রাজ্যসভা এবং লোকসভার দুই কক্ষেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাশ হয়েছে নাগরিক সংশোধনী বিল। গত ৯ নভেম্বর বিল পাশের পর রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ সই করার পরেই তা আইন হিসেবে সারা দেশে কার্যকর হয়েছে।

কিন্তু, এই বিল পাশ হওয়ার পর থেকেই উত্তেজনা ছড়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এই আইন বিরোধী প্রতিবাদে গর্জে ওঠে নানা মহল। আন্দোলনের নামে বহু জায়গায় অশান্তিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোনও কোনও জায়গায় আন্দোলন তীব্রতর হয়েছে। এই আইন সম্পর্কে রইল বিস্তারিত আলোচনা।

নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন কী (CAA)?

১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী আনা হল ২০১৯-এ। এই আইন অনুযায়ী, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসী ও ক্রিশ্চান সম্প্রদায়ের মানুষকে ভারতে নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে এলে এদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এই আইনে মুসলিমদের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এই প্রথমবার ভারতের কোনও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইনে ধর্মের উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় নাগরিকপঞ্জী কী (NRC)?

১৯৫৫-র নাগরিকত্ব আইন ও ২০০৩ -এর সংশোধন অনুযায়ী যারা ভারতের নাগরিক, তাদের রেজিস্টার করার প্রক্রিয়াই হল এনআরসি। শুধুমাত্র অসমে এনআরসি কার্যকর হয়েছে।

এই আইন অনুযায়ী কারা নাগরিকত্ব পাবে?

যেসব শরণার্থী ২০১৪-র ৩১ ডিসেম্বরের আগে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে বা ধর্মীয় নিপীড়নের আতঙ্কে ভারতে এসেছেন, তাঁরা এই নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য। আগে ১১ বছর থাকলে নাগরিকত্ব পাওয়া যেত, নতুন আইনে পাঁচ বছরেই পাওয়া যাবে নাগরিকত্ব।

(বিতর্কের মুখে প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো বা পিআইবি সাইটে সরকার কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছে)

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কি এনআরসির-ই একটি অংশ?

না। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন একটি সম্পূর্ণ আলাদা আইন এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জী (এনআরসি) একটি আলাদা বিষয়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সংসদে গৃহীত একটি আইন যা সমগ্র ভারতবর্ষে জারি করা হয়েছে।

অপরদিকে, এনআরসি একটি প্রক্রিয়া যা এখনও দেশজুড়ে কী পদ্ধতিতে কার্যকর হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। অসমে যে এনআরসি প্রক্রিয়া চালু হয়েছে তা অসম অ্যাকর্ড এবং মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই গৃহীত হয়েছে।

ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের কি এনআরসি এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে ভয়ের কোনও কারণ রয়েছে?

ভারতের কোনও নাগরিকের (ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে) এই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং এনআরসি নিয়ে কোনও ধরনের ভয়ের কারণ নেই।

এনআরসি কি শুধুমাত্র একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করবে?

না। এনআরসি-র সঙ্গে কোনও ধর্মের সম্পর্ক নেই। এনআরসি ভারতবর্ষের প্রতিটি নাগরিকের জন্য। এটি একটি জাতীয় নাগরিকপঞ্জী, অর্থাৎ প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের নাম এই এনআরসি-তে নথিভুক্ত করা হবে।

এনআরসি-র ফলে কি ধর্মের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষদের আলাদা করা হবে?

না। এনআরসি-র সঙ্গে কোনও ধর্মের যোগ নেই। ভারতবর্ষে এনআরসি কার্যকর হবে। কিন্তু তা কখনই ধর্মের ভিত্তিতে করা হবে না। ভারতের কোনও নাগরিককে শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করা হবে না।

এনআরসি চালু হলে আমাদের কাছ থেকে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হবে?

প্রথমত, জাতীয় স্তরে এখনও পর্যন্ত এনআরসি শুরুর কথা ঘোষণা করা হয়নি। যদি এই এনআরসি প্রক্রিয়া শুরু হয় তার মানে এই নয় যে কোনও ভারতীয় নাগরিককে তাঁর নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি চাওয়া হবে। এনআরসি একটি সাধারণ নাগরিকপঞ্জীকরণের প্রক্রিয়া। ঠিক যেভাবে এখন আমরা যেকোনো ধরনের বৈধ পরিচয়পত্র দ্বারা ভোটার লিস্টে নাম নথিভুক্ত করি কিংবা আধার কার্ড তৈরি করি। ঠিক সেইভাবেই বৈধ নথি এনআরসির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

কী ভাবে কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নির্ণয় করা হবে? সেটা কি কেন্দ্রীয় সরকার ঠিক করবে?

যেকোনো ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে নাগরিকত্ব আইন (২০০৯) অনুসারে। এই আইন নির্ধারিত হবে নাগরিকত্ব আইন (১৯৫৫)-এর ভিত্তিতে। এই আইন অনুযায়ী কোনও ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে পারেন পাঁচটি উপায়ে যথা-

জন্মস্থান অনুযায়ী ভারতীয় হিসাবে, পূর্বসূরী ভারতীয় হলে, ভারতীয় নাগরিক হিসাবে নথিভুক্ত, ভারতীয় ভূখণ্ডে কোনও ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট সময়ে পর্যন্ত বসবাস করলে তাঁকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ন্যাচেরালাইজেশন মোড’। ভারত সরকার কোনও নির্দিষ্ট ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করলে সেই স্থানের ব্যক্তিরাও নাগরিকত্ব পাবেন। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘সিটিজেনশিপ বাই ইনকর্পোরেশন’।

ভারতের নাগরিকত্ব প্রমাণে কি আমার পিতা-মাতার পরিচয়পত্রের বিবরণ জমা করতে হবে?

এক্ষেত্রে আপনার জন্মের বিবরণই যথেষ্ট। আপনার জন্ম বিবরণ অর্থাৎ- আপনার জন্ম তারিখ,মাস,বছর এবং জন্মস্থান। যদি আপনার জন্ম বিবরণ না থাকলে সেক্ষেত্রে আপনাকে আপনার পিতা-মাতার জন্ম বিবরণ জমা করতে হবে।

নাগরিকত্ব পরিচয়পত্র জন্মস্থান এবং তদানুরূপ যেকোনো ধরনের নথিই গৃহীত হবে। তবে শুধুমাত্র বৈধ নথিই গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এই বৈধ নথির মধ্যে রাখা হয়েছে- ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, পাসপোর্ট, আধার, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ইনস্যুরেন্সের কাগজ, বার্থ সার্টিফিকেট, স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট, সরকারি আধিকারিক দ্বারা ইস্যু করা জমি এবং বাড়ি সংক্রান্ত যেকোনো নথি। এছাড়াও এই তালিকায় আরও বৈধ নথির সংযুক্তিকরণ করা হবে যাতে ভারতীয় নাগরিকদের অযথা হেনস্থা না হতে হয়।

আমাকে কি ১৯৭১ সালে আগে আমার পূর্বপুরুষদের নথি জমা করতে হবে?

না। অসমের এনআরসি প্রক্রিয়া অনুযায়ী ১৯৭১ সালের আগে যদি আপনার পূর্বপুরুষ ভারতে এসে থাকেন সেক্ষেত্রে আপনাকে কোনও ধরনের নথি জমা দিতে হবে না। কিন্তু এটি শুধুমাত্র অসম চুক্তি (অসম অ্যাকর্ড) অনুযায়ী মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জারি হওয়া এনআরসি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেই বৈধ। অসম ব্যতীত সারা ভারতবর্ষে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই প্রক্রিয়া মূলত ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন ২০০৩ অবলম্বনে গৃহীত হবে।

যদি নিজের পরিচয়পত্র এত সহজেই জমা করা যায়, তবে অসমে কীভাবে ১৯ লক্ষ মানুষ এনআরসির ফলে প্রভাবিত হলেন?

অসমে অনুপ্রবেশ দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই নিয়ে অসমে বহুদিন ধরেই আন্দোলন চলছিল। ১৯৮৫ সালে তদানীন্তন রাজীব গান্ধীর সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতাপত্রে সইয়ের দ্বারা এনআরসি প্রক্রিয়া শুরু করেন। সেখানে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার সময় কমিয়ে আনা হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ।

এনআরসি চলাকালীন যদি পুরনো নথি চাওয়া হয়, ওই পুরনো নথি খুঁজে পাওয়া সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে সেক্ষেত্রে উপায়?

এটা একদমই তা নয়। সাধারণ বৈধ পরিচয়পত্র শুধুমাত্র কোনও ব্যক্তির পরিচয় জানার জন্যেই পরীক্ষা করে দেখা হবে। ভারতবর্ষে জাতীয় স্তরে এনআরসি শুরু হলে সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার সমস্ত দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে, যাতে কোনও নাগরিকের সমস্যা না হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের ভারতীয় নাগরিকদের কোনওভাবেই হেনস্থা করার মনোবৃত্তি নেই।

যদি কোনও ব্যক্তি নিরক্ষর হন এবং তাঁর যদি কোনও উপযুক্ত নথি না থাকে সেক্ষেত্রে?

এই ধরনের সমস্যা উপনীত হলে কর্তৃপক্ষ ওই ব্যক্তিকে উপযুক্ত সাক্ষী, অন্যান্য প্রামাণ্য নথি এবং সম্প্রদায় যাচাইকরণ প্রভৃতির উপর নির্ভর করা হবে। নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে। কোনও ভারতীয় সমস্যায় না পড়েন সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার অত্যন্ত সংবেদনশীল।

ভারতে বহু মানুষ রয়েছেন যাদের নিজস্ব বাসস্থান নেই, অনেক মানুষই দরিদ্র এবং নিরক্ষর ফলে তাঁদের অনেক সময়েই পরিচয়পত্রও থাকে না। সেই সমস্ত মানুষদের কী হবে?

এটা সম্পূর্ণভাবে সঠিক নয়। এই ধরনের ব্যক্তিবর্গ ভোট দেন এবং তাঁরা বিভিন্ন সরকারি যোজনার থেকে সুফলও লাভ করেন। তাঁদের পরিচয় এই ধরনের যোজনায় নাম নথিভুক্তকরণের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে।

এনআরসির ফলে কি সমাজে রুপান্তরকামী, নাস্তিক, আদিবাসী, নারী এবং ভূমিহীনদের ভারতের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করবে?

না। এনআরসি কোনওভাবেই উপরোক্ত কোনও ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গদের উপর প্রভাব ফেলবে না। পড়ুন,বুঝুন, এই বিষয়ে নিজের মতামত গড়ে তুলুন, অযথা বিভ্রান্তিতে হারিয়ে যাবেন না।

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV