প্রসেনজিৎ চৌধুরী: আরে অব কাঁহা উও সব বাতে৷ ভুলে বিসরে গীত কে মাফিক কুছ লোগ কহতে হ্যয়৷ মানি অউর মাসল হ্যায় তো ভোট হ্যায়…
(আরে, কে ওই সব কথা মনে রাখে৷ পুরনো গানের চাহিদার মতো কয়েকজন বলে৷ টাকা আর পেশীর শক্তিতেই ভোট হয়)

পরিচিত মুকেশ সিং হড়হড় করে ফোনেই এসব বলে দিল৷ ঝাড়খণ্ডের ভোট মানেই মানি-মাসলের বিরাট বাহুল্য৷ প্রাকৃতিক ও ভারি শিল্পের সম্পদে ভারতের সবথেকে দামি রাজ্যের মানুষ কিন্তু গরিব৷ মানি-মাসলের পিছনে আর একটি গল্প রয়েছে৷

রামগড়৷ আধুনিক ঝাড়খণ্ডের এই শহর দুটি কারণে ইতিহাস প্রসিদ্ধ৷ প্রথমত, কংগ্রেস ত্যাগ করা সুভাষচন্দ্র বসুর প্রথম সর্বভারতীয় রাজনৈতিক জনসমাবেশ ‘আপোষ বিরোধী সম্মেলন’ এখানেই৷ দ্বিতীয়ত, সেই সমাবেশ থেকেই জন্ম নেয় বাম সংগঠন বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল বা আরএসপি৷

রামগড়ের জেলা তথ্যভাণ্ডার খুঁজুন কিছু মিলবে৷ বাকিটা ভোঁ ভাঁ হয়ে গিয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসন পতনের পর খাতায় কলমে আরএসপি কোনও রকমে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে৷ কেরলে তারাই আবার বাম বিরোধী ইউডিএফ জোটের শরিক৷ এসব বিতর্ক যাই হোক, ঝাড়খণ্ডেই লুকিয়ে কিন্তু আরএসপি-এর জন্মস্থানটি৷

রামগড় কখনও অখণ্ড বিহার তো পরে ঝাড়খণ্ডের অন্যতম জেলা হাজারিবাগের ততোধিক নামকরা শহর৷ রাজধানী রাঁচির সঙ্গে হরবখত যোগাযোগ৷ চওড়া রাজপথ, গাছে ঢাকা পাহাড়ি এলাকার পাশ দিয়ে চলে যায় হু হু করে বাস-গাড়ি৷

কিন্তু যেদিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রবল ঘনঘটায় কাঁপছিল দুনিয়া৷ তখন ভারতের রাজনৈতিক অন্দরমহলে কংগ্রেসের প্রবল গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও দোদুল্যমান পরিস্থিতি৷ মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে মতান্তরে ( নিন্দুকেরা যাই বলুক কোনও দিনই মনান্তর হয়নি) বিতর্কের কেন্দ্রে সভাপতি সুভাষবাবু৷ অগত্যা কংগ্রেস নিল কড়া সিদ্ধান্ত৷

১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হলেন৷ গঠন করলেন ফরওয়ার্ড ব্লক৷ বাম মানসিকতার পরিচয় দিয়ে দলীয় পতাকায় কমিউনিস্ট প্রতীক কাস্তে-হাতুড়ি রাখলেন৷ সঙ্গে রইল বাঘ৷

ফরওয়ার্ড ব্লক তৈরির পর সরাসরি কংগ্রেসের সঙ্গে সুভাষবাবুর রাজনৈতিক লড়াই তুঙ্গে উঠল৷ সেই লড়াইয়ের প্রথম বাঘের গর্জন শোনা গেল রামগড় থেকে৷ কারণ সুভাষবাবুর সিদ্ধান্ত ছিল, যেখানেই কংগ্রেসের অধিবেশন হবে সেখানেই হবে পালটা সমাবেশ৷

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে রামগড় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান৷ ১৯৩৯ সালে এখানেই কংগ্রেসের অধিবেশন হয়৷ আর সদ্য ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠাতা সুভাষচন্দ্র তাঁর নির্ধারিত সূচি মেনে রামগড়েই করলেন আপোষ বিরোধী সম্মেলন৷

দুই যুযুধান রাজনৈতিক সংগঠনের প্রথম মুখোমুখি যুক্তির রণাঙ্গন রামগড়৷ একেবারে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর৷ কংগ্রেস তাদের সভাপতি হিসেবে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ-কে বিরাট এক সুসজ্জিত ষাঁড়ে টানা গাড়িতে হই হই করে অধিবেশন স্থলে নিয়ে গেল৷ রাস্তায় রাস্তায় উপচে পড়া ভিড়৷ এবার সুভাষবাবুর আবির্ভাব৷ তাঁকে আপোষ বিরোধী সম্মেলন ও ফরওয়ার্ড ব্লক কর্মীরা একইরকম বিরাট শকটে নিয়ে গেল নিজেদের সম্মেলন স্থলে৷

এই যখন চলছে, তখন সুভাষবাবুর বাম শিবিরেও লেগেছে দোলা৷ অনুশীলন সমিতির বামপন্থী বিপ্লবীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের পথ থেকে দূরে গিয়ে পৃথক সংগঠন গড়ে ব্রিটিশ বিরোধী পথ নেওয়ার৷ তুমুল আলোচনার পর অবশেষে বিপ্লবী প্রতুল গাঙ্গুলীর নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন আপোষ বিরোধী সম্মেলনেই তৈরি করলেন বাম সংগঠন রেভলিউশনারি সোশালিস্ট পার্টি (এম-এল) / Revolutionary Socialist Party of India (Marxist–Leninist)

১৯৩৯ সাল এরকমই। কংগ্রেসের অধিবেশন, সুভাষবাবুর পাল্টা সম্মেলন ও বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দলের সূতিকাগার হয়ে থাকল রামগড়। আরএসপি(এম-এল) তৈরি হলেও ১৯৪০ সালে সেই বাম নেতৃত্ব কলকাতায় বিশেষ সম্মেলন করে দলের নাম আরএসপি করেন৷

রামগড়ের এই রাজনৈতিক ইতিহাস শুধুই পুরনো গানের মতো গুনগুন করে কয়েকজন। আরএসপি তার শাখা বিস্তার করে পরবর্তী সময়ে উত্তর বাংলায়। বিশেষ করে ডুয়ার্স ও তরাইয়ের বিস্তীর্ণ চা শ্রমিক মহল্লায়। সংগঠনের শাখা ছড়ায় কেরলেও।

বিহার বা ঝাড়খণ্ডে অন্যান্য বাম দল তাদের অস্তিত্ব কিছুটা ধরে রেখেছে৷ রয়েছেন কয়েকজন বিধায়ক৷ আরএসপি ক্রমে বিলীন হয়েছে। ঝাড়খণ্ডে বামশক্তির প্রধান ধারক সিপিআই(এম-এল)। তারা বিহারেও শক্তিশালী। তবে আরএসপি নেই৷ জন্মস্থল রামগড় তো দূরের কথা পুরো ঝাড়খণ্ডেই তাদের কোনও অস্তিত্ব নেই। নির্বাচনী লড়াইয়ে ফরওয়ার্ড ব্লকের শক্তি দেখা যায় ধানবাদ লাগোয়া নিরসা বিধানসভা কেন্দ্রে৷

তবে রামগড় বিধানসভাটি গত কয়েকবছর ধরে অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়ন(আজসু) দখল করে রেখেছে। আর পুরো হাজারিবাগ লোকসভার হিসেব ধরলে কংগ্রেস, বিজেপি, সিপিআই সাংসদ হয়েছেন৷ দুবার হেভিওয়েট বিজেপি নেতা যশবন্ত সিনহা পরাজিত হন সিপিআইয়ের ভুবনেশ্বর প্রসাদ মেহতার কাছে। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যশবন্ত সিনহা আপাতত বিজেপি ত্যাগী-বিদ্রোহী।