাথ মিত্র, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং পুলিনবিহারী দাসের যৌথ পরিচালনায় সেখানে কেন্দ্রীয় অ্যাকশন কমিটির মতো একটি কমিটি ছিল। সরকার সমিতিগুলিকে দুটি প্রধান দলে চিহ্নিত করে- যুগান্তর দল ও ঢাকা অনুশীলন দল। মোটামুটিভাবে পুলিশ পশ্চিমবঙ্গের বিপ্লবীদেরকে যুগান্তরের নামানুসারে যুগান্তর দল এবং পূর্ববঙ্গের বিপ্লবীদেরকে ঢাকা অনুশীলন সমিতি বলে চিহ্নিত করে। পশ্চিমবঙ্গের বৈপ্লবিক কর্মকান্ড ১৯১০ সালের পর হতে কিছু কালের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং তখন থেকে বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র পূর্ববঙ্গে স্থানান্তরিত করা হয়।

এরপরে ঢাকার অনুশীলন সমিতি বিরাট আকার ধারন করে। ১৯৩২ সালের মধ্যে সেখানে ৫০০টি শাখা তৈরি হয়। মূলত পুলিনবিহারী দাসের সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য ঢাকা অনুশীলন সমিতি দ্রুত প্রসার লাভ করেছিল বলে মত ঐতিহাসিকদের। সম্ভবত সূর্য সেনের ফাঁসির সঙ্গে শেষ হয় অনুশীলন সমিতির যাত্রা। তবে ভারতের গুপ্ত বৈপ্লবিক আন্দোলনে যে ভূমিকা পালন করেছিল এই সংগঠন তা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করে তা বলা যেতেই পারে।

তথ্যসূত্র – প্রতাপ চন্দ্র সাহা