অনুপ চেতিয়া ও নুর হোসেন

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর ‘সাত খুন’ মামলা ঘিরে আলোড়িত হয়েছিল রাজ্য৷কারণ এই মামলার অন্যতম অপরাধী নুর হোসেন বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে রাজ্যে আত্মগোপনে ছিলেন৷তাকে বাগুইআটি থেকে গ্রেফতার করা হয়৷ আইনি পদক্ষেপ ও বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে ধৃত নুর হোসেনকে বাংলাদেশে সরকারে হাতে তুলে দিয়েছিল ভারত৷ তার বদলে ভারত পেয়েছিল মোস্ট ওয়ান্টেড আলফা নেতা অনুপ চেতিয়াকে৷ নয়াদিল্লি-ঢাকা বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে এটাই প্রথম ‘দেয়া নেয়া’পর্ব৷
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে এই বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রথম পর্বে তাই আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে সাত খুন মামলা৷ ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে একই দিন প্রকাশ্যে সাতজনকে (প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা, তাদের সহকর্মী ও গাড়ির চালক) অপহরণ করা হয়৷ অপহরণের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রত্যেকের মৃতদেহ পাওয়া যায় স্থানীয় শীতলক্ষ্যা নদীর জলে৷ কোটি কোটি টাকার অনৈতিক লেনদেনই হল এই চাঞ্চল্যকর খুনের কারণ৷ খুনে জড়িত ব়্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের মতো নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা ও কর্মীরা৷  সেই বছরেই ১৪ জুন কলকাতা পুলিশের হাতে ধরা পড়েন নুর হোসেন। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় ভারত সরকার। সেই দিনই বাংলাদেশ সরকার অসমের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা তথা আলফার সাধারণ সম্পাদক অনুপ চেতিয়াকে ভারতে পাঠায়৷

আরও পড়ুন:‘সাত খুন’ মামলার নুর হোসেনের চরম শাস্তি চাইছে সরকার

অনুপ চেতিয়া এমন একজন প্রাক্তন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা যার সঙ্গে আলফার সুপ্রিমো পরেশ বড়ুয়ার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে৷বর্তমানে চেতিয়া আলফার আলোচনাপন্থী নেতা৷ আর সংগঠনের সশস্ত্র পথটি ধরে রেখেছেন স্বয়ং পরেশ বড়ুয়া৷গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট চিনের মাটি থেকে উত্তর পূর্ব ভারতে নাশকতার ছক কষছেন আলফা (স্বা.) প্রধান৷
আরও পড়ুন: চিন থেকে নাশকতার ছক আলফা সুপ্রিমো পরেশ বড়ুয়ার
অসমে রক্তাক্ত বিচ্ছিন্নতাবাদ আন্দোলন চলাকালীন আলফা সুপ্রিমো পরেশ বড়ুয়ার ডানহাত বলে পরিচিত হন অনুপ চেতিয়া৷ এক সময় ভারত-বাংলাদেশের মধ্যেই ছড়িয়েছিল আলফার কার্যকলাপ৷একইভাবে উত্তর পূর্ব ভারতের  আরও কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন (এটিটিএফ, এনএলএফটি ইত্যাদি) বাংলাদেশে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে৷ পাশাপাশি আলফা নেতৃত্ব বাংলাদেশে নিজেদের কনট্যাক্ট বেশ জোরালো করে নেন৷


১৯৯১ সালে অনুপ চেতিয়াকে প্রথম গ্রেফতার করা হয়৷পরে অসমের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর শইকিয়ার নির্দেশ মুক্তি পান চেতিয়া৷ছাড়া পেয়েই বাংলাদেশ চলে গিয়েছিলেন অনুপ চেতিয়া৷ ১৯৯৭ সালে তাকে জাল পাসপোর্ট ও অবৈধ বিদেশী মুদ্রা রাখার কারণে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়৷ কিন্তু বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় অনুপ চেতিয়ার মতো মোস্ট ওয়ান্টেড আলফা নেতাকে দেশে আনা সম্ভব হয়নি৷ বাংলাদেশে তখন আওয়ামি লিগ ক্ষমতায়৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ ২০০১ সাল পর্যন্ত তাঁর সরকার ছিল৷
হাসিনা সরকার ক্ষমতা থেকে সরে যেতেই বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার করে আলফা উত্তর পূর্ব ভারতে নাশকতার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে৷  ২০০১ সালে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামাত ইসলামি সহ চার দলীয় জোট সরকার৷ প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া৷

সেই দশ ট্রাক অস্ত্র

২০০৪ সালে খালেদা জিয়ার আমলেই ঘটে গিয়েছিল চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচার কাণ্ড৷চট্টগ্রাম থেকে ১০টি ট্রাক সমেত বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়৷ গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়, এই অস্ত্র আলফা নেতা পরেশে বড়ুয়ার জন্য পাঠানো হচ্ছিল৷ ভারত বিরোধী এই মামলায় জড়িয়ে যান তৎকালীন সরকারের  শিল্পমন্ত্রী  মতিউর রহমান নিজামী এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও পরেশ বড়ুয়া  ২০০৯ সালে বাংলাদেশে ফের আওয়ামি লিগ ক্ষমতা আসে ৷ শুরু হয় দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা৷ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা  দেয় আদালত।  জামাত ইসলামির আমির ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী৷ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গণহত্যার অভিযোগে তাঁকে গতবছর ১১ মে তাঁকে ফাঁসি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার৷
এসব ঘটনা চলাকালীন বাংলাদেশেই বন্দি ছিলেন অনুপ চেতিয়া৷ ভারতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আমলে দু দেশের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি৷ ক্ষমতায় এনডিএ সরকার আসতেই বিষয়টিতে জোর দেন দু দেশের প্রধানমন্ত্রী৷শেষপর্যন্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হয়৷ তারই মাঝে নারায়ণগঞ্জে ঘটে যায় ‘সাত খুন’ কাণ্ড৷ সেই মামলার আসামী নুর হোসেনের বদলে অনুপ চেতিয়া ওরফে গোলাপ বড়ুয়াকে  বছর পর ফের হাতে পায় ভারত৷