অনন্যা তেওয়ারি, লিখলেন আমেরিকা থেকে: গেলো বছর ডিসেম্বর শেষে নিজের বাড়ি গেছিলাম। যাবার পথ ছিল লস এঞ্জেলেস থেকে হংকং হয়ে কলকাতা। ফিরেওছি ওই এক পথে হংকং হয়ে। ফিরেছিলাম জানুয়ারীর ২০ তারিখ। লস এঞ্জেলেসে on arrival ইমিগ্রেশনের লাইনে এসে দাঁড়ালাম। এসে যেটা দেখলাম সেটা হলো সে লাইন সাপ লুডো খেলার মতো এদিক ওদিক পেঁচিয়ে এগোচ্ছে।

কোথায় তার শেষ জানা নেই। সে লাইনের মুখগুলোর ৮০ শতাংশই হলো তারা, যাদের কে আমরা গোদা ভাষায় চিনা বলি। সে হোক তাতে অসুবিধে নেই। কিন্তু লাইনের ওই ৮০ শতাংশের ৯০ ভাগ মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস পরেছিলেন। একটু অবাক হয়েছিলাম।

বেটার হাফ-কে জিজ্ঞাসা করায় আমার কৌতূহলে কিছুটা জল ঢেলে সে জানায় ওরা বোধ হয় বেশি স্বাস্থ্য সচেতন। যে মুহূর্তে আমরা এই আলোচনা করছি সেই মুহূর্তে হয়তো ঈশ্বর নিজের জায়গা থেকে মুচকি হেসে বলেছিলো এই তো সবে শুরু। আগে থাকতাম মার্কিন মুলুকের আরিজোনাতে। দেশ থেকে ফিরেই রাজ্য বদলে হলো ইলিনয়। প্রথম Covid-19 নামক আগুনের তাপ গায়ে লাগে এই ইলিনয়তেই। নতুক জায়গায় আসা ইস্তক চাকরি খুঁজতে খুঁজতে মার্চের প্রথমের দিকে নতুন কোম্পানিতে যোগ দিলাম।

অফিসের প্রথমদিনে ওপর মহলে সৌজন্যমূলক আলাপ সারতে গিয়ে দেখি আমার মার্কিন বস নমস্কার করলেন। চোখ খুলে পড়ে যাচ্ছিলো। ঠিক তখনই আমার খাবি খাই অবস্থা সামাল দিয়ে তিনি জানান “Due to covid 19 situation we are avoiding shaking hands right now. I thought welcoming you with your familiar culture will give u warmth.” নিজের কাজের ডেস্কে বসে দেখি সেখানে এক বেশ বড়ো সাইজের হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া। দরজা খুলতে বন্ধ করতে সবাই কনুই দিয়ে ডিসেবিলিটি ফেসিলিটি বোতাম টিপছে। হাতল নৈব নৈব চ। এরপরের বড়ো ধাক্কা আসে মার্চের ১৩ তারিখ।

এই ইলিনয় শহরটা গড়ে উঠেছে স্টেট ফার্ম নামক একটি মার্কিন ইন্সুরেন্স কোম্পানির ওপর ভিত্তি করে। এটা আমেরিকার সবথেকে বড়ো প্রপার্টি এন্ড ক্যাসুয়ালটি ইন্সুরেন্স কোম্পানি এবং অবশ্যই অটো ইন্সুরেন্স। আমার বেটার হাফের ক্লায়েন্টও এই কোম্পানি। এবার ১৩ তারিখে এই কোম্পানি নিজেদের অফিস সম্পূর্ণ বন্ধ করে বাড়ি থেকে কাজের নিয়ম চালু করে। দিনটা ছিল শুক্রবার।রাস্তায় লোকজনের আতঙ্কের ছাপ চোখে পড়ে সেদিনই। করোনার আতঙ্ক। রাস্তা জুড়ে গাড়ির ঢল। রসদ যোগানের পথে বেরিয়ে পড়েছেন সবাই।

ঠিক যেন হলিউডের এপোক্যালিপ্টিক সিনেমার চিত্রনাট্য। সেদিন অফিস ফেরত ১৫ মিনিটের রাস্তা পেরোতে লাগলো ৪৫ মিনিট। আমার অফিস বন্ধ হতে লাগলো আরো এক হপ্তা। কারণ গভর্নর জি বি প্রিৎজকার লকড ডাউন ঘোষণা করতে এক্সট্রা ৭ দিন সময় নিয়েছিলেন। প্রাথমিক লকড ডাউন শুরু হলো ৭ ই এপ্রিল পর্যন্ত।এখন যেটা বেড়ে ৩০ এপ্রিল। লকড ডাউন হবার দরুন লাইব্রেরি থেকে নেওয়া বই ফেরত দেবার মেয়াদ পেরিয়ে যাবে তাই ড্রাইভ through তে বুক ড্রপ করতে গিয়ে দেখি সেখানেও পুলিশি প্রহরা।বাজারে রসদ যোগানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে দেখি লোকজন প্যানিক shopping করছে। কার্ট ভর্তি হয়তো ১০০০ ডলারের জিনিস।

সুপার মার্কেটে ঢোকার মুখে ৬ফুট দূরত্বে দাগ কাটা। সেই দাগ মেনে ঢোকার লাইন। শপিং কার্ট রাখার জায়গায় একজন কে নিয়োজিত করা যে সব সময় কার্টগুলোকে স্যানিটইজ করছে। ২০০০ লোকের ক্যাপাসিটি ওয়ালা জায়গায় ১০০ জনের বেশি লোক ঢোকার নিয়ম নেই এখন। ইন্ডিয়ান স্টোরগুলো হোম ডেলিভারি শুরু করেছে। কিন্তু ৫০ $ এর বেশি কেনা কাটা হলে তবেই। নয়তো টেলিফোনে অর্ডার দিয়ে পার্কিংয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওদেরকে ফোন করলে ওরা গাড়ির ট্রাঙ্কে এসে জিনিসপত্র রেখে যায়। এতো গেলো প্রাথমিক পরিস্থিতি।

সময় যত এগোতে থাকে পরিস্থিতির গাম্ভীর্য মনের ভিতরে ভয়ের শিহরণ জাগায়। আমার কাজের পরিসর কালেকশন ফিনান্স ভিত্তিক।রোজদিন অনেক লোকের সাথে কথা বলতে হয়। কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারি ইকোনমির একটা বড়ো অংশ কর্মহীন হয়ে বসে আছে। ফুড ব্যাঙ্ক গুলোর সামনে গাড়িদের লম্বা লাইন যার শেষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।খাবারের জোগানে টান পড়ছে।কারণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা মানুষের দানশীল মনোভাব বেশ জোরে ধাক্কা খেয়েছে। অনেক রাজ্যই অফিসিয়ালি কালেকশন অপারেশন বন্ধ রেখেছে।

এই সময় বাড়ি ভাড়া না দিতে পারলে বাড়ি ছাড়া বাধ্যতামূলক নয়। এতো সবের মধ্যেও লোকের ধম্মে কম্মে কিন্তু খামতি নেই। শিকাগোতে প্রতি বছর খুব বড়ো করে st patrick’s ডে উদযাপিত হয়। এবছর সেটা বন্ধ করা হয়েছে। গেলো রবিবার ইস্টার ছিল। মন ভরে সেলেব্রেশন এর জোগাড় ও চলছে। এগুলো দেখে একটা কথাই মনে হলো। সমস্ত পৃথিবীটাই ধর্মকর্মের পরাকাষ্ঠা। আর যে গোলার্ধেই থাক না কেন মানুষের প্রাথমিক আচরণ গুলো অভিন্নই হয়,Be it America or be it Amta.

স্বাস্থ্যকর্মীরা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই একরকম ভাবেই ভুগছে। সে ইতিহাস গোপন থাকাই ভালো। এতো হলো সার্বিক পরিস্থিতি। সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং বজায় রাখতে রাখতে মাঝে মাঝে নিজেদেরকে অপ্রকৃতস্থ মনে হয়। আপাতত জিনিসপত্রের যোগান আছে। US মেক্সিকোর বর্ডার শুধু জরুরি ভিত্তিক কারণে খোলা এই মুহূর্তে। যদি সেটুকুও বন্ধ হয়ে যায় তাহলে দেশীয় রসদে টান পড়ার একটা সমূহ সম্ভাবনা। যখনই ফোনে বাড়িতে বা বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে কথা হচ্ছে একটাই প্রসঙ্গে আলোচনা হচ্ছে।

প্রসঙ্গেও এখন একঘেয়েমি-অরুচি দেখা দিয়েছে।বাড়িতে আমি আর আমার বেটার হাফ ছাড়া জীবন্ত সঙ্গী বলতে তিনখানা গাছ। ফাঁকা সময়ে পালা করে তাদের সেবা চলছে। আর দিনের সিংহভাগটাই বাড়িটা বাড়ি থাকেনা।কর্মক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়। তাই আজকাল প্রফেশনাল আর পার্সোনাল লাইফের অন্তর খুঁজে পাওয়াও একটু দুস্কর। ওজন ঝরাবো বলে জিম শুরু করেছিলাম। সেই জিম পর্ব ও এখন ইতিহাসের পাতায়। এটা তো ছিল এতদিনের লকড ডাউন যাবৎ জীবন যাত্রা।

কিন্তু আজক্র তাজা খবর ছিল USA এর প্রেসিডেনশিয়াল প্রেস কনফারেন্সে। বৃহস্পতিবারের বার বেলায় তিনি ঘোষণা করলেন ” The next front in our war- Opening up America again” . আজ্ঞে হ্যাঁ। এদেশ বন্দি দোষ থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছে।কারণ “National shut down is not a sustainable long term solution “. প্রশ্ন হচ্ছে করোনার রোদন সঙ্গে নিয়ে কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে পা বাড়াতে হবে। এর জন্যে “হোয়াইট হাউস করোনা টাস্ক ফোর্স ” একটি গাইড লাইন বানিয়েছে।

আজকের প্রেসকন্ফারেন্সে আঠেরো পাতার সেই গাইড লাইন তুলে ধরেন Dr. Deborah Brix . তাতে বলা হয় লকড ডাউন সিচুয়েশন কে তিনটে phase এ ভাগ করা হবে। এবং প্রত্যেক রাজ্যের নিজের নিজের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবে। ৫০ টি রাজ্যের গভর্নরদের সাথে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তে আসা হয়েছে। কোন phase এ ঠিক কী কী পরিষেবা খোলা থাকবে এবং ঠিক কিভাবে সামাজিক চালচলন হবে তার ও একটা মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।এবং phase three তে সব থেকে বেশি relaxation পাওয়া গেছে।

যেটা কে আগামী আমেরিকার ” নিউ নরমাল” বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। গভর্নর দের উদ্দেশ্য করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটাই কথা বলেছেন “you are going to call your own shots” এবার এই শট-এ কে কতটা উতরোবে সেটা ভবিষ্যৎই বলবে। মন ও দ্বিধা বিভক্ত। কি হবে এবার ? আর কি সুস্থ থাকা সম্ভব হবে? আবার যখন বিশ্লেষণ করে দেখি যে ৫০ লাখের ওপর বেকার ভাতা চালু করার জন্যে নতুন আবেদন পড়েছে তখন মনে হয় হয়তো অর্থনীতির এভাবে থমকে যাওয়াটাও হয়তো ঠিক না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লোন দেওয়ার প্রকল্পও এখন টাকা শেষ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ট্রাম্প এর reopen উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে অনেক রাজ্যই। কারণ হয়তো সবাই কম বেশি ভুগছে। আমার বসত রাজ্য ইলিনয়। আমাদের গভর্নর ট্রাম্প এর এই উদ্যোগকে আঁকড়ে ধরে এগোতে চাইছেন। অথচ এই G B Pritzker কে আমরা বরাবর ই কেন্দ্র বিরোধী হিসেবে পেয়েছি। মিশিগানও বেশ ভালো রকম ক্ষতিগ্রস্থ তবুও বেরোজগার হয়ে যাবার তাগিদ মানুষকে ঘরের বাইরে নিয়ে এসে প্রতিবাদে সামিল করেছে। মিশিগান ও হয়তো ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউস করোনা টাস্ক ফোর্স এর গলাতেই গলা মেলাবে। তবে করোনার প্রাণকেন্দ্র এই মুহূর্তে নিউ ইয়র্ক। এবং নিউ ইয়র্ক তাদের লকড ডাউন ১৫ ই মে পর্যন্ত বজায় রাখবে।

যে কোনো দিন নাকে মুখে গুঁজে অফিস ছোটার পালা শুরু হবে এবার। তার পর হয়তো করোনা আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াবে। শুধু ধরা দেবার অপেক্ষা। সবাই কেই হয়তো করোনা একবার করে ছুঁয়ে যাবে। পরিণতি কি জানিনা। তবে সারাজীবনের জন্যে একটা স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হবে। এবার কবে বাড়ি ফিরতে পারবো জানিনা। সবটাই অনিশ্চয়তা। দেশে আমাদের বয়স্ক বাবা মা রা আছেন। প্রতি মুহূর্তে চিন্তা হয়।

আমার নিজের দিদি পুনে-তে আছে। একজন তো মসকরা করে বাবা কে বলেই ফেলেছেন যে আপনার দুই মেয়ে দুই হটস্পটে বসে। এই চিন্তায় হয়তো বাবার কপালের ভাঁজ একটু বেড়েছে। কিন্তু এখন এই চিন্তার ভাঁজ প্রত্যেক ঘরের গল্প। আপনি সুস্থ থাকতে চান কিনা সেটা অনেকটা আপনার নিজের ওপর।

আপনাকে দরজার পিছনে আটকে রেখে কারোরই কিছু ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি নেই। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার। কারণ বেঁচে থাকার লড়াই এটা। আপনাদের ও তাই বলবো। এই বিপদাবস্থা কে সাময়িক করার দায়িত্ব আপনার ওপরেই। সংকটের এই কালো মেঘের ওপারেই এক আকাশ নীল আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে।

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও