স্টাফ রিপোর্টার , কাকদ্বীপ : চারিদিক জুড়ে এক অদ্ভুত নিঃস্তব্ধতা। যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই শুধু জল আর জল।অসীম বিস্তৃত সুনীল জলরাশির মাঝেই ছোট্ট একফালি দ্বীপ।তিন দিকে নদী আর একদিকে বঙ্গোপসাগর তারই মাঝে অবস্থান ঘোড়ামারার।পূর্বে বটতলা,পশ্চিমে হুগলী,উত্তরে মুড়িগঙ্গা আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।সুন্দরবনের বুকে প্রান্তিক দ্বীপ হলেও বিশ্বের বুকে বেশ পরিচিত নাম এই ঘোড়ামারা।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়,ব্রিটিশদের সময়কালীন ঘোড়ামারার ঐতিহ্যই ছিল অন্যরকম।  ‘ঘোড়ামারা’ নামকরণের পিছনেও রয়েছে ব্রিটিশযোগ।জানা যায়,ব্রিটিশ আমলে কাকদ্বীপ থেকে এক সাহেব সরকারি কাজে নৌকায় তাঁর ঘোড়াকে নিয়ে বাংলার দক্ষিণপ্রান্তের এই দ্বীপে পৌঁছান।রাতে তাঁবুর বাইরে থেকে সেই ঘোড়াকে বাঘে তুলে নিয়ে যায়।জনশ্রুতি,সেই থেকেই এই দ্বীপের নাম হয় ঘোড়ামারা।ব্রিটিশদের সৌজন্যেই এই দ্বীপে গড়ে উঠেছিল বাংলার দ্বিতীয় টেলিগ্রাম অফিস।কিন্তু,দিন যত গড়িয়েছে ঘোড়ামারার ঐতিহ্যের উজ্জ্বল রঙ ততই ফিকে হয়েছে।ব্রিটিশদের তৈরি মাড-পয়েন্ট পোস্ট অফিস কিমবা লোহাচড়া দ্বীপ আজ অতীত।একদিকে আয়লা,বুলবুল,আম্ফানের মতো দানবীয় ঝড়ের তান্ডব অন্যদিকে নিয়মিত নদী ভাঙন—এই দু’য়ের গেরোয় ঘোড়ামারার অস্তিত্ব আজ বিপন্নপ্রায়।স্থানীয় প্রবীণ মানুষদের সাথে কথা বলে জানা গেল,প্রায় ১০০ বছর আগে ১০-১২ হাজার বিঘা জুড়ে চর পড়ে।

পূর্ব মেদিনীপুর ও সাগর এলাকা থেকে এসে অনেকে এই চরের জমিতে বসবাস শুরু করেন।ঘোড়ামারা দ্বীপের দক্ষিণে কয়েকশো বিঘা জুড়ে ছিল লোহাচড়া ও খাসিমাড়া দ্বীপ।দ্বীপ দুটিতে মানুষের বসতিও গড়ে উঠেছিল।কিন্তু,সমুদ্র আর নদীর ভাঙনে সেসব কবেই তলিয়ে গেছে।সেদিনের ১০-১২ হাজার বিঘার দ্বীপ আজ হাজার চারেক বিঘায় এসেছে দাঁড়িয়েছে।অন্যদিকে,বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ঘোড়ামারার বুকে আছড়ে পড়ছে আয়লা,আম্ফানের মতো প্রলয়াঙ্কারী ঝড়।আয়লা,বুলবুল,আম্ফানের মতো বিপর্যয়ের সময়ে প্রবল জলোচ্ছ্বাসে বারবার তছনছ হয়ে যাচ্ছে নদী বাঁধ।১৯৭৫ সালে ঘোড়ামারা দ্বীপের যেখানে আয়তন ছিল ৮.৫১ বর্গকিমি,সেটা ২০১২ সালে এসে ৪.৪৩ বর্গকিমিতে দাঁড়ায়।১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে খাসিমারা,খাসিমারা চর,লক্ষ্মীনারায়ণপুর,বাগপাড়া এবং বৈষ্ণবপাড়া নামক পাঁচটি গ্রাম ঘোড়ামারা দ্বীপ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।বিগত প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম পপ্রান্তে ব্যাপক ভূমিক্ষয় হয়েছে।

২০০৫ সাল থেকে দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তেও ভাঙন শুরু হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।বর্তমানে ঘোড়ামারার আয়তন ৩.৮৭ বর্গ কিমি,পরিধী ৮ কিমি।এর জন্য বিশ্ব উষ্ণায়নকে দায়ী করা হলেও ঘোড়ামারাবাসী তা মানতে নারাজ।তাঁদের বক্তব্য,”যদি বিশ্ব উষ্ণায়নই ভাঙনের মূল কারণ হতো তাহলে নয়াচরও তো একই সমস্যার সম্মুখীন হতো।”হলদিয়া বন্দরের উন্নতীসাধন করতে গিয়েই ঘোড়ামারার বিপদ ডেকে আনা হয়েছে বলেই অনেকে মনে করেন।আয়লার পরে ঘোড়ামারার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ হাজার।জনসংখ্যা বৃদ্ধি তো দূরের কথা এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার।জীবনযাপনের লড়াইয়ে অনেকেই আর এই বিপন্নপ্রায় দ্বীপে থাকতে চান না।কেউ পুনর্বাসন নিয়ে সাগর কিমবা কাকদ্বীপে চলে যান।অনেকে কাজের সন্ধানে কোলকাতা ও ভিন রাজ্যে চলে যান।তারই মাঝে ভিটেমাটির টানে তপন,নঈম,রফিকুলদের মতো মানুষরা ঘোড়ামারার বুকেই মাটি কামড়ে রয়ে যান।তাঁরাই প্রাণ দিয়ে আগলে রাখেন শতবর্ষের ঐতিহ্য,কত না জানা ইতিহাসকে।

একটা সময় দ্বীপে শিক্ষার খুব ভালো চল থাকলেও এখন তাতেও বেশ খানিকটা রাশ টেনেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা।গ্রামে বর্তমানে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়,আর চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়।কিন্তু,নদীর ভাঙনের জেরে খাসিমাড়া নিম্ন বুনিয়াদী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব আজ চরম সংকটে।বিদুৎহীন এই গ্রামের মানুষের ভরসা সৌর প্যানেল।ঘরে ঘরে সোলার প্যানেল চোখে পড়লেও সঠিক পরিচর্যার অভাবে অনেকের বাড়িতেই তা বর্তমানে অকেজো।দ্বীপের মাঝে ছোট্ট একটি বাজার।হাতেগোনা কয়েকটি দোকান।মূলত,দোকানপাট,বাজার-হ্বটের জন্য সাগরের রূদ্রনগর ও কাকদ্বীপেই যেতে হয় এই দ্বীপবাসীকে।দ্বীপের অধিকাংশ মানুষই পেশায় পানচাষী।পাশাপাশি,অনেকেই সমুদ্র ও নদীতে মাছ ধরেন।উল্লেখ্য,ঘোড়ামারার মিঠাপান প্রসিদ্ধ।পানের পাশাপাশি উর্বর জনিতে ধান চাষ হয়; কিন্তু পরিমাণে তা যৎসামান্য।আম্ফানের জেরে দ্বীপের নদীবাঁধ যেমন বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেমনই ঘড়-বাড়ি,গবাদি পশু হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে বহু পরিবার।দ্বীপের অধিকাংশ পান বরোজই প্রায় নিশ্চিহ্ন।স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানতে পারা গেল সম্প্রীতি এখানকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।ছোট্ট দ্বীপের মানুষজন একে অপরের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন।সে ভাঙন রোধেই হোক কিমবা মধ্যরাতে সাগরে অসুস্থ রোগীকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেই হোক।একডাকে বিপদে-আপদে এগিয়ে আসেন এখানকার মানুষ।দ্বীপে একটিমাত্র দুর্গাপুজো হয়।তবে মাঝেমধ্যে যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হয়।

ঘোড়ামাড়া জুড়ে এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আম্ফানের দগদগে স্মৃতি।দ্বীপের যেদিকেই তাকানো যায় সেদিকেই ধ্বংসস্তূপের ছবি।নদীপাড় বরাবর বীভৎস ভাঙন,দ্বীপের যেখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে কাঁচা বাড়ি,বড়ো বড়ো গাছ।কখনো আবার ভাটার সময় নদীগর্ভ থেকেই উঁকি মারছে সদ্য নদীরবুকে চলে দীর্ঘদিনের মাটির ঘরের ধ্বংসস্তূও।আম্ফানের সময় এই দ্বীপাঞ্চলের বহু মানুষকেই প্রশাসনের তরফে সাগরে ত্রাণশিবিরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।যে ক’জন মানুষ দ্বীপে থেকে গিয়েছিলেন তাঁরা সাক্ষী থেকে গেছেন শতাব্দীর এই বীভৎস ঝড়ের তান্ডবের।ঝড়ের বিবরণ দিতে গিয়ে এখনো আঁতকে উঠছেন রজত,ফুলহার বিবিরা।বিপর্যয় কাটিয়ে ছোট্ট দ্বীপের বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই ফের ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া লড়াই চালাচ্ছেন।ঘোড়ামারার মানুষ আবারও মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন।

পচামড়াজাত পণ্যের ফ্যাশনের দুনিয়ায় উজ্জ্বল তাঁর নাম, মুখোমুখি দশভূজা তাসলিমা মিজি।