সুমন ভট্টাচার্য: রবিবার সন্ধ্যায় কালবৈশাখীর পরে তপ্ত শহর যখন শীতল হচ্ছে, তখন বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গের এই মহা গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে কালবৈশাখী তো এল, কিন্তু বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় কোথায়? প্রেসিডেন্সি কলেজের এই প্রাক্তনী, যাঁর বিখ্যাত হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল তিনি শোভন চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবী, সেই কলকাতা শহরের প্রাক্তন মেয়রই বা কোথায়? এবং রাজনীতির কি আশ্চর্য সমাপতন দেখুন, শোভন-বৈশাখী নেই বলে, রায়দীঘিতে দেবশ্রী রায়ও নেই। যে রহস্যের সমাধানের জন্য এনআইএ বা সিবিআইকে ডেকে লাভ নেই, কারণ ওই দুটোই কেন্দ্রের শাসক দলের হাতে, বরং ফেলুদা এবং শার্লক হোমসকে একসঙ্গে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, যে কী কারণে যেদিন দিল্লিতে বিজেপির সদর দপ্তরে শোভন এবং বৈশাখী গেরুয়া ঝান্ডা তুলে নিয়েছিলেন, সেই দিনই দেবশ্রী রায় একই সময় পদ্মের সদর দপ্তরে কেন পৌঁছেছিলেন?

এক পুরুষকে নিয়ে দুই নারীর দ্বন্দ্ব নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আইকনিক’ উপন্যাস ছিল, ‘এক নারী, দুই তরবারি’। সেই উপন্যাসকে নিয়ে অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী দুরন্ত সিনেমাও বানিয়েছিলেন। কিন্তু সেসব তো সেলুলয়েডের গল্প। বাস্তবে যে এক পুরুষ, পড়ুন শোভন চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে, দুই নারীর টানাপোড়েন, এইরকম ধুন্ধুমার কান্ড বাংলার সমাজ কিংবা রাজনীতিতে বাঁধিয়ে দিতে পারে, তাই বা কে জানত। রাজ্যের শাসক দল এবং কেন্দ্রের শাসক দল, দু’জনকেই ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছে ব্যক্তিজীবনের এই টানাপোড়েন নিয়ে। কিন্তু অবশেষে সেই ঝড় যখন থামল, তখন বঙ্গের রাজনীতিতে বৈশাখী এবং দেবশ্রী দুজনেই অনুপস্থিত। তাই যেটা সবাই প্রত্যাশা করেছিল, গোটা দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়ে শোভন ‘বৈশাখী হাওয়া’ বইয়ে দেবেন, তেমনটাও হচ্ছে না।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দীঘির মতো আসনে লড়াইটা তাই অনেকটাই ম্যাড়মেড়ে। সিপিএমের কান্তি গাঙ্গুলি বনাম সদ্য তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া শান্তনু বাপুলির ভোট যুদ্ধে সেই স্ফুলিঙ্গই বা কোথায়, রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ এর অনুকরণে কেই বা বলবে, ‘কটাক্ষের রবে মম পঞ্চম শর’।

আর যে কেন্দ্রটিকে নিয়ে আলোচনা হতে পারে, তা আবার আর এক প্রান্তে হুগলির তারকেশ্বর। সেখানে তৃণমূলের স্থানীয় প্রার্থী রমেন্দু সিংহ রায়ের প্রতিপক্ষ বিজেপির হেভিওয়েট তাত্ত্বিক নেতা স্বপন দাশগুপ্ত। বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, তাত্ত্বিক হিসাবে পরিচিতি এবং বেশ কয়েক বছর রাষ্ট্রপতি মনোনীত সদস্য হিসাবে সাংসদ থাকাটা স্বপন দাশগুপ্তকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তারই পাল্টা হিসাবে তৃণমূল বলছে, এই যে এতদিন আদিসপ্তগ্রামকে নিজের মাতুলালয় বলে দাবি করা সেলিব্রেটি সাংবাদিক রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন, হুগলির কার জন্য কী করে দিয়েছেন? কোন্ গ্রন্থাগারকে তিনি টাকা দিয়েছেন, কিংবা কোন্ স্কুল বা কলেজের বাড়ি নির্মাণের জন্য স্বপন দাশগুপ্তের এমপি ল্যাড থেকে টাকা এসে পৌঁছেছে?

হিন্দুদের পবিত্র তীর্থ বলে পরিচিত তারকেশ্বর। সেই হিন্দুভাবাবেগ হিন্দু ভোট ব্যাঙ্কই লন্ডন ফেরত এই ঐতিহাসিককে ভোটযুদ্ধে পার করে দেবে, এমনটাই আশা গেরুয়া শিবিরের। কিন্তু তারকেশ্বর মন্দির ঘুরে দেখলেও নজরে পড়বে না কোনও পাথর এমন লাগানো আছে যা বলে দেবে পাঁচ বছর সাংসদ থাকাকালে স্বপন সেই মন্দিরের জন্য কিছু করেছেন বা কোনও সাহায্য দিয়েছেন। তৃণমূলেরও এতদিন সমস্যা ছিল, তাদেরও তারকেশ্বরে প্রার্থী ছিল ‘পরিযায়ী’ রচপাল সিং। কিন্তু করোনা কাল যেহেতু শিখিয়েছে, পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা এক রকম, পরিযায়ী রাজনীতিকদের নিয়ে দুশ্চিন্তা আলাদা। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবারে প্রার্থী বদলে পঞ্চায়েতের নেতা রমেন্দু সিংহ রায়কেই টিকিট দিয়েছেন। এবং ঘাসফুলের এই সিদ্ধান্ত আসলে তারকেশ্বরের লড়াইটাকেও তৃণমূলের স্লোগানে বদলে দিয়েছে, ‘ঘরের ছেলে’ বনাম ‘বহিরাগত’।

এই বঙ্গের বিত্তবানরা যেমন অর্থ থাকলে লাইব্রেরি তৈরি করে দিতেন, মন্দিরের উন্নতিতে দান করতেন, তেমনই নদীর ঘাটও বাঁধিয়ে দিতেন। যেমন ২০১৪ই হুগলি লোকসভা কেন্দ্র থেকেই বিজেপির প্রার্থী হওয়া, আর এক সেলিব্রেটি সাংবাদিক এবং বিলেতে পড়ার সময় স্বপন দাসগুপ্তের ঘনিষ্ঠ বন্ধু চন্দন মিত্রদের নামে গঙ্গার তীরে নিজস্ব ঘাট রয়েছে। তারকেশ্বর থেকে উত্তরপাড়া হয়ে বালি ব্রিজ ধরা পর্যন্ত চা খাওয়ার অছিলায় যত ঘাটই দেখলাম, কোথাও স্বপন দাশগুপ্তের নামে কোনও বোর্ড নেই। তাহলে নদীর জল ছলাৎ ছল করে ধাক্কা খেয়ে কার গুণগান গাইবে?

২রা মে আমরা জানতে পারব তারকেশ্বরের ফল কী হবে। কিন্তু স্বপন দাশগুপ্তকে দীর্ঘদিন ধরে চেনা, দিল্লি থেকে আসা তাঁর এক সাংবাদিক বন্ধু হুগলিতে চা খেতে খেতে বলছিলেন, “৬ই এপ্রিলই কিন্তু তারকেশ্বরের মানুষ শেষবারের মতো বিলেত ফেরৎ স্বপন দাশগুপ্তকে দেখতে পাবেন। ভোটের ফল যাই হোক, নির্বাচন মিটে গেলে বিলেতের অক্সফোর্ড স্ট্রিট ছেড়ে স্বপন যে তারকেশ্বরের গলিঘুচিতে হাঁটতে ফিরে আসবেন না, তা নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায়।” তারকেশ্বরের বিজেপি প্রার্থীর ঘনিষ্ঠরাও যেটা জানেন, হুগলির মানুষ কি সেটা উপলব্ধি করতে পারছেন?

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.