নয়াদিল্লি: রাফায়েল মামলা পুনর্বিবেচনার আর্জি সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হতেই কংগ্রেস এবং রাহুল গান্ধীকে বেনজির ভাবে আক্রমণ শুরু করল বিজেপি। বৃহস্পতিবার বহু চর্চিত এবং বিতর্কিত রাফায়েল মামলা পুনর্বিবেচনার আর্জি খারিজ করে দেয় প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ডিভিশন বেঞ্চ। এই রায়ের পরেই রাহুল গান্ধীকে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ। বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া পেজ থেকেও ট্যুইট করে নিশানা করা হয় রাহুল গান্ধীকে।

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মুখ খোলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে তিনি এই রাফায়েল মামলাকে ‘কংগ্রেসের কুৎসা এবং অপপ্রচার’ বলে তোপ দাগেন।

এখানেই থেমে থাকেননি বিজেপির সভাপতি। ট্যুইট করে তিনি লেখেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে প্রমাণিত হল রাফায়েল মামলা আদতে মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। সংসদে আমরা যে সময় রাফায়েলের পিছনে ব্যয় করেছি সেই সময়টুকু মানুষের স্বার্থে ব্যয় করলে সাধারণ মানুষের উপকার হত।’

রাফাল জেট মামলার রিট পিটিশন নিয়ে বৃহস্পতিবার কি রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট, তা নিয়েই তুঙ্গে ছিল জল্পনা।

২০১৬ সালে ২৩শে ডিসেম্বর ফরাসি বিমানসংস্থা ড্যাসল্টের থেকে ৩৬টি রাফাল জেট যুদ্ধবিমানের বরাত দেয় মোদী সরকার। প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকার এই বরাত নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন বিরোধীরা। এই বরাতের বিষয়টি স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে সুপ্রিমকোর্টের তত্ত্বাবধানে সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছিল কংগ্রেস-সহ বহু বিরোধী দল।

গত বছর ডিসেম্বরে রাফাল জেট সংক্রান্ত মামলা খারিজ করে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। আর বৃহস্পতিবার সেই একই রায় বহাল রাখল মুখ্য বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি এস কে কউল, এবং বিচারপতি কে এম জোসেফের বেঞ্চ।

এই মামলার আর্জি খারিজ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ‘আমাদের এই কথা স্মরণে রাখা উচিত যে সরকারের সঙ্গে ফরাসি সংস্থার বরাত রয়েছে। আর এর আগেও বহুবার এফআইআর আর সিবিআই তদন্ত হয়েছে। এটা নতুন তদন্ত নয়।’

যদিও রাফাল মামলা নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন বিচারপতি কে এম জোসেফ। তিনি জানান, তদন্ত সংস্থা যদি মনে করে তবে তারা তদন্তে এগোতেই পারে।

প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যশবন্ত সিনহা, অরুণ শুরি এবং আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের আর্জির ভিত্তিতে এই বিষয়ে চলতি বছরের ১০ মে রায়দানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।

ওই দিনই রাফাল মামলা নিয়ে সরকার পক্ষের আইনজীবী বলেছিলেন, বিশ্বের কোথাও প্রতিরক্ষা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করে না। আর প্রতিরক্ষার মত অতি গোপনীয় বিষয়ে যেখানে দেশের সুরক্ষা জড়িয়ে আছে সেক্ষেত্রে কোনও ধরনের তদন্ত নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে।

কিন্তু, যশবন্ত সিনহা, অরুণ শুরি-সহ আপিলকারিরা সরকারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের কাছে নালিশ জানিয়ে বলেছিল বরাত পাওয়ার ব্যাপারে বহু বিষয়ই লুকিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্র।

ফরাসি সংস্থার সঙ্গে ভারতের চুক্তি করার জন্য যে তিন সদস্যের দল গঠিত হয়েছিল তাঁদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ আনেন বিরোধীরা।

রাফায়েল নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে এই প্রেক্ষিতে আগেই মামলার আবেদন করেছিল বিরোধীরা। গত বছর ডিসেম্বর মাসে সেই আর্জি খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু, চলতি বছরের ১০ মে প্রাক্তন মন্ত্রী যশবন্ত সিনহা,অরুণ শৌরি এবং আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ সুপ্রিম কোর্টে এই মামলা পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই আবেদন পুনর্বিবেচনার আর্জি এ দিন খারিজ করে দেয় রঞ্জন গগৈয়ের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ।

গতকাল অর্থাৎ বুধবারই প্রধান বিচারপতির দফতরকে তথ্য জানার অধিকার আইনের আওতায় আনার পক্ষে রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

বৃহস্পতিবার শবরীমালা মন্দির মামলায় খতিয়ে দেখতে সাত সদস্যের বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠিয়েছেন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের তত্ত্বাবধানে থাকা পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ।

অন্যদিকে, এদিনই প্রধানমন্ত্রীকে ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ বলায় কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে মানহানি মামলার রায়ও দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

গত লোকসভা ভোটে নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ বলে স্লোগান দিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। জনসভাতে এই স্লোগানের পরিপ্রেক্ষিতেই রাহুলের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করেন বিজেপি নেত্রী মীনাক্ষী লেখি। এই মামলা পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিতে গিয়ে জানায়, রাহুল গান্ধীর এই ধরনের মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। এমন মন্তব্যের ক্ষেত্রে পরবর্তীকালে তাঁকে সতর্ক হতেও নির্দেশ দেয় আদালত।

আর ঠিক এরপরেই কংগ্রেসের দিকে আক্রমণ শানাতে শুরু করে পদ্ম শিবির। বিজেপি তার সোশ্যাল মিডিয়ায় টুইট করে লেখে, ‘রাহুল গান্ধী একসময়ে বলেন প্রাক্তন ফরাসি রাষ্ট্রপতি

ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ নাকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ‘চোর’ বলেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি জানান, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যে।’

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল রাফালে তদন্তের প্রয়োজন নেই সেই রায়কেই পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানো হয়। দাখিল হয় রিট পিটিশনও। এ দিনের রায়ে সেই আর্জি খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ে রাফাল নিয়ে স্বস্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার।