জলপাইগুড়ি: বহুপ্রতীক্ষিত দুর্গা পুজোর পাঁচটি দিন কেটে গিয়েছে। সকলের মন ভার। তবে এখানে উৎসবের শেষে ফের উৎসবের শুরু। দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই উত্তরবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে ফের বোধনের সুর। একদশীর সকাল থেকেই উত্তরবঙ্গের রাজবংশী-প্রধান গ্রামগুলিতে শুরু হয় মা ভাণ্ডানি রূপে দেবী সর্বমঙ্গলারই আরাধনা। জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি, ধূপগুড়ি, মালবাজার, সেইসঙ্গে নবগঠিত আলিপুরদুয়ার জেলা এবং পার্শ্ববর্তী কোচবিহার জেলার বেশ কিছু গ্রামে সমৃদ্ধির দেবী ভাণ্ডানির পুজো ঘিরে ফের উৎসবের আমেজ। একাদশীর দিনে ময়নাগুড়ি বার্নিশ গ্রাম পঞ্চায়েতের বড় ভান্ডানিতে ভান্ডানি পুজোর রীতি রয়েছে। একাদশী তিথিতে দেখা যায় দুর্গার আরেক রূপ মা ভান্ডানী দেবী। ধন সম্পদে অধিকর্তা মা ভান্ডানী।

দুর্গা মা’য়ের আরেক রূপ ভান্ডানীকে সিংহের পরিবর্তে দেখা যায় বাঘের উপর বিরাজ করতে। অন্যদিকে প্রথা মেনেই দেখা যায় লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক এবং গণেশকে। ময়নাগুড়ি বার্নিশ গ্রাম পঞ্চায়েতের বড় ভান্ডানিতে ভান্ডানি পুজোর কমিটির সভাপতি দীনেশ রায় জানিয়েছেন, এই পুজো পাঁচশো বছরের পুরনো। এই দেবী খুব জাগ্রত মায়ের কাছে যা চাওয়া হয় তাই বাস্তবায়িত হয় বলে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে আসছে।

ভান্ডানী পুজোকে কেন্দ্র করে একটি জমজমাট মেলা বসে। এই পুজো ও মেলা একদিনই চলে। এই অনুষ্ঠানে উত্তরবঙ্গ সহ পাশ্ববর্তী ভুটান, সিকিম, নেপাল এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকেও পূর্ণাথীরা এখানে পুজো দিতে আসেন। এদিন বিরাট মেলা ও পুজো উপলক্ষে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে।

এখানে আসা পূর্ণাথীরা বিশ্বাস করেন, মা ভান্ডানী খুব জাগ্রত। যা মানত করা যায় তাই বাস্তবায়িত বলেই দুরদূরান্ত থেকে লক্ষাধিক মানুষ এখানে আসেন। সকাল থেকেই অস্বাভাবিক ভিড় লক্ষ করা যায়। পুজো দেওয়ার জন্য লম্বা লাইন হয় চোখে পরার মত। এই পুজোতে কয়েক হাজার ছাগ বলি ও পায়রা বলি হওয়ার রীতি রয়েছে। এখানে বড় ভান্ডানীর সঙ্গে ছোট ভান্ডানীতে ভিড় ছিল চোখে পরার মতো।

শুধুমাত্র রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষই নয়, ভাণ্ডানি পুজো ঘিরে উৎসবে মেতে ওঠে গ্রামীণ উত্তরবঙ্গের সমস্ত ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ। দেবী দুর্গারই এক রূপ দেবী ভাণ্ডানিকে আবার উত্তরবঙ্গের বনবস্তিবাসীরা পুজো করেন ‘বনদুর্গা’ রূপে। উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চলেও তাই দেবী দুর্গার বিসর্জনের পর এক উৎসবের শেষে আরেক উৎসব শুরু হয়ে যায়।

দেবী ভাণ্ডানির পুজো ঘিরে কথিত আছেস, বিসর্জনের পর বাপের বাড়ি থেকে নিজের ঘর কৈলাসে ফেরার সময় উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চল দিয়েই গ্রাম্যবধূ বেশে ফিরছিলেন উমা। কিন্তু সেই সময় রাতের অন্ধকারে অরণ্যের গভীরে স্রেফ মায়ার ছলে মা পথ হারিয়ে ফেলেন৷ জঙ্গল থেকে ভেসে-আসা গ্রাম্যবধূর কান্নার শব্দ শুনে ছুটে যান রাজবংশী সমাজেরই কিছু বাসিন্দা। তাঁকে নিয়ে যান নিজেদের গ্রামে। একটি রাত দেবী সেই গ্রামে কাটিয়ে একাদশীর দিন ফিরে যান কৈলাসে। গ্রামবাসীদের আতিথ্যে তুষ্ট দেবী ফিরে যাওয়ার আগে নিজের প্রকৃত পরিচয় দেন এবং গ্রামাঞ্চলের শস্যভাণ্ডার সদাসর্বদা পূর্ণ থাকার বর দিয়ে যান। সেই থেকেই দেবী ভাণ্ডানি তথা বনদুর্গার পুজোর সূচনা।

ময়নাগুড়ির বার্নিশ গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ভাণ্ডারি গ্রামে প্রতি বছরের মতো এ বছরেও একাদশীর দিন মহাধূমধামে পূজিত হচ্ছেন মা ভান্ডানি। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত তো বটেই, এমনকী পার্শ্ববর্তী নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশ থেকেও ভক্তরা ভিড় জমান এই পূজায়। পুজো হয় তন্ত্রমতে। সমগ্র ডুয়ার্স তথা উত্তরবঙ্গ জুড়ে দেবী ভাণ্ডানি তথা বনদুর্গার পুজো হলেও এই গ্রামের পুজোর মর্যাদাই আলাদা৷ পাঁচশো বছরের পুরানো এই গ্রামের পুজো। পুজো উপলক্ষে বসে বিরাট মেলা। পুজোয় এখনও ভক্তরা মানত হিসাবে নিবেদন করে পায়রা, পাঁঠা। বছরের এই একটি দিন জনসমুদ্রের চেহারা নেয় ময়নাগুড়ির এই বার্নিশ এলাকা। পুজো কমিটির সহ সভাপতি দীনেশচন্দ্র রায় জানান, এখানে দেবী ব্যাঘ্রবাহিনী ও দ্বিভূজা। পুজাশেষে রাতেই হয় দেবীর ভাসান। মেলা চলে সারা রাত।