নিয়মিত ট্রেকিং করার সুবাদে ভয়-ডর একটু কমই আছে। রাতের অন্ধকারে ভূতের ভয় কিংবা হঠাৎ ছায়া দেখে কেঁপে ওঠা- এসব আমার কাছে নিছক গল্পকথা। তবে বিজ্ঞান যতটুকু ব্যাখ্যা দেয়, সেই প্রকৃতির বাইরেও যে অতিপ্রকৃতি বলে একটা বস্তু আছে, সেটা একবারই অনুভব করেছিলাম। মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। পাঠকেরা হয়ত হেসেই উড়িয়ে দেবেন, আবার মানসিক ভ্রমও বলতে পারেন। সে বিশ্লেষণ আপনাদের উপরেই ছেড়ে দেওয়া রইল। আমি শুধু গল্পটা বলছি…

লেখক সৈকত ঘোষ

বছর কয়েক আগের ঘটনা। প্রত্যেক বছরই আমরা পুজোর সময় কোথাও না কোথাও বেরিয়ে পড়ি। হতে পারে পাহাড় কিংবা সমুদ্র। তবে সেবার স্থির শিহরণ জাগানো এক রহস্যময় জায়গায় হবে আমাদের সফর। রূপকুণ্ড অভিযান। এর আগে সেই রূপকুণ্ড ট্রেকিংয়ের খুঁটিনাটি তথ্য kolkata24x7-এ প্রকাশ করা হয়েছিল।

পড়ুন: চলুন পুজোর ছুটিতে ঘুরে আসি ভারতের এক রহস্যময় জায়গা থেকে

উত্তরাখণ্ডে ১৬ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত একটি রহস্যময় অঞ্চল। এখানে গেলে দেখা যাবে একটি হিমবাহ হ্রদ। তবে অদ্ভুত বিষয় হল, সেই হ্রদের চারপাশে রয়েছে অসংখ্য নর কঙ্কাল। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে এই নর কঙ্কালগুলি ১২০০ থেকে ১৪০০ বছর আগের। একটা-দুটো নয়। প্রায় ৫০০-র বেশি নর কঙ্কাল দেখা যায় সেখানে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই নরকঙ্কাল গুলির গড় উচ্চতা হবে ১০ থেকে ১২ ফুট। প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে কিছু কিছু মৃতদেহ থেকে মাংসও পাওয়া যায়। দেখামাত্র গা শিউরে উঠবে আপনার।

কিন্তু বরফ ঢাকা এই অঞ্চলে কোথা থেকে এল এত সব নরকঙ্কাল?

রহস্যময় হিমবাহ হ্রদটিকে ঘিরে লোকমুখে কথিত আছে কিছু গল্প। কেউ বলেন, ”মহাদেব যখন পার্বতী মাতাকে নিয়ে একটি নির্জন স্থানে অমৃত বাণী শোনানো উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন তখন দেবী পার্বতীর ইচ্ছা হল যে স্নান করবেন এবং তাঁর রূপ দর্শন করবেন। তখন ভগবান শিব তাঁর ত্রিশূল দিয়ে আঘাত করে সেই জায়গায় একটি হ্রদের সৃষ্টি করেন, এরই নাম রূপকুণ্ড।

ঐতিহাসিকদের মতে বহু প্রাচীন কালে, কোনও এক অস্বাভাবিক শিলাবৃষ্টির কারণে, মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। যাতে অনেক মানুষের মৃত্যু হয় এবং সেইসব নরকঙ্কাল রূপকুণ্ড হ্রদের চারপাশে পড়ে আছে আজও। তবে এক পৌরানিক ব্যাখ্যাও আছে। কথিত আছে, “হাজার হাজার বছর আগে কোনও এক রাজা, নন্দা দেবীর উদ্দেশ্যে পূজা দেওয়ার জন্য এই পথে যাত্রা করেন। যাত্রাকালে তিনি বিভিন্ন ভোগ বিলাসে লিপ্ত হন, যার ফলে নন্দা দেবী রুষ্ট হন এবং যে নর্তকীরা তখন নৃত্য প্রদর্শন করছিল তারা মাটির তলায় ঢুকে যায়। যে জায়গায় এই ঘটনাটি ঘটেছিল বলে শোনা যায় তার নামকরণ করা হয় পাথরনাছুনি। এই ঘটনার পরেও রাজা থামেননি। পৌঁছে যান রূপকুণ্ডে। যেখানে ভয়ঙ্কর শিলা বৃষ্টির কারণে তিনি এবং তাঁর সেনাবাহিনী সহ সবাই মারা যান।” এই কঙ্কাল নাকি তাদেরই।

এবার আসি আমার গল্পে…

 

আমি এবং আমার বন্ধুরা এই অলৌকিক জায়গার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সঙ্গী হয়ে গেল অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। পথ চলতে কখনও চোখে পড়ে বিশাল বিশাল ঝরনা। সূর্য আর মেঘ যেন আকাশে খেলা করে বেড়াচ্ছিল, আর ভোর থেকে পাখির কল কাকলি দেহ ও মনের সব অবসাদ মিটিয়ে দেয় মুহূর্তে।

রূপকুণ্ড ছিল আমাদের সামিট পয়েন্ট, তাই আমাদের রাত ৩ টে থেকে হাঁটা শুরু করতে হয়। সে এক অভিনব অভিজ্ঞতা। কারও হাতে টর্চ, কারও মাথায় হেড ল্যাম্প। হাঁটতে হাঁটতে চলেছি আমাদের গন্তব্যের দিকে। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আলোকিত গোটা পাহাড়। বহুদূর থেকে ভেসে আসছিল জীবজন্তুর আওয়াজ। সেসব বন্য আওয়াজ আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরণ জাগাচ্ছিল। ভোর সাড়ে ৪ টের সময় আমরা পৌঁছে যাই রূপকুণ্ডে। সেখানে পৌঁছে আমরা আমাদের গাইডকে অনুরোধ করি, যে আমরা জুনারগালি যেতে চাই। যা আরও ৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। সেখান থেকে দেখা যায় ত্রিশূল, নন্দা দেবী, চৌখাম্বা ইত্যাদি পর্বত শৃঙ্গগুলি। আমাদের সকলের মনে হচ্ছিল যে আমাদের এই এত খাটনি করে আসা সার্থক হয়েছে। এবার ফেরার পালা। রূপকুণ্ড হয়ে ফিরতে হবে।

রূপকুণ্ডে পৌঁছে দেখলাম অপূর্ব সুন্দর হিমবাহ হ্রদ আর চারপাশে পড়ে আছে অসংখ্য নরকঙ্কাল। বন্ধুরা থাকলে যা হয়, সেই নরকঙ্কাল নিয়ে চলল আমাদের সেলফি তোলার হিড়িক। হঠাৎ আমার মাথায় একটা বাজে খেয়াল চাপল। মনে হল, আমি যদি একটা মাথার খুলি বাড়িতে নিয়ে যেতে পারি তাহলে কেমন হয়। সবাইকে দেখাতে পারবো, খুব মজা হবে।

এখনও পর্যন্ত আমার অলৌকিক ঘটনার উপরে কোনও বিশ্বাস ছিল না। তাই এপাশ ওপাশ দেখেই একটা মাথার খুলি আমি আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে নি কাউকে না বলে। এরপর শুরু হয় এক অদ্ভুত বিপত্তি। যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই গাইড আমাদের বলে দিয়েছিল, ওখানে পড়ে থাকা কোনও নরকঙ্কালে আমরা যেন হাত না দিই।

আমার রূপকুণ্ড থেকে যত ব্যবধান বাড়ছে ততই আমার ব্যাগ যেন ভারী হয়ে উঠছিল। আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না, এটা কেন ঘটছিল। আমি আমার বন্ধু বিক্রমকে ডাকলাম। বললাম আমার শরীরটা ভালো লাগছে না তাই আমার ব্যাগটা সে যেন কিছু দূর নিয়ে যায়। আমার ব্যাগে এমন কিছুই ছিল না। ছিল শুধু ওয়াটার বোতল, টর্চ, একটু খাবার। একটু এগিয়েই বিক্রম বলে উঠল, ”ভাই এ আমি নিতে পারছি না। যত যাচ্ছি এর ওজন তত বাড়ছে,মনে হচ্ছে যেন আমার পিঠটা ছিঁড়ে যাবে।” ও আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করল আমার ব্যাগে কি আছে? আমি কোনও উত্তর না দিয়ে বললাম, ”তুই যা আমি আসছি।” ফিরে গিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলাম রূপকুণ্ডের নরকঙ্কাল।

আমি হতবাক হয়ে গেলাম, যখন দেখলাম আমার আর ব্যাগ বইতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। জানিনা আমার এই ঘটনার বৈজ্ঞানিক কোন ব্যাখ্যা আছে কি না। তবে মনে মনে বলেছিলাম এই নরকঙ্কাল আমার ব্যাগে নয়, রূপকুণ্ডেই সাজে।