সুমন ভট্টাচার্য: একজন গায়ক। আর একজন গোটা বাংলার নেতা।

প্রথমজন যে এত ভালো গায়ক, আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে দেশপ্রেমের গান এত ভালো গান, গত ২০ বছরে কেউ জানতো না। গান গেয়ে নিজের জাতীয়তাবাদী চরিত্র প্রমাণ করার পর তিনি এবার জার্সি বদলে গেরুয়া শিবিরের প্রার্থী।

এই প্রথম জনের নাম রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল সরকারের আমলে নাকি তাঁকে কাজ করতে দেওয়া হয়নি, তাই তিনি ঘাসফুল ছেড়ে পদ্মফুলে গিয়ে ডোমজুড় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

দ্বিতীয়জন কখনও লড়েছেন খাস কলকাতার এন্টালি থেকে। আবার উত্তর-পূর্ব কলকাতা থেকে জিতে লোকসভায় পর্যন্ত গিয়েছেন। কিন্তু যেই উত্তর কলকাতায় হারলেন তিনি চলে গেলেন একেবারে উত্তরবঙ্গে। সেখানেও রায়গঞ্জ থেকে জিতে তিনি সাংসদ হলেন। আবার যেই রায়গঞ্জ থেকে হারলেন চলে এলেন হুগলিতে। হুগলির চণ্ডীতলায় সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসাতে তিনি এবার সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী।

এই দ্বিতীয় চরিত্রের নাম মহম্মদ সেলিম। সিপিএমের পলিটব্যুরোর সদস্য, অনেকের মতে বামেদের সঙ্গে ‘ভাইজান’ আব্বাস সিদ্দিকির জোটের মূল কারিগর। প্রায় সাইনবোর্ডে পরিণত হয়ে যাওয়া সিপিএম নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তন ছাত্রনেতা নাকি যে কোনও পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারেন। তাঁর দলের ভিতরেই সহকর্মীরা বলেন, সেই জন্যই তিনি রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সিপিএম থেকে ‘তাড়াতে’ বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

কিন্তু মহম্মদ সেলিম কি জানেন না তাঁর চাইতে অনেক আগে দিল্লিতে সিপিএমের মুখ হয়ে ওঠা সইফুদ্দিন চৌধুরী কি বলে গিয়েছিলেন? কেন বাবরি ধ্বংসের পরেই সইফুদ্দিন বলেছিলেন, বামেদের ঠিক করে নিতে হবে তাদের প্রধান শত্রু কে? বিজেপি না কংগ্রেস? দুই দলের থেকেই সমদূরত্ব রাখার যে নীতি আউড়ে প্রকাশ কারাত শুধু জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেননি তাই নয়, প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে এবং পরে ত্রিপুরায় সিপিএমের অন্তর্জলীর যাত্রার পথ পরিষ্কার করে দিয়েছেন, সেটা আজ ভুল, তাতো সবাই মানে। সেই জন্যই তো পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে মোর্চা গড়ে নির্বাচন করতে হচ্ছে সিপিএমকে।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে এই সংযুক্ত মোর্চার বা পরিষ্কার করে বলতে গেলে সিপিএমের প্রধান শত্রু কে? বিজেপি না তৃণমূল? যে উদ্যোম এবং উৎসাহ নিয়ে সেলিম ব্রিগেডের মঞ্চে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীকে সরিয়ে ভাইজান আব্বাস সিদ্দিকিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তাতে পরিষ্কার বিহার নির্বাচনে ওয়াইসির ‘মিম’ যে কাজটি করে তেজস্বী যাদবের নেতৃত্বাধীন জোটের যাত্রা ভঙ্গ করেছিল, বঙ্গভূমিতেও ‘আইএসএফ’-কে দিয়ে সেটাই করাতে চান চণ্ডীতলার সিপিএম প্রার্থী। তা নাহলে বেছে বেছে সিপিএমের এই পলিটব্যুরোর সদস্য কেনই-বা হুগলির চণ্ডীতলায় এসে দাঁড়াতে যাবেন?

চতুর্থ দফার নির্বাচনে হাওড়া এবং হুগলির যেসব কেন্দ্রে ভোট হয়েছে তার মধ্যে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডোমজুড় এবং মহম্মদ সেলিমের চণ্ডীতলা নিঃসন্দেহে আলাদা গুরুত্ব রাখে। কিন্তু রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে এই দুই নেতাই, রাজীব এবং সেলিম এমন সব প্রশ্নের জন্ম দিয়ে দেন, যার উত্তর খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে রায়গঞ্জ কেন্দ্রটি বিজেপি জিততে পেরেছিল শুধুমাত্র মহম্মদ সেলিম এবং দীপা দাশমুন্সীর মধ্যে টানাপোড়েনের জন্য। কারণ ২০১৪-এ কংগ্রেসের দীপাকে হারিয়েই লোকসভায় গিয়েছিলেন সিপিএমের মহম্মদ সেলিম। রায়গঞ্জ নিয়ে দড়ি টানাটানির জন্যই ২০১৯-র লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস-সিপিএমে জোট হতে পারেনি। আর এই জোট না হওয়ার জন্য বিজেপি অনেক ক্ষেত্রেই সুবিধে পেয়েছিল। ২০১৯-এর লোকসভাই বলে দিয়েছিল মহম্মদ সেলিমের কাছে রাজনৈতিক আদর্শ-টাদর্শ সব বাজে কথা, আসলে সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেকে নিরাপদ রাখাটাই একমাত্র এবং একমাত্র উদ্দেশ্য।

আর ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন বলে দিচ্ছে মহম্মদ সেলিম আসলে সইফুদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে কিছুই শিখেনি, তা নাহলে ফুরফুরা শরিফের আব্বাস সিদ্দিকিকে নিয়ে জোট করে মুসলিম ভোট ভাগ করার চেষ্টায় নামতেন না। সেলিমের এই রাজনৈতিক কৌশল সিপিএমকে শুধু কয়েক কদম পিছিয়ে দেয়নি, বিজেপিকেও ধর্মীয় মেরুকরণে অনেকটাই সাহায্য করেছে। বামেরা, যাদের এতদিন ধর্ম নিরপেক্ষ হিসেবে ভাবা হতো, তারা যদি ভাইজান আব্বাস সিদ্দিকির মতো কট্টরপন্থীর হাত ধরতে পারে, তাহলে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে অসুবিধে কোথায়? পশ্চিমবঙ্গের জনগণের মাথায় এই যুক্তি গেঁথে দেওয়ার কৃতিত্ব অবশ্যই মহম্মদ সেলিমের, যিনি সাদরে আব্বাস সিদ্দিকিকে সংযুক্ত মোর্চার সঙ্গে একজোটে নিয়ে এসেছেন।

মহম্মদ সেলিম যে কোনও ধর্মনিরপক্ষে রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না, তার প্রমাণ বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবে চণ্ডীতলাকে বাছা। যদি তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির বিরোধী হতেন, তাহলে কলকাতায় এসে ভবানীপুর কিংবা রাসবিহারীতে দাঁড়াতে পারতেন, দীর্ঘদিন যেখানে তিনি বাসিন্দা ছিলেন। তা না করে তিনি কিন্তু হুগলির চণ্ডীতলাকেই বেছেছেন, যদি তৃণমূলের প্রয়াত সাংসদ আকবর আলী খন্দকরের স্ত্রী স্বাতী খন্দকরের সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসিয়ে তৃণমূলের যাত্রা ভঙ্গ করা যায়।

এটা পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরাই ঠিক করবেন যে মহম্মদ সেলিম যে পথে দলকে ঠেলতে চাইছেন, লালঝাণ্ডাকে সেই দিকে নিয়ে গিয়ে আসলে বিজেপির হাত শক্ত করবে? ঐতিহাসিক এই বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গ সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে!

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.